kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

সাদাকালো

অবিশ্বাস্য সামাজিক নিষ্ঠুরতা বন্ধে করণীয়

আহমদ রফিক

অনলাইন ডেস্ক   

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অবিশ্বাস্য সামাজিক নিষ্ঠুরতা বন্ধে করণীয়

এ বছরটাতে সারা দেশ একাধিক ধারায় দুর্ভোগে কাটাচ্ছে। প্রথমত, আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত করোনাভাইরাসের আক্রমণে অসুস্থতা ও মৃত্যু এবং চিকিৎসাবিভ্রাট। এখন তা কিছুটা পিছু হটার পথে, কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় ভীত অনেকে। করোনা প্রসঙ্গ বহু আলোচিত, ওটা থাক।

দ্বিতীয় ধারাটি বরং অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাতে ব্যাপক সামাজিক দূষণের প্রকাশ খুবই স্পষ্ট। একদিকে ব্যাপক দুর্নীতি, যাতে প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত বহু পক্ষ জড়িত, সেই সঙ্গে মাদক বাণিজ্যঘটিত খুন, গুম, এমনকি সম্প্রতি সাংবাদিক খুনের ঘটনা প্রকাশের দায়ে; অন্যদিকে নারী ও শিশু ধর্ষণ বা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ব্যাপকতা।

দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা, যদি এতে জাতির কথিত ভবিষ্যৎ কিশোর-তরুণদের জড়িত থাকতে দেখা যায়, তাও দেশজুড়ে—রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে শহর-গ্রামাঞ্চলে। যেমন দিকে দিকে কিশোর গ্যাংয়ের জঘন্য তৎপরতা, অন্যদিকে দেলোয়ার বাহিনী, অমুক বাহিনী, তমুক বাহিনীর ভয়ে মানুষ তটস্থ।

আমরা কথায় কথায়, লেখায় লেখায় সামাজিক অবক্ষয়ের ও তার ফলাফলের নেতিবাচকতার কথা বলে থাকি। এখন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তা জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে; যেখানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীরও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। কখনো রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা। ফলে সমস্যার সমাধান কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে সদাচারী প্রশাসন বা মাঠপর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে। সে জন্যই বলছিলাম, বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই.

সম্প্রতি এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আবার শীর্ষ সংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দেশব্যাপী নানা মাত্রিক জঘন্য অপরাধ। জাতির ভবিষ্যৎ তাহলে এখন কোন পথে চলছে? এর আগে আমরা দুই দফায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কীর্তিকলাপ, এমনকি সংশোধনাগারে অবিশ্বাস্য ঘটনা নিয়েও লিখেছি। এসব ঘটনার পরিণাম কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এখনো তা আমাদের জানা নেই।

আমাদের পরামর্শ ছিল, র‌্যাবের অভিযানের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশজোড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিষঝাড় উচ্ছেদ করা এবং এদের সংশোধনাগারে পাঠিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনায় সুস্থ জীবনের পথে নিয়ে আসা, অন্তত অপরাধজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজটি নিশ্চিত করা।

কিন্তু কাজটি যে সর্বাংশে সম্পন্ন হয়নি বা করা যায়নি, তা তাদের বক্তব্যেই প্রতিফলিত। এরই মধ্যে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাদের পূর্বোক্ত আশঙ্কা বাস্তব প্রতিপন্ন করে এরই মধ্যে একটি দৈনিকে আমার চিন্তায় বোমা ফাটানোর মতোই একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘আ. লীগ নেতার নেতৃত্বে ভয়ংকর কিশোর গ্যাং’।

প্রতিবেদনে বিশদ বিবরণ রয়েছে নেতার বিষয়ে। ছোট হরফে শিরোনাম : ‘কিশোরকে খুন করে ধরা’। নানা অপকর্মে লিপ্ত এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। আরেকটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘অপহৃত যুবক উদ্ধার/কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য গ্রেপ্তার’।

এদের আরেকটি লক্ষ্য নারী-শিশু-কিশোরী-তরুণীদের একা বা সুবিধাজনক অবস্থানে পেয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ। আর স্কুলে বা শিক্ষায়তনে যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করা তো দীর্ঘদিনের নিয়মিত ঘটনা। সমাজশক্তি, শিক্ষায়তন কর্তৃপক্ষ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশকেও এসব ক্ষেত্রে উদাসীন বা নির্বিকার থাকতে দেখা গেছে।

এই ইতিহাস আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। কিন্তু এসব থেকেই দ্রুত গজিয়ে উঠেছে মাদকাসক্তি, নারী ধর্ষণ, গুম, খুন ও বড় ভাইয়াদের স্বার্থের টানে। পরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। শেষোক্ত কারণটি গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে এত অল্প সময়ে এতগুলো কিশোর গ্যাং গঠিত ও সক্রিয় হয় কিভাবে, তৎপরতা অব্যাহত রাখেই বা কেমন করে। আশুলিয়ার এক ঘটনায় সংবাদ শিরোনাম : ‘নির্জনে পেয়ে ধর্ষণ করে কিশোর গ্যাং’।

তিন.

আরেকটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘সাভারে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই খড়্গ’। ‘স্কুলছাত্রী নীলা খুন : ২৬ সংগঠনের প্রতিবাদ কাল’—এমন এক নৈরাজ্যিক অবস্থায় মনে প্রশ্ন জাগে না কি আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?

অবস্থা চরম পর্যায়ে না পৌঁছালে কি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে ১২ সুপারিশ’ প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে? তাদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের দুর্বৃত্তপনা ও সন্ত্রাসীপনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সেই সঙ্গে তাদের অভিমত : ‘হুমকির মুখে পড়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি’।

এ বিষয়ে তাদের দীর্ঘ প্রতিবেদনের সুপারিশ উল্লেখে না গিয়ে আমাদেরও পরামর্শ : ব্যবস্থাগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে জন্য দরকার দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা, কিশোর গ্যাংগুলো শনাক্ত করা, প্রত্যেক সদস্য গ্রেপ্তার এবং যেমনটি আগে বলেছি, তাদের সংশোধনাগারে প্রেরণ।

কিন্তু সমস্যা তো শুধু কিশোর গ্যাংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের নানা স্তরে এ দূষণ এবং বিস্তার, সেখানে নানা স্বার্থের টানে অনৈতিকতার চরম আয়োজন। নেপথ্যে কায়েমি স্বার্থ ও রাজনীতির পক্ষ বিস্তার। সেখানে হাত দিতে হবে। না হলে উৎস থেকে যাবে, তা থেকে নতুন সংগঠন গজাবে।

কিন্তু বড় প্রশ্নটা সচেতন মানুষের মনে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে : করোনা দুর্ভোগের মধ্যে ‘হঠাৎ এত খুন, এমন নৃশংসতা’ (১৭.১০.২০২০, কালের কণ্ঠ), কেন, কী তার কারণ। করোনা সংকট কি তাদের হঠাৎই সহিংস হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করেছে? কিংবা শ্রেণিবিশেষের কর্মহীনতা, হতাশা বা অনুরূপ পরিস্থিতি লোভ-লালসা বা যৌনবৃত্তির অপরাধকে উসকে দিচ্ছে?

ঘটনাগুলো বড় নৃশংস; পৈশাচিক বললে অত্যুক্তি হয় না। ‘ঘরে ঢুকে শিশুসন্তানসহ চারজনকে গলা কেটে হত্যা’, ‘গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যা’, মাকে পাহারায় রেখে দুই ছেলের ‘বাবাকে হত্যা’—এমন অনেক অমানুষিক নিষ্ঠুরতার ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটে চলেছে। গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে দল বেঁধে নির্যাতনের মতো ঘটনা এর আগে দেশব্যাপী প্রতিবাদে উত্তাল করেছে। তা এখন লংমার্চে পরিণত।

কেন, কেন বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ অমানুষে পরিণত হলো? উল্লিখিত কারণগুলোর সহজ সরলীকরণে এই ভয়ংকর প্রশ্নের জবাব মেলে না। আসলে দায়টা সবার। পরিবার (অভিভাবক), শিক্ষায়তন, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সুস্থ সমাজ গঠনে ব্যাপক সংস্কৃতিচর্চা, ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি প্রদর্শনের মতো বিষয়াদির নিয়ন্ত্রণসহ সুচিন্তিত কর্মসূচি প্রণয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবায়ন এই অসুস্থ মানসিকতা ও দূষিত আচরণ বন্ধ করার পথের বিকল্প পথ আছে বলে মনে হয় না। কাজটা খুব কঠিন। এ ক্ষেত্রে গোটা জাতিকে, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে প্রশাসনের সহযোগিতায়। আর প্রশাসনকেও হতে হবে দক্ষ, দলনিরপেক্ষ, ইতিবাচক এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূল।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা