kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

রাষ্ট্রের ষষ্ঠ অ্যাটর্নি জেনারেলের চিরবিদায়

‘আইনের বাতিঘর’ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল রফিক-উল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ১৬:৫০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘আইনের বাতিঘর’ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল রফিক-উল হক

‘আইনের বাতিঘর’ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আর নেই। তিনি আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটায় মগবাজারস্থ আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রক্তশূণ্যতা, ইউরিন সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি একমাত্র পুত্র সন্তান ব্যারিস্টার ফাহিম উল হকসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া আদ-দ্বীন পরিবার, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। শোক জানিয়েছে।

আজ সকালে তার প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় আদ-দ্বীন হাসপাতালে। তিনি আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় তার পল্টনের বাসায়। সেখান থেকে বায়তুল নেওয়া হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে নেওয়া হয় তার চিরচেনা আইনাঙ্গন সুপ্রিম কোর্টে। সেখানে জানাজা শেষে নেওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

দেশের প্রতিথযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলে গত ১৭ অক্টোবর সকালে পল্টনের বাসায় ফিরে যান। তবে ওইদিনই দুপুরের পরপর তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর গত ১৯ অক্টোবর তার করোনা পরীক্ষা করা হয়। করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসলেও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ২০ অক্টোবর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর থেকে গত কয়েকদিন তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায়ই ছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চিকিৎসক স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ২০১১ সালে। তিনি নিজেও স্টমাক ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তার স্টমাকটি অপসারণ করা হয়েছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। একই সঙ্গে তাঁর বাঁ পাঁজরের তিনটি হাড়ও অপসারণ করা হয়। ২০১৭ সালে বাম পায়ের হাটুতে অস্ত্রপচারের পর থেকে তার চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। একারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না। খ্যাতিমান মানুষটির শেষ দিনগুলো বিছানায় শুয়েই কাটে। চলাফেরা করতে হলে হুইল চেয়ার আর কর্মচারিরাই ছিল তার শেষ দিনগুলোর সাথী।

কলকাতায় জন্ম হলেও তিনি ১৯৬২ সালে জাতীয়তা পরিবর্তন করেন। পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক হওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

নিজের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে দেশের উচ্চ আদালতকে সহযোগিতা করে অনেকবার হয়েছেন আদালতের বন্ধু (অ্যামিকাস কিউরি)। দেশের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবীর সান্নিধ্যে এসে আইন পেশায় সফল হয়েছেন অনেকেই। তিনি ১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের ষষ্ঠ অ্যাটর্নি জেনারেল।

আইন পেশায় ৬০ বছর পার করা এই আইনজীবীর ছাত্রজীবনে রাজনীতি করলেও বড় হয়ে আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত হননি। কিন্তু রাজনীতিবিদরা সবাই তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছেন। জাতীয় নেতাদের কাছে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ইন্দিরা গান্ধী, জহর লাল নেহরু-সবার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

তিনি ছিলেন এক অনন্য সমাজসেবী। বারডেম, আদদ্বীন, আহসানীয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, গাজীপুরে একশ শয্যার সুবর্ন হাসপাতাল, ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশনসহ ২৫টির বেশী হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় যার অনন্য ভ‚মিকা ছিল তার। এছাড়া যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবতার সেবায়।

রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের কাজে বা কথায় উল্টোপাল্টা কোনো কিছু হতে দেখলেই যিনি সরব হয়েছেন। সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। শুধুই সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকনেনি, সঙ্গে বাতলে দিয়েছেন উত্তোরণের পথও। দেশের যেকোনো সংকটের সময় এগিয়ে এসেছেন। কেউ শুনুক আর নাই শুনুক তিনি এই কাজটি করে গেছেন নিয়মিত। এজন্য তাকে কখনও কখনও তীর্যক কথাও শুনতে হয়েছে। তারপরও তিনি থেমে যাননি। শুধুই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনি প্রতিকার পাওয়ারও পথ করে দিয়েছেন। যখন দলীয় সিনিয়র অনেক আইনজীবী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ঠিক তখনই অসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি রাজনীতিবিদদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় দুই নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার দুরভিসন্ধী বলতে গেলে যিনি একাই রুখে দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, তিনি দেশের কিংবদন্তী আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তবে তার শেষ আক্ষেপ ছিল দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসাতে না পারার। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ চেস্টা ছিল তার। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে পেরেছি। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাকেও ওয়ান-ইলেভেনের সময় জেল থেকে মুক্ত করে এনেছি। আবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়াকেও জেল থেকে মুক্ত করতে পেরেছি। এটাই বড় পাওয়া। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।

রফিক-উল হকের জীবনী

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৩৫ সালে সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে জন্ম নেন। তাঁর পিতা মুমিন-উল হক পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। রফিক-উল হকের পিতা ছিলেন চব্বিশ পরগনা (বর্তমান কলকাতা) মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান যা বর্তমানে মেয়র। আর মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। তাঁর বাল্যকাল কেটেছে কলকাতার চেতলায়। পরিবারের সবাই চেতলাতেই থাকতেন। পড়াশোনা করেছেন চেতলা স্কুলে। চেতলা এখন কলকাতার অন্তর্ভুক্ত। তিনি ইসলামিয়া কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৫১ সালে। এই কলেজের ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে পর পর দুবার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। এরপর আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে যোগ দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফৌজদারি আইন নিয়ে পড়াশোনা করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদকও পেয়েছিলেন।

হিন্দু আইন নিয়ে বার-অ্যাট-ল করেন। সেখানেও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ সংবাদ জানার পর হিন্দু আইন পাঠ্য করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং হিন্দু আইনের ক্লাস নেওয়ার জন্য তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পেশাগত জীবনে রাজনীতি না করলেও রফিক-উল হক ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি যুব কংগ্রেস করতেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল যুব কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। তখন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন সেন্ট্রাল যুব কংগ্রেসের সভাপতি। কলকাতায় পড়ার সময় তার বন্ধু ছিলেন ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছাত্র জীবনে তিনি ইন্দিরা গান্ধী, নেহরু ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা