kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

অর্থনৈতিক অঞ্চলে হঠাৎ সার্ভিস চার্জ

মাসুদ রুমী   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০২:১৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অর্থনৈতিক অঞ্চলে হঠাৎ সার্ভিস চার্জ

সারা দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ টানতে শিল্প-উদ্যোক্তাদের যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এখন সেসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে জমির মূল্যের ওপর কোনো ধরনের ভ্যাট দিতে হবে না; গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মতো পরিষেবা গ্রহণে সার্ভিস চার্জ বা সেবা খরচ থাকবে না; ১০ বছরের কর অবকাশসহ নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেনে এনে এখন বলা হচ্ছে, এসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রেখে তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সম্প্রতি বেজা থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন পরিষেবার ওপর ৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ইজারা নেওয়া জমির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং রক্ষণাবেক্ষণ চার্জও। অথচ বেজার প্রসপেকটাস ও ওয়েবসাইটে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জমুক্ত সেবা ও কর অবকাশ সুবিধাসহ নানা ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিস্মিত, হতভম্ব ও ক্ষুব্ধ শিল্প-উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, দেশে এমনিতেই বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে বিনিয়োগকারীদের আনা হয়েছে। এখন বেজার এমন সিদ্ধান্তে বিনিয়োগে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন ব্যবসায়ীরা।

সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৩০টিরও বেশি অঞ্চল উন্নয়নের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে গেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর বেজা থেকে জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী, সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানায় পানির সংযোগ নেওয়ার পর পানির বিল দেওয়ার পাশাপাশি একজন বিনিয়োগকারীকে বাড়তি ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। একইভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার পর গ্যাস বিল দেওয়ার পাশাপাশি বাড়তি ৫ শতাংশ সেবা খরচ গুনতে হবে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও বাড়তি ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হবে।

বেজা বলছে, শিল্প-কারখানা থেকে তৈরি হওয়া ময়লা পানি পরিশোধন করতে চাইলে সেখানেও ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। আবার তরল বর্জ্য শোধন করতে চাইলে সেখানেও আলাদা করে ৫ শতাংশ সেবা খরচ দিতে হবে ব্যবসায়ীদের।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ইজারা নেওয়া জমির মূল্যের ওপর ভ্যাট না থাকলেও এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, ইজারা নেওয়া জমির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য থাকছে না টানা ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধাও।

বেজা বলছে, যেকোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইজারা নেওয়া প্রতি বর্গমিটার জমি বা অবকাঠামোর ওপর বার্ষিক ০.০৫ ডলার হারে রক্ষণাবেক্ষণ চার্জও দিতে হবে।

বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (বেজিয়া) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আশরাফুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেজা আমাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য টেনে এনেছে, সেসব প্রতিশ্রুতি তারা এখন আর রাখছে না। এনবিআরের মাধ্যমে নতুন নতুন এসআরও (আদেশ) জারি করে সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যখন বেজার কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়েছিলেন, তখন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন পরিষেবার ওপর অতিরিক্ত মাসুলের কথা চুক্তিতে ছিল না। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

আশরাফুল হক বলেন, ‘সরকার বেশি বিনিয়োগকারী আকর্ষণের যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমরা তাতে সমর্থন দিচ্ছি। এমনকি দেশের অর্থনীতিকে সরকার যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়; তাতে আমাদের সহায়তা রয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত আমাদের সমর্থন দেওয়া এবং বিদ্যমান সমস্যা ও বাধাগুলো দূর করার ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকেই নিরুৎসাহিত করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ওই সব দেশের সরকার। যেমন—তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ টানতে পরিষেবায় সার্ভিস চার্জ অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, উরুগুয়ে, কুয়েত, তাইওয়ান ও ফিলিপাইন সবাই তাদের বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছে যে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর যে বিল আসবে তা কমানো হবে। আমরা যদি প্রতিবেশীদের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ টানতে চাই তাহলে তাদের তুলনায় আমাদের বেশি প্রণোদনা দিতে হবে।’

একাধিক বিনিয়োগকারী কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন যে বেজার সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি হয়েছে সেখানে ভ্যাট ও সেবার ওপর সার্ভিস চার্জ সম্পর্কে কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত করেনি।

যদিও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির মতো পরিষেবায় ৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জের সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল চার বছর আগে গভর্নিং বোর্ডের সভায়। এটি নতুন করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। তা ছাড়া আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (বেপজা) বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি পরিষেবার জন্য ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। আমরা তো ১০ শতাংশ আরোপ করিনি, মাত্র ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ আরোপ করেছি।’

পবন চৌধুরী আরো বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাস্তাঘাট, সেতু, জমি উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ বিভিন্ন পরিষেবার সংযোগ দিচ্ছি। তাই বলে ব্যবসায়ীদের সব কিছু ফ্রি দেওয়া হবে? আমরা তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করছি। ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা এত টাকা খরচ করছি, তাই বলে তাঁরা আমাদের কিছু সার্ভিস চার্জ দিতে পারবেন না?  যদি সার্ভিস চার্জ না দেন, বেজা চলবে কিভাবে? বেজার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হবে কিভাবে?’

বেজা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ব্যবসায়ীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ইজারা নিয়েছেন ৫০ বছরের জন্য। জমির নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে সেখানে ভূমি উন্নয়ন করে এখন অবকাঠামো নির্মাণ করছেন। এনবিআর এখন বলছে, জমির ইজারা মূল্যের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে ব্যবসায়ীদের।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দিন শেষে যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। জমির ইজারা মূল্যের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীরা যে জমি ইজারা নিয়েছিলেন, সেই ইজারার কাগজপত্র দেখিয়েও ব্যাংকের ঋণ মিলছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া চিঠিতে বেজিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইজারানীতির প্রতিকূল শর্তের কারণে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না। চিঠিতে আরো বলা হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে প্রত্যাশা ও আস্থা ছিল ভ্যাট ইস্যুতে বেজার কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর পুরোটাই ভেঙে পড়েছে। অথচ ব্যবসায়ীরা গভীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন শিল্প ইউনিট স্থাপনের পর থেকে কর অবকাশ সুবিধা উপভোগের। অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেকোনো পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেই তা পাওয়ার কথা ছিল।

বেজিয়া আরো জানায়, অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাদের জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনির্দিষ্ট সময়ের বিলম্ব করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেজার প্রতিশ্রুত অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বন্দর সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। অথচ বন্দর নির্মাণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা