kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে

জয়ন্ত ঘোষাল   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০৪:০৫ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে

‘শেখ মুজিবের রক্তের দাগ কি শুকিয়ে গেছে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ ১৫ই আগস্ট সারা দিন বরফঢাকা কফিনে গাড়িবারান্দার নিচে অবস্থান করছিল। আর্টিলারি আর আর্মার্ড কোরের সেনারা পাহারারত ছিল। পরদিন ১৬ আগস্ট শনিবার মেজর মহিউদ্দিন আর লেফটেন্যান্ট সিকান্দারের মতো সেনাসহ কয়েকজন একটি হেলিকপ্টারে করে শেখ মুজিবের লাশ বিকেল ৩টার সময় টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যান। প্রথমে তাঁর লাশ ডাকবাংলোর কাছে রাখা হয়। তড়িঘড়ি করে যে অবস্থায় আনা হয়েছে, সে অবস্থায় শেখ মুজিবের লাশ সমাহিত করার জন্য মেজর মহিউদ্দিন চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু স্থানীয় মাওলানা সাহেবরা এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। তাঁরা বললেন, মুসলমানের লাশ গোসল না করে কবর দেওয়া যাবে না। তখন তাঁদের দেওয়া হয় মাত্র ১০ মিনিট সময়। পরে অবশ্য আরো ১০ মিনিট সময় বাড়ানো হলে দোকান থেকে একটা ৫৭০ কাপড় কাচার সাবান এনে বঙ্গবন্ধুর লাশ গোসল করানো হয়েছিল। রেডক্রসের রিলিফের কাপড় কাফন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।’

এই ভয়ংকর স্মৃতিকথা পড়ছিলাম মেজর রফিকুল ইসলামের লেখা ‘বাংলাদেশ : সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সঙ্কট’ নামের বইটিতে। মেজর রফিকুল ইসলাম অধ্যাপনায় ছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে ৭ নম্বর সেক্টরে সাবসেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে রসায়নশাস্ত্রে এমএসসি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত হন। তাঁর রচনার কথা আজ হঠাৎ স্মরণ করছি কেন? স্মরণ করছি, কারণ বাংলাদেশে বারবার সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং অভ্যুত্থান হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশের একটা ক্যু সেনাবাহিনীর, সেটা ভোলার নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু সে-ও তো সেনাবাহিনীর ভয়ংকর অভ্যুত্থান। ১৯৮১ সালে অবশ্য জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে। এরপর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র তো কিছু কম হলো না। তাই আজ যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন, চেষ্টা করছেন আর্থিক অগ্রগতির, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ ইতিবাচক রিপোর্ট দিচ্ছে—তখন সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায় সাধারণ মানুষ। বারবার মনে হয় তৃতীয় বিশ্বের নানা দেশের সামরিক অভ্যুত্থান আর গণতন্ত্রের উত্তরণের প্রসঙ্গ অনেক সময় যুগপৎ শোনা গেছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার সদ্যঃস্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে ঋণে জর্জরিত অনুন্নত অর্থনীতি, নিরক্ষরতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অনুপস্থিতি—এসব তো মানুষ দেখেছে। ভারতের মানুষ দেখেছে। বাংলাদেশের মানুষও দেখেছে। বিপরীতে সামরিক বাহিনীর যে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, পেশাগত প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, সুসংগঠিত অস্তিত্ব, উচ্চাভিলাষী জেনারেলদের ক্ষমতা দখলের পথ সুপ্রশস্ত করার চেষ্টা। এই জায়গা থেকেই বারবার প্রশ্ন উঠেছে সামরিক শাসন নিয়ে। সামরিক শাসনের বৈধতার প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে। জনগণের সচেতন অংশ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার খড়্গ ঝুলেছে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে রথ, সেই রথ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। ধর্মীয়, জাতিগত আঞ্চলিক বিরোধ। এসব তো আছেই। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু সামরিক শাসকরা আর যা-ই করুন কিছুতেই গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে পারেন না। সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা তো সোনার পাথর বাটি। তাই বাংলাদেশকে সামরিক শাসনের পথে নয়, গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যেতে হবে। আজ যখন শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক সরকার মজবুত, মানুষের সমর্থন নিয়ে এগোচ্ছে; ঠিক সেই সময় সংখ্যায় কম হলেও মৌলবাদী শক্তি, ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদী শক্তি সব সময় যেভাবে পাকিস্তানে সামরিক শাসনের সব থেকে বড় শিকড়, বাংলাদেশেও তার চেষ্টা কিন্তু কিছু কম হচ্ছে না।

এই কথাগুলো আজ এত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, তার কারণ গত মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি স্টিফেন বিগান, তিনি তাঁর সফর সেরে ফিরে যাওয়ার পর টেলিফোনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। তাঁর ভারত সফর এবং তার পরই বাংলাদেশ সফর যৌথভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গত সপ্তাহে আমি স্টিফেন বিগানের সফর নিয়ে লিখেছিলাম। এ জন্য আজ তাঁর মিডিয়া ব্রিফিং নিয়ে লিখতে চাইছি। এই ব্রিফিংয়ে তিনি বারবার বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জনৈক বাংলাদেশি সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, আইনের শাসন নেই, ভোটে চুরি শুরু হয়েছে ইত্যাদি। তখন সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দেওয়া স্বাভাবিক। অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানবাধিকার, আইনের শাসন, ভোট চুরি—সেসব নিয়ে জবাব দেওয়াটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী বা সচিব দিতে পারেন না। তবু সাংবাদিকের কাজ প্রশ্ন করা। এবং সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ট্রাম্পের রাজত্বে যদি এ ব্যাপারে কোনো জবাব পাওয়া যায়। মিডিয়া ব্রিফিংয়ের কথোপকথন থেকে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের সাংবাদিক বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রশ্ন যে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারিকে করতে পারছেন। সাধারণত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে কী কী প্রশ্ন করা হবে, কজন প্রশ্ন করবেন সবই পূর্বনির্ধারিত হয়। পররাষ্ট্র বিভাগের সচিব বা পররাষ্ট্র বিভাগের মন্ত্রী তাঁরা কোন প্রশ্নের জবাব দেবেন, তা-ও পূর্বনির্ধারিত। বিষয়টা নিয়ে হোমওয়ার্ক করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিক, যিনি আবার বিএনপি কর্মী হিসেবেও পরিচিত, তিনি এ রকমভাবে ঝাঁজালো প্রশ্ন করতে পেরেছেন।

গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার কথা আমেরিকা কিন্তু আজ নয়, বারবার বলে। ভারত যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যাপারে যৌথভাবে গণতন্ত্র বিকাশের পথে এগোনোর জন্য কথা বলে। এখানে দুটি কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হচ্ছে। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যাপারে গণতন্ত্রকে বিকশিত করার যৌথ প্রক্রিয়া। এটি কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল, অর্থাৎ আর দুই সপ্তাহ বাদে আমেরিকার ভোটে ট্রাম্প জিতবে না হারবে, রিপাবলিকান দল জিতবে, না ডেমোক্র্যাট জিতবে, তার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বাংলাদেশ সম্পর্কিত যে বক্তব্য তার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ ভারত যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সুসম্পর্কটা গড়ে তুলেছে, সেটা অনেকেই বলেন বিল ক্লিনটনের সময় থেকেই। যখন অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী, তখন থেকেই এই সম্পর্কটা বেশ মধুর হয়ে ওঠে। বিল ক্লিনটনও দিল্লিতে এসেছিলেন, সংসদে ভাষণ দিয়েছিলেন। যথেষ্ট হৈচৈ হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট বুশ আসার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, সম্পর্কের অবনতি হবে। কিন্তু তা হয়নি। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বুশের পরমাণুচুক্তি হয়েছিল এবং সুসম্পর্কের যথেষ্ট নজির দেখা গিয়েছিল। ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল প্রেসিডেন্ট বুশ ও মনমোহন সিংয়ের মধ্যে। বুশের পর যখন ওবামা আসেন তখনো কিন্তু সেই সম্পর্ক অন্য দলের অর্থাৎ ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও ওবামার সঙ্গে ভারত সরকারের তথা বাংলাদেশের সংঘাত তো নয়ই, বরং সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে। ওবামার পরে ট্রাম্প এলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক। ভারত শুধু নয়, এই উপমহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সম্পর্ক, সেটা ট্রাম্প বা তাঁর রিপাবলিকান দলের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ থাকে না। উনিশ-বিশ ফারাক হতে পারে। কিন্তু আমেরিকার বিদেশনীতিতে বাংলাদেশ, ভারত এবং এই উপমহাদেশের গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে যৌথ রণকৌশল, সেটার সঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে এক নীরব বার্তা। সেই বার্তাটা হলো, চীনে এই গণতন্ত্র নেই। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে যে কমিউনিস্ট শাসন, সেটা ঘোষিত একনায়কতন্ত্র। সেখানে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেই। রোহিঙ্গাদের যে সমস্যা সেটা নিয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে স্টিভেন বিগান বললেন, এটা মানতে হবে যে এথনিক ক্লিনজিং হয়েছে। সেটা মিয়ানমার মানছে না। সেই ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারেও আমেরিকা সমর্থক ভূমিকা নিচ্ছে। চেষ্টা করছে। মিয়ানমারে বসবাসকারীদের ওপর অত্যাচারের পক্ষে কোনো বক্তব্য রাখেনি আমেরিকা। এ ব্যাপারে চীন আশ্চর্যজনকভাবে নীরবতা পালন করছে এবং অবস্থান অনেকটাই মিয়ানমারের দিকে ঝুঁকে। সুতরাং এ রকম একটা পরিস্থিতিতে যখন পাকিস্তানে গণতন্ত্র নেই, চীনে গণতন্ত্র নেই, উত্তর কোরিয়ায় গণতন্ত্র নেই—তখন গণতন্ত্রের স্লোগান তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অক্ষ ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে রচনা করতে চাইছে, সেটা কিন্তু এই উপমহাদেশে একটা স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং গত সপ্তাহে যে স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য এবং যেভাবে আলোচনাটা আমরা করেছিলাম, সেই আলোচনাকেই মনে হয় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বিগানের এই সাংবাদিক বৈঠকের মাধ্যমে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক এগিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত দুটি দেশের সঙ্গে আমেরিকার যে একটা অক্ষ তৈরি করা, সেখানে শেখ হাসিনাও মুনশিয়ানার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই পাকিস্তানের যে বিভক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সামরিক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক তাদের যে বিদেশনীতি, সেখানে পাকিস্তানকেই তারা সমর্থন করে এসেছিল। উপমহাদেশে পাকিস্তানের যে বিচ্ছিন্নতা, নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের যে অস্তিত্ব, সেগুলো প্রথম দিকটায় আমেরিকা মেনে নিতে চায়নি। আমেরিকার জনগণ ও প্রচারমাধ্যম কিন্তু পাকিস্তান বাহিনীর যে বর্বরতা, তার বিরুদ্ধে ছিল। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি আন্দোলন, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও বিশ্বজনমতকে কার্যত উপেক্ষা করেই নিক্সন সরকার ও তাদের যে প্রশাসনিক কাঠামো বিভিন্ন বিশ্ব ফোরামে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। এটাও একটা ইতিহাস। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডি-ক্লাসিফায়েড করা দলিল ইতিহাসের এক নির্মম সাক্ষী। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের প্রতি মার্কিন সরকারের মনোভাব এবং এখনকার যে মনোভাব তার বৈপরীত্য কিন্তু সাংঘাতিকভাবে ধরা পড়ে। আমি বলব যে মার্কিন সরকারের এই জায়গাটা থেকে অর্থাৎ ১৯৬৯-১৯৭৫ সাল, বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান, এই যে সম্পর্কের জট—সেটা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন দলিলে ধরা পড়েছে। এই দলিলগুলো এখন ডি-ক্লাসিফায়েড হয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের এবং বিশ্বের যেকোনো নাগরিক সেগুলো পড়তে পারে বা দেখতে পারে। সুতরাং আমেরিকার মনোভাবের যে পরিবর্তন সেটা সত্যি কথা বলতে কী কূটনীতিতে তো এমন হয় না যে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালোবাসার আবেগে এই অবস্থান বদলে গেছে। এখন বিশ্বের পটপরিবর্তন হয়েছে। ভারত শক্তিশালী হয়েছে। চীনের ড্রাগনের নিঃশ্বাস আমেরিকাকেও যথেষ্ট পীড়িত করছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে ভৌগোলিক অবস্থানে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ভারতের বিশিষ্ট কূটনীতিবিদ ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরাও বলছেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে মৌলবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এবং পাকিস্তানের অঙ্গুলি হেলনে যাতে নতুন করে হাসিনা সরকারের কোনো বিপদ সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারেও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে।

গণতন্ত্রের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেটা সামরিক শাসনে সম্ভব নয়। সুতরাং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা ভারতের থেকেও অনেক বেশি। এই সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা বারবার হয়। শেখ হাসিনাকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছিল। সুতরাং আজ আমেরিকা যখন বলে, শেখ হাসিনার সরকার গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পথে এগোচ্ছে এবং সন্ত্রাস দমনের সঙ্গেও গণতন্ত্রের বিকাশের গভীর সম্পর্ক আছে, তখন বুঝতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও খুব স্বচ্ছ বলেই ভারত মনে করে। সুতরাং আমেরিকা এই গণতন্ত্রের আওয়াজ তুলে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা নতুন শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে। সেটা এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং আরো আলোচনার দাবি রাখে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা