kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

ডিএনসিসির মশা নিধন

ট্রায়াল শেষ না হতেই ৪৫ লাখ টাকার ওষুধ ক্রয়

শাখাওয়াত হোসাইন   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ট্রায়াল শেষ না হতেই ৪৫ লাখ টাকার ওষুধ ক্রয়

আসন্ন শীত মৌসুমে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ‘চতুর্থ প্রজন্মের’ লার্ভিসাইট ব্যবহার করার ঘোষণা দেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মশা নিয়ন্ত্রণে নোভালিউরন নামে এই ওষুধ সংস্থাটি ‘মসকিউরন’ ট্যাবলেট নামে ব্যবহার শুরু করছে বলে জানা যায়।

কিন্তু নতুন কোনো কীটনাশক বা ওষুধ আমদানি করে ব্যবহার করলে বেশ কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে যেতে হয়। সেই ধাপ কতটা অনুসরণ করা হয়েছে তা জানতে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি অনুসন্ধান চালায় কালের কণ্ঠ। নোভালিউরন একবার প্রয়োগ করলে কমপক্ষে ৯০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে বলে ডিএনসিসিকে অবহিত করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘টেক ইন্টারন্যাশনাল’। কিন্তু সেই ট্যাবলেট আসলেই ৯০ দিন পর্যন্ত কাজ করে কি না, আবার পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি সাধন করছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই ৪৫ লাখ টাকার বেশি ওষুধ কিনে নিয়েছে ডিএনসিসি। আবার ল্যাব ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার আগেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে আমদানিকারককে। এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে সেই ওষুধ ব্যবহারও শুরু করেছে ডিএনসিসি। গত শনি ও রবিবারে প্রায় ১২০টির মতো স্থানে এই ওষুধ প্রয়োগ করেছে সংস্থাটি।

ডিএনসিসি জানিয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা আক্তারের তত্ত্বাবধানে এবং ডিএনসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পৃথকভাবে তিন মাসব্যাপী সফল পরীক্ষা চালানো শেষে কীটনাশকটি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়েছে। যেসব প্রাণীর দেহে ‘কাইটিন’ নামে একটি উপাদান রয়েছে শুধু সেসব প্রাণীর লার্ভার বৃদ্ধি ঠেকিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই ওষুধ। মশার লার্ভায় কাইটিন নামে একটি উপাদান থাকায় স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ‘নোভালিউরন’। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০ জুলাই ল্যাবে নোভালিউরনের কার্যকারিতা শুরু করেন জাবি শিক্ষক তাহমিনা আক্তার। ল্যাবে পরীক্ষার ৯০ দিন পার হয়েছে গতকাল রবিবার। কিন্তু ফলাফল প্রস্তুত করতে আরো ১৫ দিনের মতো লাগবে বলে তিনি জানিয়েছেন। একইভাবে গত ৩০ জুলাই মহাখালীর ডিএনসিসি কাঁচাবাজারে মশার প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট লার্ভায় পরীক্ষামূলকভাবে নোভালিউরন প্রয়োগ করা হয় ডিএনসিসির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। সে হিসাবে পরীক্ষার ৮০ দিন পার হয়েছে। কিন্তু গত ২৩ এপ্রিল ৫০০ কেজি নোভালিউরনের কার্যাদেশ দেয় ডিএনসিসি। প্রতি কেজি নোভালিউরনের দাম ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৬ টাকা ৫৫ পয়সা। এর মধ্যে আগস্টেই ৯৯ কেজি নোভালিউরন সিটি করপোরেশন গ্রহণ করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে পৃথক তিন দিনে ৩৮৯ কেজি নোভালিউরন গ্রহণ করেছে ডিএনসিসির ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ। সেই হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষার ৯০ দিন পার হওয়ার আগেই ৪৫ লাখ পাঁচ হাজার ৫৪৪ টাকার নোভালিউরন গ্রহণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

এদিকে প্রাথমিকভাবে জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মেডিক্যাল এন্টামোলজি ল্যাবে নোভালিউরনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার। কিন্তু ওই ল্যাবটিতে গত রবিবার গিয়ে সে ধরনের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে তাহমিনা আক্তারের এই প্রতিবেদক জানান, তাঁর বাসায় পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং চাইলে সেখানে গিয়ে তা দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিবেদক বাসায় গিয়ে তা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেও তিনি সেখানে অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তা ছাড়া জবির শিক্ষক ল্যাব এবং ফিল্ড এই দুই জায়গায় পরীক্ষা করছেন বলে সিটি করপোরেশন জানিয়েছে। কিন্তু মাঠে কোনো পরীক্ষা করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাহমিনা আক্তার। 

তাহমিনা আক্তার কালের কণ্ঠকে জানান, ‘বিভাগের ল্যাবে কাজ করতে জটিলতা ছিল। তাই আমি বাসায় তা করছি। এই বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। পরীক্ষার ৯০ দিন আজ (রবিবার) পার হয়েছে। তবে ফলাফল প্রস্তুত করতে আরো ১৫ দিনের মতো লাগবে। আমি শুধু ল্যাব টেস্ট করছি, মাঠে কোনো পরীক্ষা আমি করছি না।’ 

তবে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, নোভালিউরন সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে আনা হয়েছে। ল্যাব ও ফিল্ড পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ার কারণে ৫০০ কেজি ওষুধের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ফলাফল পাওয়া গেলে আরো বড় পরিসরে আনতে হবে।

ডিএনসিসির উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ল্যাব রিপোর্ট দু-এক দিনের মধ্যে পাব। ফিল্ড টেস্টও তাহমিনা আক্তার করছেন। ল্যাব ও ফিল্ড টেস্টের ফল না পাওয়ার কারণে ৫০০ কেজি ওষুধের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। রেজাল্ট পাওয়ার পর হয়তো পাঁচ টনের অর্ডার দিতে হবে একসঙ্গে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গবেষক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসায় কাজ করাটা অনৈতিক। এতে ফলাফল নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নাও থাকতে পারে। এ ধরনের পরীক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করা উচিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা