kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহ তলানিতে

কাজী হাফিজ   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০২:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহ তলানিতে

দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৯৪.৮৯ শতাংশ ভোট পড়ার নজির রয়েছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৫ আসনে এই সংখ্যক ভোট পড়ে। ওই নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে প্রশংসিত হয়। এতে ৩০০ আসনে গড়ে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনগুলোতে মাত্র ৫.২৮ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। করোনা আতঙ্কের মধ্যে গত ২১ মার্চ জাতীয় সংসদের ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে এই হতাশাজনক ঘটনা ঘটে। 

আর গত শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে চার লাখ ৭১ হাজার ৭১ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন মাত্র ৪৯ হাজার ১৪১ ভোটার। অর্থাৎ ভোট পড়েছে মাত্র ১০.৪৩ শতাংশ। একই দিনে নওগাঁ-৬ আসনে ভোট দিয়েছেন ৩৬.৪ শতাংশ ভোটার। এতে অনেকের ধারণা, নির্বাচন নিয়ে ঢাকার ভোটারদের আগ্রহ কমেছে বেশি। 

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচনগুলো হচ্ছে একতরফা। ক্ষমতাসীন দলের বাইরের প্রার্থীরা নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে নিরপেক্ষ আচরণ পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে বর্তমান নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতা এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দলের ভোটারদেরও বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। এ ছাড়া ইভিএমে জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকার কারণে এতে ভোট প্রদানের প্রকৃত তথ্য উঠে আসে, যা ব্যালট পেপারের ভোটে সম্ভব নয়।

তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচন ব্যবস্থাপনার প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতার বিষয়টি মানতে রাজি নয়। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভীতি ও ইভিএমএ ভোটের কারণে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। গত ২১ মার্চ দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর দিকে জাতীয় সংসদের ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য ভোটারদের ভীত করে। ভোটাররা করোনাভীতির কারণে ভোটকেন্দ্রে আসতে চাননি। এ ছাড়া ইভিএম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা আছে। গণমাধ্যমই প্রচার করছে, কাগজে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। কিন্তু মেটালিক ও প্লাস্টিকে করোনাভাইরাস বেশি দিন টিকে থাকে এবং এতে এই ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি। এ জন্য আমাদের ইভিএমকে ভোটাররা বিপজ্জনক ভাবছে। ইভিএমে ভোটের হার কম হলেও কাগজের ব্যালটের ভোটে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক।’

এ নির্বাচন কমিশনার আরো বলেন, নির্বাচন হচ্ছে খেলার মাঠের মতো। এ মাঠে প্রতিযোগী খেলোয়াড়রা যদি জনপ্রিয় হয় তাহলে দর্শক বেশি থাকবে। অন্যথায় দর্শক উপস্থিতি কম থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটছে।  প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হচ্ছে। 

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত  অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোট প্রদানের গড় হার ছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ৯২.৮০ শতাংশ ভোট পড়ে রাজশাহী-৪ আসনে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনেও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি হারে ভোট পড়ে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর ছন্দপতন হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটসহ বেশ কয়েকটি দলের নির্বাচন বর্জন এবং উত্তপ্ত ও সহিংস পরিস্থিতিতে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ভোট হয় ১৪৭টি আসনে। এতে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৪০.০৪ শতাংশ। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোট হয়, তাতে গড়ে ৫১.৪২ শতাংশ ভোট পড়ে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ আসনে ভোট পড়ে ৬২.৮৭ শতাংশ। ঢাকা-৬ আসনে পড়ে ৪৫.২৬ ও ঢাকা-১৩ আসনে পড়ে ৪৩.৭ শতাংশ ভোট।

ইভিএমের ভোটে চলতি বছর ১৩ জানুয়ারি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৮১.৪০ শতাংশ ভোট পড়ে। এ ছাড়া একই দিন পাবনার মালিগাছা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৭৪.৩২ শতাংশ। একই দিন চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে ২৩ শতাংশ। গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ঢাকা উত্তরে ভোট পড়ে ২৫.৩০ শতাংশ, আর দক্ষিণে পড়ে ২৯ শতাংশ।

করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের দিন গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই দুই আসনে ব্যালট পেপারে অনুষ্ঠিত ভোটে  যথাক্রমে ৬০ ও ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে। এ ছাড়া গত ১৪ জুলাই যশোর-৬ এবং বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন হয়। এ আসন দুটিতে ভোট হয় ব্যালট পেপারে। যশোর-৬ আসনে ভোট পড়ে ৬৩.৫৭ শতাংশ। আর বগুড়া-১ আসনে ভোট পড়ে ৪৫.৫ শতাংশ। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা-৪ আসনের উপনির্বাচনে ব্যালটে ভোট পড়ে ৬৫.৭৭ শতাংশ।

ভোটের এ অবস্থার বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইভিএমএর ভোটে অনেকটাই ট্রু পিকচার পাওয়া যাচ্ছে। অনেকটাই বলছি এ কারণে যে ইভিএমের এই ভোটের ফলাফল সঠিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে কি না তা দেখার মতো কেউ থাকে না। আমরা  গণমাধ্যমে ঢাকা-৫ আসনের নির্বাচনে অনেক কেন্দ্র ভোটার শূন্য দেখেছি। নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল রেজাল্ট হচ্ছে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। তাহলে কি ক্ষমতাসীন দলের ভোটারও নির্বাচন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? তাদের সমর্থক ভোটার কি মাত্র ৫ শতাংশ? ভোটাররা কি ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকেই অনেকটা নিশ্চিত? এক তরফা নির্বাচন, ভোট দিয়ে কী লাভ—ভোটারদের মধ্যে এই মনোভাব ক্রমেই স্থায়ী হচ্ছে।’

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি নির্বাচনে নিক্সন চৌধুরীর আচরণের কথা জেনেছি। এ সময়ে প্রার্থীরাও ভাবছে যেকোনোভাবে নির্বাচনে জেতার একটা সার্টিফিকেট হলেই সব ঠিক। নির্বাচন কমিশনেরও নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার কোনো প্রচেষ্টা নেই। অনেক দেশে নির্বাচনে ভোটের হার কেন কমে যাচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা হয়, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমাদের এখানে সেটাও হচ্ছে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা