kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

পূজার মধ্য দিয়ে ঐক্যের পাঠ

শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠান থেকে আমরা নিষ্কাশন করে নেব নৈতিকতার আদর্শ। শ্রীদুর্গা দেবীকে পূজা করার মধ্য দিয়ে আমরা পাঠ নেব ঐক্যের। কারণ দেবী দুর্গা আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে। পাঠ নেব অশুভ দলনের। কারণ দেবী দুর্গা অশুভকে বিনাশ করে শুভকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন

নিরঞ্জন অধিকারী   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পূজার মধ্য দিয়ে ঐক্যের পাঠ

আমরা জানি, ‘ধর্ম’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক অর্থে ধর্ম বোঝায় : যা ধারণ করা হয়। ধৃ+মন্=ধর্ম। জীবের চরিত্র, আচার-আচরণকে এককথায় তার ধর্ম বলা হয়। যেমন—মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব, পশুর ধর্ম পশুত্ব। জড়বস্তুর বৈশিষ্ট্যকেও ধর্ম বলা হয়। যেমন অগ্নির ধর্ম দহন করা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা, সর্বশক্তিমান, সর্বকারণের কারণ অনাদি-অনন্ত বৃহেক ব্রহ্ম বলা হয়। এই ব্রহ্মের বোধকে বলা হয় ধর্ম। এই বৃহৎ ও সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। তাই তাঁর স্তুতি করা এবং নানা পদ্ধতিতে তাঁর উপাসনা করা হয়।

এই উপাসনার পদ্ধতিগত পার্থক্যের জন্য মনুষ্যকুলে বিবিধ ধর্মসম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। আবার একই ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে মত ও পথের পার্থক্যের কারণে উপসম্প্রদায়গুলোর সৃষ্টি হয়েছে।

সনাতন ধর্মের (হিন্দু ধর্ম) ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। সনাতন ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ‘বেদ’কে স্বীকার করা হলেও একই বেদের বিভিন্ন শাখার সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীকালে বৈদিক যজ্ঞের স্থলে ঘটে-পটে প্রতিমায় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করার রীতি ও প্রথার উদ্ভব ঘটেছে। তবে একেশ্বরবাদের চিন্তাটি কখনো পরিত্যক্ত হয়নি। দেবতারা ঈশ্বর নন। ঈশ্বরের বিভিন্ন শক্তি ও গুণকেই দেবতারূপে প্রতীকায়িত করা হয়েছে।

সমাজ ও ব্যক্তি জীবনের শৃঙ্খলা বিধানের জন্য গৃহীত বিচিত্র বিধি-বিধানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে যে শাস্ত্রের সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকেও বলা হয়েছে ধর্মশাস্ত্র। এখানে ‘ধর্ম’ শব্দটির মানে বিধি-বিধান। এসব বিধি-বিধান অনুসারে উপাসনা ও জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠান করার প্রথা প্রচলিত হয়েছে। সেসব বিধি-বিধান, রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।

সুতরাং কতকগুলো বিশ্বাস, কতকগুলো আচার, কতকগুলো অনুষ্ঠান—এই তিনের মিলই প্রচলিত অর্থে ধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

ছান্দোগ্য উপনিষদে ধর্মকর্মকে তিনটি ভাগে স্থাপন করা হয়েছে : যজ্ঞ, অধ্যয়ন, দান; তপস্যা; আচার্যগৃহে ব্রহ্মচর্য পালন।

যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে ধর্ম চারপদ। অর্থাৎ ধর্ম চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো হলো : তপস্যা, শৌচ, দয়া ও সত্য। তপস্যাই হচ্ছে সাধনা। এই তপস্যা আবার তিন প্রকার।

১. শারীরিক তপস্যা : শারীরিক তপস্যা হচ্ছে—শীত, তাপ, ক্ষুধা, পিপাসা, দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা এবং সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা ইত্যাদি।

২. বাচিক তপস্যা : বাচিক তপস্যা হলো সত্য, প্রিয় ও হিতকর বাক্য ও শাস্ত্রাভ্যাস।

৩. মানসিক তপস্যা : মানসিক তপস্যা হচ্ছে চিত্তের প্রসন্নতা, অক্রূরতা, বাকসংযম, আত্মসংযম, কপটতা না করা ইত্যাদি।

বৈদিক যুগের আর্যদের ধর্মীয় প্রধান অনুষ্ঠান ছিল যজ্ঞ। অগ্নি প্রজ্বালন করে কাঙ্ক্ষিত দেবতার প্রতি স্তুতি করা হয় এবং মর্তের প্রত্যক্ষ দেবতা অগ্নি, তাঁর প্রতি স্তুতি জানানো হয়, তাঁকে উৎসর্গ করা হয় নৈবেদ্য এবং তাঁর কাছে চাওয়া হয় পার্থিব সুখ ও স্বর্গ। যেহেতু অগ্নি মর্তের প্রত্যক্ষ দেবতা, তাই তাঁর মাধ্যমে ইন্দ্র, সূর্য প্রভৃতি দেবতার কাছে স্তুতি জানানো হয়, তাঁদের কাছেও পার্থিব সুখ ও স্বর্গ কামনা করা হয়। এটাই ছিল বৈদিক যুগের আর্যদের ধর্মানুষ্ঠান।

প্রাগার্যদের ছিল পূজা। আর্যরা প্রাগার্যদের কাছ থেকেই ‘পূজাভিত্তিক উপাসনা পদ্ধতি’ গ্রহণ করে। বৈদিক যুগের পর পৌরাণিক যুগে ব্রহ্মের গুণ ও শক্তির প্রতীক বা প্রতিমা নির্মাণ করে প্রত্যক্ষভাবে পূজা পদ্ধতি আর্যরা গ্রহণ করে। ঘটে আর্য ও প্রাগার্য সভ্যতার মিশ্রণ। আর এর মিশ্রণের মধ্য দিয়েই রূপ পায় সনাতনী সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ধর্মটিকে বলা হয় সনাতন ধর্ম। এই সনাতন ধর্মের প্রচলিত নাম হিন্দু ধর্ম।

ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা কখনো কখনো ধর্মের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে উঠেছে। উদ্দেশ্যের চেয়ে উপায় ও আনুষ্ঠানিকতাকে বড় করে দেখা হয়েছে। ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে।

আবার ধর্ম অনড়, অচল নয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রেও ঘটেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু অনেকেই নতুন যুগের উপযোগী পরিবর্তনকে মেনে নিতে চান না। পুরনো ধারণাকে আঁকড়ে থাকেন।

ধর্মদর্শন থেকে নৈতিকতা বা মূল্যবোধ অর্জন প্রত্যাশিত। আমরা তার থেকে দূরে সরে যাই, আনুষ্ঠানিকতাই যেন হয়ে ওঠে ধর্ম। তখন নিজ ধর্ম বা নিজ মতকে কেউ কেউ শ্রেষ্ঠ বলে ভাবে। কেউ কেউ তো অপরের ধর্ম ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। আর সেই মানসিকতা থেকে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা, গোষ্ঠী বা বর্ণবিদ্বেষ।

যুগে যুগে তাই ধর্মীয় নৈতিকতার প্রবক্তারা রুখে দাঁড়িয়েছেন। দিয়েছেন নববিধান। এর মহত্তম দৃষ্টান্ত শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি বর্ণভেদকে বিলুপ্ত করে সবাইকে একই শ্রেণিতে নিয়ে আসার বাণী প্রচার করেছেন। বর্ণভেদের প্রশ্নে শ্রীচৈতন্যদেব ষোড়শ শতকে যে প্রগতিশীলতা, মানবতা ও বৈপ্লবিক চেতনার পরিচয় দিয়েছিলেন, আমরা একুশ শতকে এসেও সামাজিকভাবে তার পরিচয় দিতে পারছি না। মানুষের জন্য ধর্ম, না ধর্মের জন্য মানুষ?

ধর্মচিন্তা বা ধর্মদর্শন আমাদের যে শিক্ষা দিচ্ছে, আমরা তাকে আমাদের নৈতিকতার অংশে পরিণত করতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছি। শুধু ধর্মানুষ্ঠান ও কৃত্যাদি শাস্ত্রানুসারে অনুষ্ঠিত করে চলেছি।

শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠান থেকে আমরা নিষ্কাশন করে নেব নৈতিকতার আদর্শ। শ্রীদুর্গা দেবীকে পূজা করার মধ্য দিয়ে আমরা পাঠ নেব ঐক্যের। কারণ দেবী দুর্গা আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে। পাঠ নেব অশুভ দলনের। কারণ দেবী দুর্গা অশুভকে বিনাশ করে শুভকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা