kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

সাক্ষাৎকার: সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী

স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলে

তৈমুর ফারুক তুষার   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলে

পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধের পেছনে মূল কারণ ছিল তাদের সুপারিশ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দেওয়া। স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ হয়েই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। কালের কণ্ঠকে এ কথা বলেছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন।

পরবর্তী সময় অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ওই ঘটনার পর আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও ফেরা হয়নি তাঁর। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সংবিধান ও ম্যানিফেস্টো ভিত্তিক কর্মসূচির রাজনীতিতে, উন্নয়নের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত আছি এবং থাকব।’

সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি—এটি একটি গালগল্প ও মনগড়া কথা। অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক কথা। একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কথা। এই ষড়যন্ত্র যখন চারদিকে ডালপালা মেলে, অসত্য ও মিথ্যা অভিযোগ যখন গোয়েবলসি কায়দায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তখন পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করি আমার দপ্তর পরিবর্তন করে দিতে। প্রধানমন্ত্রী জানতেন পদ্মা সেতু নির্মাণের ওই পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা। কারণ পদ্মা সেতু নির্মাণে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি, কোনো চুক্তি হয়নি, কোনো অর্থ ছাড় হয়নি, সে পর্যায়ে দুর্নীতির প্রশ্ন আসে কিভাবে? পরের ইতিহাস সবার জানা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত ও কানাডার আদালতের রায়ে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতুর সমন্বয়ক জনৈক বিহারি এই ষড়যন্ত্রে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আমি মনে করি, বিশ্বব্যাংক সৃষ্টির পর থেকে আরো ১০০ বছরেও পদ্মা সেতুর মতো মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে তারা আর সুযোগ পাবে না। বিশ্বব্যাংকের সেই রবার্ট জোয়েলিক এখন কোথায়? মিস গোল্ড স্টেইন এখন কোথায়? সেই লুইস ওকাম্পোর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অথচ তাঁরা বাংলাদেশে এসে সততার নাটক করেছেন। এখন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা হলে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন, লজ্জিত হন। আমাকে সমীহ করেন। আমি সম্মানিত হই।’

বিশ্বব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার কারণ এবং এত দিন পর তাঁর মূল্যায়ন সম্পর্কে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু বাংলাদেশের স্বপ্নের সেতু। বিশ্বব্যাংক, জাপানের জাইকা, এডিবি, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের অঙ্গীকার পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয় বিশ্বব্যাংক। আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি কার্যক্রম দুই বছরে শেষ করি। প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি ঠিকাদার নিয়োগ ও কনসালট্যান্ট (পরামর্শক) নিয়োগের কার্যক্রমের ধাপ অতিক্রম করেছিল। ঠিকাদার নিয়োগের একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক কারিগরি কমিটিকে যোগ্য এক দরদাতাকে বাদ দিতে বলে এবং অযোগ্য এক দরদাতাকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে বলে। কারিগরি কমিটি বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী যোগ্য দরদাতাকে বাদ দিলেও অযোগ্য দরদাতাকে যোগ্য বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ বিশ্বব্যাংকের সমর্থিত দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি অভিজ্ঞতার জাল সনদ দিয়েছিল। কারিগরি কমিটি বিশ্বব্যাংককে বিষয়টি জানিয়ে দেয়। ফলে এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক কারিগরি কমিটির কাছে নানা কোয়ারি (অনুসন্ধান) করে এবং কারিগরি কমিটি বিশ্বব্যাংকে তাদের মতামত যুক্তিসহ প্রেরণ করে। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠানটির বড় ধরনের ঘাপলা বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাংক এ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাদের সমর্থিত দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রি-কোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। মূলত বিশ্বব্যাংক তাদের সমর্থিত দরদাতাকে নিয়োগ দিতে না পারায় তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ আনে।’

বিশ্বব্যাংক বলেছিল আপনাকে সরিয়ে দিলে সেতুর কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু আপনাকে সরিয়ে দেওয়ার পরও স্থগিত কার্যক্রম তারা আর শুরু করেনি—এটি কি কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে হয়েছিল কি না জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক যখন তাদের সমর্থিত ঠিকাদারকে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। একপর্যায়ে ঠিকাদার নিয়োগে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে আমাকে টার্গেট করে এবং আমাকে সরিয়ে দিলেই বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে, সেতুর কাজ চালিয়ে যাবে এমন কথা বলতে থাকে। কিন্তু আমি জানতাম এটি তারা করবে না। কারণ তৎকালীন ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি মিস গোল্ড স্টেইন আমাকে এক ডিনারে বলেছিল,  Mr. Hossain, don’t go fast. Don’t complete the bridge during the tenure of this government. এই বিষয়টি আমি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছিলাম। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে আমি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পরও বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন কার্যক্রম শুরু করেনি। এটি ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।’

দুর্নীতির খবর ঢালাও প্রকাশের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমগুলো দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, ‘এ কথা সত্যি, দেশের গণমাধ্যম পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অসত্য ও ভুয়া খবরকে উপজীব্য করে আমার বিরুদ্ধে ঢালাও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বেনামি দরখাস্তের ভিত্তিতে অসংখ্যবার একই বিষয়ে প্রতিবেদন করেছে। চ্যানেলগুলোতে খবরের কাগজগুলোর রিপোর্টকে উপজীব্য করে টক শোতে নানা বুদ্ধিজীবী মহল অশোভন কথা, অসত্য কথা ছড়িয়েছে। কিন্তু দুদকের তদন্ত ও কানাডার আদালতের রায়ের পর পত্রিকার তরফ থেকে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। তবে সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান এক টক শোতে সবার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। টক শোতে আলোচনাকারী বুদ্ধিজীবীদের বেশ কয়েকজন আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সরকারের কাছে পুনরায় আমাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছিলেন।’

জাপানি অর্থায়নে জাপানি পরামর্শকের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সিঙ্গেল ডেকার পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল, আপনি ডাবল ডেকার সেতু কেন করলেন জানতে চাইলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘সিঙ্গেল ডেকার মানে মাঝখানে রেল যাবে এবং দুই পাশ দিয়ে গাড়ি যাবে। সিঙ্গেল ডেকার সেতু নির্মাণে সময় বেশি লাগে এবং ব্যয়ও বেশি হয়। আমি ডিজাইন কনসালট্যান্ট মনসেল এইকমের কাছে ডাবল ডেকার সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রাখি। কারণ চীন ও কোরিয়ায় ডাবল ডেকার সেতু আমি দেখেছি। এ ধরনের সেতু তৈরিতে সময় কম লাগে, দ্রুত শেষ করা যায় এবং ব্যয়ও কম হয়। ডাবল ডেকার সেতুর অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি পরামর্শক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করি। পরে পুরো বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর উপস্থাপিত হলে তিনি তা অনুমোদন করেন।’

বর্তমানে শিক্ষা বিস্তারে নিজের কাজের কথা তুলে ধরে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি এলাকায় ছয়টি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি। এর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। আমি অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছি, প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছি। ১৫০টির অধিক প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি, যার কমিউনিটি পার্টিসিপেশনের অর্থ পুরোটা আমি বহন করেছি। এগুলো পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে আমি নানা মহল থেকে প্রশংসিত হয়েছি। পুরস্কৃত হয়েছি। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বিদ্যাসাগর পদক প্রদান করে এবং আমাকে বাংলাদেশের বিদ্যাসাগর হিসেবে অভিহিত করেছে। আজ আমার জন্মস্থান ডাসার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য, সুন্দর অবকাঠামোর জন্য, দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা