kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

বিদেশে মর্যাদায় পিছিয়ে দেশের চিকিৎসকরা

তৌফিক মারুফ   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিদেশে মর্যাদায় পিছিয়ে দেশের চিকিৎসকরা

আয়ারল্যান্ডের একটি পত্রিকায় সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি একজন চিকিৎসকের কাভার স্টোরি প্রকাশের পর ওই দেশসহ বাইরের দেশগুলোতে বাংলাদেশের ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমমানের কারিকুলামে বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পাঠদান করা হলেও বিদেশে গিয়ে ওই পেশায় নিয়োজিত হতে গেলে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের নতুন করে যোগ্যতার প্রমাণ ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। অথচ ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, ভারত পাকিস্তানসহ আরো কয়েকটি দেশের চিকিৎসকদের এসব লাগে না।

সম্প্রতি আইরিশ টাইমস পত্রিকার প্রচ্ছদজুড়ে ছাপা হয়েছে বাংলাদেশি চিকিৎসক শিরিন আক্তারের ছবি। তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে স্বামীর চাকরি সূত্রে আয়ারল্যান্ড পাড়ি জমিয়েছেন। সেখানে তিনি একটি হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক রেজিস্টার পদে চাকরি করছেন। অথচ সমান একাডেমিক যোগ্যতা থাকা পাকিস্তানের চিকিৎসকরা তাঁর চেয়ে সিনিয়র পদে বা সরাসরি কনসালটেন্ট হিসেবে চাকরি করছেন। এসব বিষয় তিনি পত্রিকাটির কাছে তুলে ধরে বলেছেন, ‘আইরিশ স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক মেধার মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’

ডা. শিরিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আয়ারল্যান্ড সরকারি মেডিক্যাল বিভাগ এখানকার নীতিমালা অনুসারে আমাদেরকে তাদের সমান যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করে না। অথচ বাংলাদেশ, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ আরো অনেক দেশেই একই কারিকুলাম অনুসারে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করা হয়।’

ডা. শিরিন বলেন, ‘শুধু যে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটছে তা নয়, আরো কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রেও আয়ারল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারীরা। আয়ারল্যান্ডে ঠিক কেন পাকিস্তানের এমবিবিএস ডিগ্রিধারীদের অতিরিক্ত কোনো কোর্স না করেই কনসালট্যান্ট পদে চাকরি দেওয়া হচ্ছে তার কোনো ব্যাখ্যা আমরা পাইনি।

আমরা যাঁরা বাংলাদেশের আছি, আমাদের কেন সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়—এর জবাব দেওয়া হয় না। আমার প্রত্যাশা থাকবে বাংলাদেশ সরকার থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিএমডিসি বা সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে বা আয়ারল্যান্ডের মেডিক্যাল কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যাটি  সমাধানের। কারণ এই সমস্যাটি নতুন নয়, কিংবা শুধু আয়ারল্যান্ডেই নয়। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো অনেক চিকিৎসক এমন বঞ্চনা ও বিড়ম্বনার মুখে পড়েন।’

আয়ারল্যান্ডে কর্মরত আরেকজন সিনিয়র বাংলাদেশি চিকিৎসক মুসাব্বির হোসেন রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এখানে আসার আগে সৌদি আরবে কাজ করার সুবাদে এখানে সরাসরি সিনিয়র পদে চাকরি পেয়েছি। কিন্তু আয়ারল্যান্ডে মোট ৩৫ জন বাংলাদেশি চিকিৎসক রয়েছেন যাঁদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্নশিপ করে এখানে এসে তাঁরা সমযোগ্যতায় অন্যদের তুলনায় বঞ্চিত হচ্ছেন। এটা আমাদের সবার জন্যই খুবই দুঃখজনক। এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশই এক ধরনের অসম্মানিত হয়। যেখানে পাকিস্তান, ইরান আমাদের চেয়ে আয়ারল্যান্ডের মেডিক্যাল অথরিটির কাছে বেশি সম্মান পেয়ে থাকে।’

ওই চিকিৎসক আরো বলেন, ‘পাকিস্তানসহ যেসব দেশ থেকে এখানকার মেডিক্যাল অথরিটির সঙ্গে কথা বলেছে কিংবা যোগাযোগ করেছে, তাদের প্রতি আইরিশ সরকার নমনীয় থাকছে। তাই আমরা অনুরোধ করব, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যদি আয়ারল্যান্ড সরকারের মেডিক্যাল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে তবে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল—বিএমডিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আগে আমাদের দেশেও বাইরের অনেক চিকিৎসকরা এসে কোনো রকম যোগ্যতার প্রমাণ না দিয়ে কিংবা অনুমোদন না নিয়েই বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করতেন। এখন আর আমরা সেটি দিচ্ছি না, বরং যেকোনো দেশের চিকিৎসকদের বাংলাদেশে এসে চাকরি করতে হলে অবশ্যই আমাদের অনুমোদন নিতে হবে এবং একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিকিৎসকরা অন্য যেকোনো দেশেই যাক না কেন, সেই দেশের নিজস্ব কিছু প্রক্রিয়া থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সব জায়গায়ই কিছু না কিছু যোগ্যতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, যাঁরা ওই পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন তাঁরা ঠিকই সব দেশেই মাথা উঁচু করে কাজ করতে পারছেন এবং সব দেশই আমাদের সেই চিকিৎসকদের সম্মানজনকভাবে মূল্যায়ন করছে।’

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, ‘যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও মিল আছে আমাদের দেশের কারিকুলামের। এটি একটি উন্নতমানের বৈশ্বিক কারিকুলাম। এ ছাড়া আমরা এটাকে আরো সময়োপযোগী করার কাজ করছি। কারিকুলামের কারণে কোথাও আমাদের চিকিৎসকরা অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে এটা মনে হয় না। যদি কোনো দেশ অন্য কোনো কারণে আমাদের চিকিৎসকদের অবমূল্যায়ন করে সেটা ভিন্ন বিষয়।’

তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাংলাদেশি চিকিৎসকদের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ভারত ও পাকিস্তানকে। বাংলাদেশি এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিংবা যুক্তরাজ্যের কোথাও চাকরির জন্য গেলে সেখানে তাঁদের বাড়তি কিছু যোগ্যতা প্রমাণ ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়; যা ভারত কিংবা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে করতে হয় না। কোথাও কোথাও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা কম্পাউন্ডার বা মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি করেন।

বিএমডিসির চেয়ারম্যান আয়ারল্যান্ড প্রসঙ্গে বলেন, ‘যদি কোনো দেশ আমাদের সমান যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকদের চিকিৎসক হিসেবে কাজের সুযোগ দেয় অথচ আমাদের চিকিৎসকদের সমমানের পদমর্যাদা না দেয়, বঞ্চিত করে বা অবমূল্যায়ন করে সেটা খুবই দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আমাদের জানালে অবশ্যই আমরা সেই দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সম্মানজনক সুরাহা করতে উদ্যোগ নিব।’

বিএমডিসি সূত্র জানায়, দেশে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি এমবিবিএস সনদধারী চিকিৎসক রয়েছেন। যাঁদের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি চিকিৎসক দেশের বাইরে রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নোবেল প্রাইজের জন্য প্রাথমিক একটি তালিকায় মনোনীত হওয়া ডা. রুহুল আবিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তাঁদের সবাই যে চিকিৎসক হিসেবে চাকরি করতে পারছেন তা নয়। এখানে আসার পর একটি পরীক্ষা দিতে হয়, এতে যাঁরা উত্তীর্ণ হচ্ছেন তাঁরাই এখানে চিকিৎসক হিসেবে কাজ পাচ্ছেন। আর যাঁরা ছিটকে পড়ছেন তাঁরা অন্য কোনো কাজ করছেন, এমনকি চিকিৎসক হিসেবে পরিচয়ও দিতে পারছেন না।

তিনি আরো বলেন, অনেকে হয়তো ধৈর্য ধরে ওই পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না বা বিভিন্ন কারণে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেন না কিংবা অন্য সিনিয়র চিকিৎসকের সঙ্গে প্র্যাকটিস করে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার সনদ নেওয়ার অপেক্ষা করেন না। তাঁরা এর চেয়ে অন্য পেশায় কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বা লাভজনক মনে করেন। এ ক্ষেত্রে একেক দেশে হয়তো একেক ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে ওই দেশের পদ্ধতি অনুসারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা