kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

১৫ তলা ভবন নিয়েত্রিমুখী টানাটানি

আরিফুর রহমান   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৩৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৫ তলা ভবন নিয়েত্রিমুখী টানাটানি

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় নির্মিতব্য ১৫ তলা একটি ভবনের জন্য দুই মন্ত্রণালয় ও এক সংস্থার মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি চলছে। এই ভবনে হওয়ার কথা বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি। মূলত গত ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর থেকেই ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়। ভবনটি যাতে কিছুতেই হাতছাড়া না হয় সেই চেষ্টা করছেন মন্ত্রণালয় দুটি ও সংস্থাটির নীতিনির্ধারকরা।

শুধু রূপনগরের জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি ভবনই নয়, রাজধানীর নীলক্ষেতে অবস্থিত জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়নএকাডেমির (এনএপিডি) প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা পেতে চায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ দুটি একাডেমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনপ্রশাসন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দেড় মাস ধরে চিঠি চালাচালির সব তথ্য কালের কণ্ঠ’র হাতে রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, যেহেতু ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে, তাই জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি ভবনটি পরিচালনা করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছে। একই যুক্তি দেখিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির ক্ষেত্রেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলেছে, পরিকল্পনা বিভাগের আওতাধীন প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের আওতায় নেওয়া জরুরি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রতিনিধিদল এরই মধ্যে মিরপুরের রূপনগর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে এসেছে।

অন্যদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদনের প্রক্রিয়া করে থাকে পরিকল্পনা বিভাগ। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিতে জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি ভবনটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন থাকা আবশ্যক। জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির ক্ষেত্রে এ মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, এটা একটি আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় একাডেমি। এই একাডেমি পরিকল্পনামন্ত্রীর নেত্বত্বে একটি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই প্রতিষ্ঠান যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে ১৯৮৫ সালের ওই আইনটি সংশোধন করতে হবে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নামে জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি ভবনের দুটি ফ্লোর পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের যেভাবে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি একাডেমি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশে যত পরিসংখ্যানবিদ আছেন, অথবা যাঁরা পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই একাডেমিতে আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাবে। রূপনগরের ১৫ তলা ভবনটি পরিসংখ্যানের জন্য একটি একাডেমি করে সেটি কাজে লাগানো যেতে পারে। কারণ, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও একটি স্বয়ংসম্পন্ন ও বিশ্বমানের আধুনিক এবং স্বাধীন একটি পরিসংখ্যান একাডেমি জরুরি।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ২০০৯ সালে রূপনগরে ১৫ তলা অত্যাধুনিক ভবনটি নির্মাণে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৮ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ১৫ তলা ভবনের মাত্র এক তলার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বছর জুনের মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ভবনটি হস্তান্তরের জন্য গত ৭ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, সাভারে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, শাহবাগে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি, বিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক বিষয়, আর্থিক বিষয়, প্রশিক্ষণ পরিচালনা এসব কিছু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। যেহেতু ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে, তাই জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি এবং জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।

এর জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, সরকারের ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’-এর সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী জাতীয় উন্নয়ন ও পরিকল্পনা একাডেমি, জাতীয় উন্নয়ন ও প্রশাসন একাডেমি এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে পরিকল্পনা বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা বিভাগেই থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিতে সব সরকারি আধা-সরকারি স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প মূল্যায়ন, ভাষা শিক্ষা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি শুধু বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয় না। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরেক সংস্থা নিতে চাইলে অনেক জটিলতা তৈরি হবে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের প্রধান এবং সরকারের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি এবং জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আশা করছি, শিগগিরই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।’

আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি থেকে আমরা দুটি ফ্লোর চেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও আমাদের দুটি ফ্লোর দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আমরা দুটি ফ্লোর পেয়ে যাব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা