kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

তিনি ছিলেন রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র

কাজী মুরাদ হোসেন    

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ১৫:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিনি ছিলেন রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র

সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরি না করেও 'লেফটেন্যান্ট জেনারেল' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ। হ্যাঁ, তিনি ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা ও ৯ নম্বর সেক্টর থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর অসীম দক্ষতার পুরস্কার হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সম্মানজনক 'লেফটেন্যান্ট জেনারেল' পদ বা উপাধি দিয়েছিল।

১৯৩১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খুলনার ফুলতলা থানার বিল ডাকাতিয়াপাড়ের ধোপাখোলা নামের এক ছোট্ট গ্রামে   জন্মগ্রহণ করেন সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ। বাবা সাহামত উল্লাহ ও মা করিমুন্নেসার ১০ সন্তানের মধ্যে সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ ছিলেন তৃতীয়। বাবা সাহামত উল্লাহ নিজেও আইন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। খুলনা ভিক্টোরিয়া ইনফ্যান্ট স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও খুলনা ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে তিনি আইএ পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে একই কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাশ করেন। এরপর যোগ দেন আইন পেশায়।

১৯৪৯ সালে ছাত্রলীগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে  জড়িত হন সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালের শুরুতে গড়ে ওঠা ভাষা আন্দোলনই সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফের রাজনৈতিক প্রেরণা, বাঙালি জাীয়তাবাদ, বাঙালির স্বাধীনতাসহ অর্থনৈতিক মুক্তিই তাঁর রাজনীতির আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল। এরপর যোগ দেন আওয়ামী লীগে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা আন্দোলনের সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পর আইয়ুব খান আহুত ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডির বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ।

এরআগে ১৯৬৪-৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৭-৭১ সালে খুলনা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও একই সময়  নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ১৯৭২-৭৫ সালে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২-৭৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। ১৯৭৮ সালে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এই নেতা।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরশাসকদের দমন-পীড়নের স্বীকার হয়ে অনেকবার কারাবরণ করেন সালাহ্ উদ্দিন ইউসুফ। ১৯৪৮ সালে কারাবন্দি থাকাকালে তাঁর কারাসঙ্গী ছিলেন সাবেক এমএলএ মরহুম আব্দুল গফুর ও সাবেক স্পিকার মরহুম শেখ রাজ্জাক আলী। ১৯৫২ সালে তাঁর কারাসঙ্গী ছিলেন মরহুম আব্দুল গফুর, ফেরদৌস আহমেদ, আব্দুল হালিম প্রমুখ।

এছাড়া ১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭৭ সালে কারাবন্দী থাকাকালে তাঁর করাজীবনের সঙ্গীরা ছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আব্দুল মালেক উকিল, মতিয়ার রহমান, আবদুল মমিন তালুকদার, রফিকউদ্দিন ভূইয়া, মোজাফফর হোসেন পল্টু প্রমুখ।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ডুমুরিয়া-ফুলতলা, তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে এমএনএ নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৩ সালে তালা-কলারোয়া আসনে এবং ১৯৭৯ সাল, ১৯৯১ সাল ও ১৯৯৬ সালে ডুমুরিয়া-ফুলতলা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সমগ্র জীবন তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সদ্য স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সংসদীয় দলের উপনেতা হিসেবে জাপান ও হংকং ভ্রমণ করেন সালাহ উদ্দিন ইউসুফ। ১৯৭৪ সালে একইবছর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, রোমানিয়া ও ব্রিটেন সফর করেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদে তিনি অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং পরিকল্পনাবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

ক্রীড়াপ্রেমী এই রাজনীতিক ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নেতা হিসেবে সেদেশ সফর করেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে সারা দেশে সুনাম অর্জন করেন। এছাড়া তিনি হকি ও টেনিস খেলা পছন্দ করতেন। ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি খুলনা জেলা ক্রীড়া সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

সালাহ উদ্দিন ইউসুফ ১৯৫৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর বেগম হাসিনাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। চার মেয়ে ও এক ছেলের মাতা বেগম হাসিনা ছিলেন একজন গৃহিণী। ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি দলকে সুসংগঠিত করার জন্য জোহরা তাজউদ্দিনের সঙ্গে সারা দেশ ভ্রমণ করেন।

একুশ বছরের জুলুম নির্যাতনের শেষে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসন থেকে নির্বাচিত সালাহ উদ্দিন ইউসুফ নবগঠিত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শপথগ্রহণের পর ২৯ জুন মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে যোগদান করেন। দায়িত্বে থাকাকালে তিনি অবহেলিত খুলনাসহ সমগ্র দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। 

১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর থেকে অসুস্থ এই বর্ষিয়ান নেতা ২০০০ সালের ৬ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ছিলেন। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা