kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

আজকে যত ফুল ফুটেছে সব রাসেলের জন্য

আলী হাবিব

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:১৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আজকে যত ফুল ফুটেছে সব রাসেলের জন্য

তার হাসি মেখে আজ সূর্য উঠেছে। ঘাসের ডগায় জমা শিশিরের কণা, কার্তিকের নরম রোদ ছুঁয়ে ঝলমল করে। আজকের দিনটা তো একান্তই তার, বার্ট্রান্ড রাসেলের নামে নাম যার। দুই ভাই, দুই বোনের আদরের ভাই। ভাবিদেরও সঙ্গে ছিল নিত্য খুনসুটি। মায়ের আদর তাকে রাখত ভরিয়ে। শেষাবধি মা-ই তার শেষ আশ্রয়। অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া সেই ভোরবেলা, মায়ের কাছেই যেতে চেয়েছিল সে। মায়ের সঙ্গে তার শেষ যাত্রা হলো! 

বাবারও কাছের ছিল, থাকত পাশে পাশে। বাবার মতোই সে কি স্বপ্ন দেখত? তাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল বাবারও নিশ্চয়। আর দশজন সাধারণ ছেলের মতোই সকালবেলায় সে স্কুলে যেত রোজ। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, ওই বয়সেই সতীর্থ বন্ধুদের প্রিয়ভাজন ছিল। স্কুলের শিক্ষক থেকে গৃহশিক্ষক, সবারই ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছিল। ‘স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে’, হয়তো বা সে দেখত হঠাৎ ‘মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে।’ রূপকথা তার হয়তো প্রিয় ছিল। মায়ের কাছে, বোনের কাছে করত সে আবদার? ভূতের গল্প শুনে মায়ের আঁচলে ভয়ে কি সে লুকাত মুখ! কিংবা শুনত যদি তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে আসা সেই সাহসী রাজকুমারের গল্প, তাহলে কি মনে মনে হতো সে সেই নবীন কুমার? সেসব খবর আমরা কি আর রাখি? হয়তো বা তার বন্ধু ছিল পাখি। উড়ে এসে বসত পাশে পোষা কবুতর। হাতের তালুতে তুলে খাওয়াত খাবার। হয়তো বা সে ভালোবাসত ফুল। লাল গোলাপে পক্ষপাতও ছিল। তার বাগানে ফুটত সাদা জুঁই, গন্ধরাজ ও চন্দ্রমল্লিকা। লাল দোপাটি কিংবা হলুদ গাঁদায় উড়ে এসে বসত প্রজাপতি? সে-ও তো ছিল এক বাগানের ফুল!

আমরা তাকে কতটুকুই বা জানি, কতটুকু চিনি। চেনাজানা সব তো ওই ছবির অ্যালবামে। ছবিতে দেখছি তাকে ট্রাইসাইকেলে। দেখছি বাহাত্তরের আরেক ছবিতে, পতাকা হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে। পিতার জন্য তার প্রতীক্ষা ব্যাকুল। আহা, সে কী নিষ্পাপ হাসি হাসি মুখ!

ঋষির মৌনী নিয়ে পুবের আকাশ এই যে আবার আজ আবিরে রেঙেছে। ওটা কি আবির, নাকি রক্তের লাল! ভোরের আকাশ থাকে গভীর-গম্ভীর। নীল ক্যানভাসে ওড়ে মুখর পাখিরা। সে কি সেই পাখিদের গান শুনে শুনে কোনো দিন পাখি হয়ে উড়তে চেয়েছে। নাকি সে চেয়েছে হতে তুলো তুলো মেঘ, উড়ে যেতে চেয়েছে কি উদার আকাশে? চোখজুড়ে যার ছিল অপার বিস্ময়, কল্পনায় সে তো পাখি হয়ে যেতে পারে। হয়তো সে হতো আজ স্বপ্ন ফেরিওয়ালা, দিত দিনবদলের আশাময় ডাক। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি আবার দীক্ষা নিত মনে মনে নববিপ্লবের।  

আরো কত শত কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু সব শব্দ যেন রক্তে ভেসে যায়। মধ্য আগস্টের এক কৃষ্ণ ভোরে তাকেও নিস্তব্ধ করে ঘাতক বুলেট। অবুঝ, নিষ্পাপ শিশু, রাজনীতি বোঝে না সে। বোঝে না কুটিল ভূ-রাজনীতির খেলা। জাগতিক বোধ মোটেও ছিল না যার, ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে সে-ও। নির্মমতার ইতিহাসে লেখা আছে, দেবশিশু হয় বুলেটের টার্গেট। ক্ষমতা কত যে নিষ্ঠুর হতে পারে, ১৫ই আগস্ট তারই সাক্ষ্য দেয়।

ভোরের আকাশে জ্বলজ্বলে শুকতারা। হঠাৎই হারিয়ে যায়, চোখের পলকে। সেও কি তারা হয়ে ফুটে উঠেছিল, জীবনের ভোরবেলা হারিয়ে গেছে? কে তাকে রেখেছে মনে? সে কথা জানতে পাঠ করি কবিতার পঙিক্ত বারবার। ‘ঘাতক বোঝেনি অবুঝ শিশুর মন/ঘাতক বোঝেনি বোনদের ভালোবাসা/ঘাতক কেবল ট্রিগার চালাতে জানে/ঘাতক বোঝে না জাতির ভবিষ্যৎ।/বর্তমানের মিথ্যা হিসাব নিয়ে/ঘাতক মেতেছে হত্যার উল্লাসে/অবুঝ শিশুও টার্গেট হয় তার।/তাতে যে দীর্ঘ হয়েছে দীর্ঘশ্বাস/সেই কথা ঢের লেখা আছে ইতিহাসে।/শুধু লেখা নেই আড়ালে কাদের বুকে/শোকের সাগর বয়ে চলে অবিরাম।’ যে বয়সে সে পরপারে দিল পাড়ি, সে বয়সে মনে জাগে কত কল্পনা। সে বয়সে সব শিশুই রাজাধিরাজ, মনে মনে গড়ে নিজের ভুবন নিজে।

‘বোনের চোখ/নিদ্রাহীন/রাত্রিদিন/কী উন্মুখ/ফিরছে খুঁজে/ভাইয়ের মুখ/’—হয়তো বোনরা একান্ত নিভৃতে ভাইয়ের সঙ্গে কথায় কাটান বেলা। আহা, কত আদরের প্রিয় ছোট ভাই, সে কোথায় আজ? ফুটে আছে নাকি তারা হয়ে দূরাকাশে? কোথায় হারিয়ে গেছে আদরের ভাই। ‘বোনের মন/সারাক্ষণ/বলতে চায়/রাসেল আয়।/সামনে এসে/মিষ্টি হেসে/দাঁড়াস যদি/সুখের নদী/ছুটবে আজ/গুটিয়ে নেব/সকল কাজ।’ ভাইয়ের জন্মদিনে আজ দুই বোন, হয়তো একান্তে খুলে স্মৃতির অ্যালবাম, মাথায় ও মুখে তার হাত বোলাবেন। বলবেন, ভেরি হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। চোখ বুজে হয়তো বা ফিরবেন সেই দিনগুলোতে, যেদিনে লুকোচুরি খেলত ছোট ভাই। হয়তো বা আজ একান্ত কোনো ক্ষণে, দুই বোন চোখ বুজে খুঁজে ফিরবেন সেই ছোট ভাইটিকে। ‘বোনের স্মৃতিতে আজও অমলিন/হাসিমাখা সেই মুখ/অ্যালবামে ভরা পুরনো দিনের/ছবি দেয় কিছু সুখ।/ছবি দেখে দেখে দীর্ঘশ্বাসে ঘরের বাতাস ভারী/নীরবে দুচোখে অশ্রুবন্যা/মনে পড়ে মুখ তারই।’  

আদরের ভাই আর ফিরে আসবে না। দুষ্টু-মিষ্টি হাসিতে আদর কাড়বে না কোনো দিন। স্মৃতি হয়ে আছে, স্মৃতি হয়ে থাকবে সে। বুকের ভেতরে ওই মুখ অমলিন। দুষ্টুমিভরা ওই প্রিয় মুখখানি, মাঝেমধ্যে ভেসে ওঠে স্মৃতির আয়নায়। সেই হাসি, দুই চোখে অনন্ত জিজ্ঞাসা, কখনো আবার সেই চেনা খুনসুটি। বোনদের চোখে নামে অশ্রুর ধারা। ঢেউ ওঠে বেদনার অতল সাগরে।

শরতের কাশফুল হেমন্তে এসেও নদীতীরে দোল খায় আপন খেয়ালে। গাছে গাছে ফুটে আছে কামিনী-মল্লিকা। সুগন্ধি ছাতিম আর শিউলির ঘ্রাণ, রাতের মায়ায় টানে। মধুগন্ধি হিমঝুরি রোজ রাতে ফোটে; ভোরবেলা ঝরে যায়, অভিমান বুঝি! সাদা-লালে রাজঅশোক হেমন্তেই ফোটে। প্রকৃতি পবিত্র করে দেবকাঞ্চন। বকফুল ফুটে থাকে ডালের ডগায়। আজকে যত ফুল ফুটেছে সব রাসেলের জন্য। সব পাখি আজ গান গেয়েছে শেখ রাসেলের জন্য। ‘নরম গালে/কোন সে কালে/আলতো চুম/আনতো ঘুম।/সে আজ নেই।/হারায় খেই/চিন্তাগুলো/স্মৃতির ধুলো/মোছার নয়/এ ঘরময়/ছুটত যে/কোথায় সে?’ তার রক্তে ভোরের আকাশ আবিররাঙা ছিল। দিন গড়িয়ে সন্ধে হবে, ফুটবে হাজার তারার বুটি রাতের আকাশজুড়ে। আকাশভরা তারার মেলায় কোন তারাটি রাসেল হয়ে জ্বলে?

লেখক : সাংবাদিক ও ছড়াকার
[email protected]  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা