kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পরীক্ষা বাড়লেই বাড়ছে রোগী

তৌফিক মারুফ   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পরীক্ষা বাড়লেই বাড়ছে রোগী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-১৯ সংক্রমণজনিত মানচিত্রের রঙে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উচ্চ সংক্রমিত দেশের তুলনায় কমের দিকে নেমে আসছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে এখনো পরীক্ষা বাড়লেই বাড়ছে শনাক্তকৃত রোগী বা করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। শনাক্তের মোট হার অনেক দিন ধরেই ঝুলে আছে ১৮ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ মোট হিসাবে ১০০ জনে ১৮ জন এখনো করোনায় আক্রান্ত। অন্যদিকে দৈনিক হিসাবে ১০০ জনের পরীক্ষায় ১০ জনের বেশি মানুষের শরীরে মিলছে করোনাভাইরাস; যদিও মৃত্যু এখনো অন্য উচ্চ সংক্রমিত দেশের তুলনায় অনেকটাই নিচে রয়েছে বাংলাদেশ। দৈনিক মৃত্যুও অনেক দিন পরে তুলনামূলক নিচে নামছে।

তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারাতে হচ্ছে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ আপনজনদের। সব মিলিয়ে দেশ এখন পর্যন্ত মহামারি পরিস্থিতির নিরাপদ অবস্থানে যেতে পারেনি, বরং এর মধ্যেই উঁকি মারছে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা। আবার এক মাসেরও বেশি হলো সরকার অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দিলেও এখন পর্যন্ত কিট হাতে না পাওয়ায় ওই পরীক্ষা শুরু করতে পারেনি সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে মৃত্যু কম থাকলেও গত এক সপ্তাহে দেশে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছিল ৮১ হাজার ৭২৩টি নমুনা, এর মধ্যে শনাক্ত ছিল ৯ হাজার ৫০৮ জন। পরের সপ্তাহে অর্থাৎ ১১ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত পরীক্ষা হয় ৯০ হাজার ১৭৪টি নমুনা। শনাক্ত হয় ১০ হাজার ২২২ জন। এ ক্ষেত্রে সপ্তাহ ব্যবধানে পরীক্ষা বেড়েছে ১০.৩৪ শতাংশ এবং শনাক্ত হার বেড়েছে ৭.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ আগের মতোই এখনো পরীক্ষা বাড়লেই শনাক্ত বাড়ছে। এখন যারা পরীক্ষা করাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগেরই উপসর্গ থাকছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।

রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখনো নিরাপদ পর্যায়ে যাইনি। কিন্তু সবাই যেন নিজেদের নিরাপদ ভাবছেন। এতে সামনে বিপদ আরো বাড়বে। যেহেতু ইউরোপে আবার সংক্রমণ বাড়ছে আর সেখান থেকে আমাদের দেশে আসা-যাওয়াও বাড়ছে, তাই ওই সব দেশ থেকে আগের মতো আবারও আমাদের দেশে নতুন করে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে কেউ নিজেকে বা অন্যকে নিরাপদ না ভেবে সবার উচিত সতর্ক থাকা, মাস্ক ব্যবহার করা, হাত ধোয়াসহ অন্যান্য অপরিহার্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।’

অন্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ রেখা অনেক উঁচু থেকে একেবারে নিচে নেমে গিয়েও আবার যেভাবে ওপরে উঠছে, সেদিকে নজর রাখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণীয় পর্যায় থেকে সেদিকে নজর রেখেই বারবার সতর্ক করা হচ্ছে সবাইকে। মানুষের অসতর্ক ও অসচেতন চলফেরা ও জীবনযাত্রায় বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

এদিকে আগে দেশে করোনাভাইরাসের আরো কয়েকটি ধরন ছিল এবং মানুষ প্রতিবছরই পুরনো সেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতো। ফলে এখন যারা শনাক্ত হচ্ছে তারা সবাই কভিড-১৯ ভাইরাসেই আক্রান্ত নাকি পুরনো ধরনের করোনায় আক্রান্ত তা দেখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন কেউ কেউ।

অণুজীব বিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ চাইল্ডহেলথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা মিরাকল বা ব্যতিক্রমই বলতে হবে। নয়তো এখানকার মানুষের যে অবস্থা এবং সংক্রমণের যে পরিস্থিতি ছিল তাতে পথে-ঘাটে মানুষের লাশ পড়ে থাকার কথা ছিল। আমরা অনেকেই তেমন আশঙ্কাও করেছিলাম। কিন্তু কাকতালীয়ভাবেই তেমন পরিণতি আমাদের দেখতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে কিছুটা সরকারি-বেসরকারি পদক্ষেপের সুফল হলেও বেশির ভাগই অন্য কোনো অজানা রহস্য কাজ করছে। যেটা হয়তো আমরা বড় বা ভালো কোনো মৌলিক গবেষণা করতে পারলে বের করতে পারতাম। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।’

তিনি মানুষের শরীরে করোনার প্রভাব ও অ্যান্টিবডির বিষয়ে বলেন, আগের কমন কোল্ড ডিজিজ বলে করোনাভাইরাসের যে প্যাটার্নগুলো আমাদের মানুষের প্রতিবছর আক্রান্ত করেছে, সেটার অ্যান্টিবডি হয়তো আমাদের এখন কিছুটা সুবিধা দিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে আমাদের পরিবেশে বা মাটিতে যেসব করোনাভাইরাস রয়েছে সেগুলো থেকেও সুফল পেতে পারি। কারণ আমরা জানি, বিশ্বে যত ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া আছে তার ৯৯ শতাংশই উপকারী। বাকি ১ শতাংশের মতো মানুষের জন্য রোগের সৃষ্টি করে বা ক্ষতি বয়ে আনে। ফলে এখনো হয়তো কোনো পুরনো করোনাভাইরাস আমাদের তুলনামূলক সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে।’

তিনি উহাহরণ তুলে ধরে বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁদের সন্তানদের দেশে নিয়ে এলেই তারা জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি কিংবা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের পরিবেশ আর এখানকার পরিবেশের ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত তারতম্য কাজ করে। পরে আবার তারা সুস্থ হয়ে যায়। তো নতুন কোনো ভাইরাস এখানে এলে সেটা প্রথমে মানুষকে যতটা আক্রান্ত করেছে, কিছু সময় পর তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটা যে কেবল বাংলাদেশেই হচ্ছে তা কিন্তু নয়, অনেক দেশেই হচ্ছে যেটা হয়তো আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের নজরে আসছে না।

রোগতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাবনায় বিষয়টি আসে যে আগের করোনাভাইরাসগুলোর কোনো ইতিবাচক প্রভাব আছে কি না, সেখান থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি আমাদের জন্য সুফল মিলিয়েছে কি না—এটা নিয়ে গবেষণা দরকার।’

তবে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে বিশ্বের অনেক জায়গায়। তবে এখন পর্যন্ত আগের করোনাভাইরাসের সঙ্গে কভিড-১৯-এর কোনো মিল পাওয়া যায়নি বলে আমি জানি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মৃত্যু কম হওয়ার কারণ হতে পারে আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষের হার কম। যেসব দেশে বেশি মৃত্যু ঘটেছে, সেসব দেশে বয়স্ক মানুষ বেশি। তবে যাই হোক, আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতেই হবে। করোনাকে হেলাফেলা করার পর্যায়ে এখনো আমরা আসিনি।’

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো করোনা থেকে আমাদের বেনিফিট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু এখনো এটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত।’ একই ব্যক্তির ফের আক্রান্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত দু-তিনটি ঘটনা আমরা পর্যালোচনা করছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সব নমুনা এক ল্যাবে টেস্ট হয় না। আমাদের ল্যাবে যেগুলো টেস্ট হয়, সেগুলো নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি, কিন্তু অন্যরা হয়তো নমুনা রাখে না। আর এত লাখ লাখ নমুনা রাখাও সম্ভব নয়। ফলে দ্বিতীয়বারে কেউ সংক্রমিত হওয়ার তথ্য পেলেও আগের নমুনা না পেলে সেটার প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’

অ্যান্টিজেন টেস্টের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘এখনো অ্যান্টিজেন টেস্ট চালু করা যায়নি। আরো কিছুটা সময় লাগবে। আমরা খুব অল্প কিছু কিট মান দেখার জন্য নমুনা হিসেবে পেয়েছি। ব্যাপকভাবে পরীক্ষার জন্য কিট সংগ্রহের  ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এতে কিট হাতে পেতে কিছুটা সময় লাগবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা