kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

অপরাধজগতে কে কার

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:৫২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অপরাধজগতে কে কার

লেখার কাজটা সহজ নয়, পরিশ্রম হয়; কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে লেখা নিজের থেকেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বেপরোয়া সব ঘটনা এসে আছড়ে পড়ে, ছাপ রাখে, ছাপটা ওই লেখার মতোই, প্রকাশ করা যায় না, এই যা। ঘটনাগুলো ব্যক্তিগত আবার তারা সমষ্টিগতও। ব্যক্তিগত ঘটনাও সমষ্টির দ্বারা প্রভাবিত। অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত। ইতিহাস তৈরি হতে থাকে; সমষ্টিগত ইতিহাস, ব্যক্তি যার ভেতরে থাকে, জালে ধরা পড়া মাছের মতো।

লেখা প্রকাশ করার কথা খবরের কাগজের। তারা সেটা ঠিকমতো করতে পারে না। যা লিখতে চায়, তা লিখতে পারে না। নিষেধগুলো দণ্ডায়মান থাকে পাহারায়। যে জন্য ইদানীং দেখা যাচ্ছে পত্রিকার পাঠক কমে যাচ্ছে। অন্য কারণও আছে, তবে সবচেয়ে বড় কারণ স্বাধীনভাবে লিখতে না পারা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সাক্ষী সংবাদই, যে সংবাদ উঁকি দেয়, কিন্তু তাকে চাপা দিতে হয়। আরেক সাক্ষী পত্রিকার সম্পাদকীয়। দেখা যাবে পত্রিকার সম্পাদকীয়ই হচ্ছে সবচেয়ে কম আকর্ষণীয়। কারণ সেগুলো দায়সারা গোছের, বেশির ভাগ সময়েই খালি জায়গাটা ভরতে হয়, তাই বুঝি লিখতে হয়। সেটা যাঁরা লেখেন তাঁরা জানেন, যাঁরা পড়েন তাঁরা টের পান একেবারে প্রথম বাক্যটা পড়েই, কখনো বা এমনকি শিরোনামটা দেখেই। অথচ সম্পাদকীয়র হওয়া চাই স্বাধীন ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর। হায়রে, দেখতে পাচ্ছি কণ্ঠ আছে, তবে কণ্ঠের স্বর বড়ই ক্ষীণ।

সবচেয়ে জবর খবর হওয়ার কথা রাজনীতির। কারণ তাতে মানুষের আগ্রহ থাকে। রাজনীতির মূল জায়গাটা হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা। প্রাণভোমরাই বলা চলে। সেই ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে, আমজনতার সমষ্টিগত ভাগ্যও তাদের হাতেই ন্যস্ত। ব্যক্তিগত ভাগ্যগুলো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। দেশে রাজনীতি অবশ্যই আছে; কিন্তু জনসাধারণের জন্য রাজনীতির কোনো খবর নেই। খবর তৈরি হতে পারত যদি বিরোধী দল মাঠে থাকত। তারা মাঠে নেই অর্থাত্ কিনা মাঠে থাকার মতো অবস্থা তাদের নেই। একচ্ছত্র দল একতরফা দৌড়াদৌড়ি করে যতই গোল দিক না কেন, তাতে দর্শকদের কোনো কৌতূহল থাকে না। তারা মাঠে যেতেও চায় না, যার প্রমাণ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে না চাওয়া। তা দেশে সব ধরনের নির্বাচনের ব্যবস্থাই এখন মোটামুটি ধরাশায়ী অবস্থার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে; এমনকি নির্বাচনে কোনোমতে জিতলেও বিপদাপদ পিছু ছাড়ে না। যেমনটা ডাকসুর বর্তমান ভিপি টের পাচ্ছে। তাকে বারবার বহুবার প্রহার তো করা হয়েছেই, এখন নাকি প্রাণনাশের হুমকিও সে পাচ্ছে। জাতীয় সংসদের কয়েকটা উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে। একটা কেন্দ্র থেকে ‘সুখবর’ পাওয়া গিয়েছিল। শোনা গিয়েছিল সরকারি দলের ছাড়া অন্য সব দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়ে গেছে। সুখবর এই জন্য যে তাতে সরকারি দলের পক্ষে মাঠে না গিয়েই জেতার সম্ভাবনা সুনিশ্চিত ছিল। এতে অর্থ ও শ্রমের অপব্যয় থেকে দেশ ও জাতি কিঞ্চিত্ পরিমাণে হলেও পরিত্রাণ পেত। পরে জানা গেছে, আপিলে বিএনপি প্রার্থীর আবেদন না টিকলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরটা টিকেছে। নির্ভেজাল ‘সুখবর’ পাওয়াটা এখন দেখা যাচ্ছে আমাদের জন্য সত্যি কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভালো কথা, কয়েক দিন আগে জাতীয় ভোটার দিবস উদযাপিত হলো। প্রশ্ন উঠেছিল ভোটারদের কম উপস্থিতি নিয়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাফ কথা—ভোটার আনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। একেবারে খাঁটি কথা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওপর যে মানুষের আস্থা তৈরি হয়নি তার দায়িত্বটা কার? নির্বাচন কমিশনের, নাকি ভোটারদের? সে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি। তবে এক ধরনের জবাব কমিশনের একজন সদস্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভোটদানে ব্যর্থতার জন্য দায়ী অন্য কেউ নয়, দায়ী ভোটার নিজে। তাইতো, বটেই তো। অপর একজন সদস্য, যিনি সাধারণত চিন্তা-ভাবনা করেই কথা বলেন; বলেছেন যে ভোটারের অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আমাদেরও সেটা ধারণা। তবে কার কথা কে শোনে। আইনমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। আর গণতন্ত্র ছাড়া দেশ আস্থাহীন দেশের মতো। মনে হয়, মূল্যবান ওসব কথা তিনি বইতে পড়েছেন। তা আমরাও কেউ কেউ ওসব কথা পড়ে থাকব; কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা অনেকেই এখন আর ভোটকেন্দ্রে যাই না সেখানকার পরিবেশ এবং ভোটের ফলাফল বিষয়ে পূর্বধারণার কারণে।

রাজনীতির পরেই জমকালো খবর আসতে পারে অপরাধের জগত্ থেকে। আসেও। ওই খবরগুলো হতভাগ্য পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ঠিক সেই কারণে, যে কারণে অন্ধকার সব সময়েই অনেক বেশি রহস্যময় ফকফকে আলোর চেয়ে। অপরাধ তো প্রতিনিয়তই ঘটছে। খুন, জখম, গুম, ধর্ষণ, সড়কে মানুষ হত্যা, টাকা পাচার, দুর্নীতি—এগুলোর খবরেই তো পত্রিকার বেশির ভাগ পাতা ভর্তি থাকে। তবে এসব এখন একদিকে একেবারেই পানিপান্তা, অন্যদিকে নিতান্ত গা-সওয়া। দাগ কাটে না, পরিসংখ্যানের নিষ্প্রাণ অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা চাঞ্চল্যকর অপরাধের খবর অন্ধকার ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং আরো বড় অন্ধকারের খবর দেয়। যেমন—শামীমা নূর পাপিয়ার ঘটনা।

কবিদের কল্পনাও হার মেনেছে বাংলাদেশের এক মেয়ের অসাধারণ এক পাপিয়া হয়ে ওঠার কাছে। বাস্তবতা পরাভূত করেছে কল্পনাকে। তা পাপিয়ার উত্থানের রহস্যটা কী? নিশ্চয়ই তার ‘মেধা’ ছিল, যে মেধাকে সে কাজে লাগিয়েছে। তার মেধাই তাকে বাতলে দিয়েছে উঠতে হলে কোন সিঁড়িটা ধরা চাই। সিঁড়িটা রাজনীতির। বলাই বাহুল্য সরকারদলীয় রাজনীতির। পাপিয়া নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিল। তার আগে সে ছিল ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী। পাপিয়ার পদটা ছোট, কিন্তু ওই পদ ব্যবহার করার মতো বড় মেধা তার ছিল। সেটা সে ব্যবহার করেছে এবং তরতর করে ওপরে উঠে গেছে। না, বড় নেতা হয়নি। সেটা হওয়া তার লক্ষ্য ছিল না। মোটা টাকা করেছে, টাকার জোরে এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সে ভীষণ ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। সেটাই ছিল তার লক্ষ্য। তার নিজস্ব একটা বাহিনীও ছিল।

পাপিয়া টাকা করেছে এবং টাকা খরচও করেছে, যাতে আরো টাকা করা যায়। ব্যবসার নিয়ম এটাই। টাকা খাটাতে হয়, টাকাই টাকা ধরে নিয়ে আসে। শোনা যাচ্ছে ওই যে ছোট্ট একটা পদ, নরসিংদী জেলার যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক, ওই পদ পাওয়ার জন্য তার বিনিয়োগ ছিল গুনে গুনে চার কোটি টাকার। তার পরে এমপি হওয়ার জন্য আরো বড় বিনিয়োগ সে করেছিল। সেটা ১০ কোটির। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ফল পায়নি, টাকাটা মার গেছে। বেইমানি করা হয়েছে তার সঙ্গে। এমপি হলে তার ক্ষমতা যে বহুগুণে ফুলেফেঁপে উঠত, তা অনুমান করা যায়। তবে অতটা হয়তো সে উঠতে পারত না, যতটা লক্ষ্মীপুর এলাকার এক এমপি সাহেব উঠেছেন। তিনি চৌদ্দ শ কোটি টাকা পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। টাকাটা এসেছে মূলত নারীপাচার থেকে। তাঁর স্ত্রীও নাকি একজন এমপি, সংরক্ষিত মহিলা আসনে। দুইয়ে মিলে করি কাজ। নরসিংদীর পাপিয়ার আশা ছিল, ভরসাও ছিল। ভরসাটা হলো রাজনৈতিক। অনৈতিক কাজে রাজনৈতিক ভরসা। ক্ষমতাধর অনেকের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল, সে কারণে অন্যরা তাকে সমীহ করত। কিন্তু ধরা পড়ল কেন? সেটা আমরা জানি না। সে রহস্য পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা কম। হতে পারে পাপিয়ার কাজ এত বড় হয়ে উঠেছিল যে আবরণ দিয়ে তাকে আর ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। আবার এমনও সম্ভব যে ঈর্ষাকাতর কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অপরাধজগতে তুমি কার, কে-ই বা তোমার।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা