kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাদাকালো

ধর্ষিত, বিবস্ত্র আমার জননী

আহমদ রফিক

অনলাইন ডেস্ক   

১৫ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:৩৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ধর্ষিত, বিবস্ত্র আমার জননী

ছয় মাস ধরে আমরা করোনার আক্রমণে ভুগে ভুগে মৃত্যু ও কর্মহীনতায়, অসুস্থতা ও চিকিৎসা-বিভ্রাটে অস্থির, এর মধ্যে কোথায় মানুষে মানুষে সহমর্মিতার বোধ প্রকাশ পাবে, তার পরিবর্তে হঠাৎ করেই কেন জানি না, নারী ধর্ষণের ধারাবাহিকতা অমানবিক নৃশংসতার শিখরচূড়ায় পৌঁছে গেছে।

শুধু নারী ধর্ষণই নয়, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বীভৎসাচার চরম আকার ধারণ করেছে, যে জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থার অর্থাৎ শাস্তির। শিশু ও নারী নির্যাতনবিরোধী যে আইন ও ট্রাইব্যুনাল বহাল আছে, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নানা বয়সী ধর্ষকসংঘ তাদের যৌনলালসা তৃপ্তির বীভৎস পন্থা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ধর্ষকরা কোনো আইনকে ভয় পাচ্ছে না, কোনো শাস্তিকে গ্রাহ্য করছে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিও নয়। ওই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও গত ৯ অক্টোবর একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘ধর্ষণের শিকার আরও ১৪ শিশু’। বিশদ বিবরণের পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে, ‘ঢাকায় শিশুকে ধর্ষণে গ্রেপ্তার ১’/(কুখ্যাত) ‘সুবর্ণচরে ঘরে ঢুকে শিশুকে ধর্ষণ’/‘আশুলিয়ায় ৪ শিশুকে ধর্ষণে গ্রেপ্তার ১’।

এরই মধ্যে অনেক ধর্ষণের ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, কোনোটি দৈনিকের ভাষায় ‘লোমহর্ষক’। তবে সিলেটসহ সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তদের (যারা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত) রাস্তা থেকে তুলে এনে নববিবাহিত গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা।

ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়ায় সিলেট শহর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ, এমনকি আইনজীবীরাও। তাঁদের কেউ অভিযুক্ত ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়াতে আদালতে আসেননি, বরং প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। এ ঘটনায় সারা সিলেটই উত্তপ্ত হয়নি, এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে রাজধানীতেও। বিচার চেয়েছেন ধর্ষক ছাত্রদের অভিভাবকরাও। সম্ভবত এই প্রথম অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এমন সুস্থ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল, দু-একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা বাদে।

কিন্তু ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় শক্তিমান ধর্ষককুল তো চুপচাপ বসে থাকার নয়। এর পরের ঘটনা এমনই ভয়াবহ যে তা সারা দেশকে প্রবল প্রতিবাদে উত্তাল করে তোলে। সম্ভবত ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার (১৯৯৫) প্রতিবাদে উত্তাল দিনাজপুরের পর বেগমগঞ্জের ঘটনায় সারা দেশ এই প্রথম প্রতিবাদে উত্তাল।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঘরে ঢুকে গৃহবধূকে ধর্ষণ করেই বিরত হয়নি দুর্বৃত্তরা, তাঁকে বিবস্ত্র করে দলবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও চিত্রও ধারণ করেছে। ঘটনা ব্যতিক্রমী ধারায় হলেও সারা দেশে প্রবল প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। যথারীতি শাহবাগ এ ঘটনায় প্রতিবাদী সমাবেশ ও বিক্ষোভে নেতৃত্ব নিয়েছে। আজ চুতর্থ দিনেও চলছে বিক্ষোভ সমাবেশ।

এত দিন পর, অনেক লেখালেখির পর সম্ভবত এই প্রথম সর্বকণ্ঠে উচ্চারিত দাবি : ‘ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’, দ্বিতীয় ভাষ্যে ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’। যে ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদে উত্তাল সারা দেশ, সেই ঘটনা সম্পর্কে নানা দৈনিকে বিশদ সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে গত কয়েক দিন।

এর মধ্যেই একটি দৈনিকের তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ, ‘বেগমগঞ্জে দেলোয়ার বাহিনীর বর্বরতা’/‘আগে দুবার ধর্ষণ করা হয় ওই নারীকে’/‘নিরাপত্তাহীনতায় মূল হোতা দেলোয়ারের নাম প্রকাশ করেননি নির্যাতিতা সেই নারী’। অর্থাৎ ইজ্জতের চেয়ে প্রাণের তথা বেঁচে থাকার দাবিটা বড়। তাই তিনি ঘটনা চেপে গেছেন। কিন্তু এবারের ঘটনা এতই বীভৎস, এতই ন্যক্কারজনক যে সারা দেশ তাঁর সুবিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ‘অস্ত্রসহ আটক দেলোয়ার’। এরই মধ্যে আরো ধর্ষণের নিষ্ঠুর ঘটনা। ‘শ্রীপুরে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার’। আরেকটি দৈনিকের খবর : ‘হবিগঞ্জে মা-মেয়েকে ধর্ষণ’। অনুরূপ খবর : ‘নোয়াখালীতে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ’। এর মধ্যে চাঞ্চল্যকর খবর : ‘৮ বছরের শিশুর আর্তি’/‘আমাকে ধর্ষণচেষ্টাকারী শামীমের বিচার চাই’।

তবে এ ধারায় ভয়াবহ সংবাদটি হচ্ছে, ‘তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে কিশোর গ্যাং’। বিষয়টি বারান্তরে আলোচ্য।

দুই.

ধর্ষণের এই ভয়াবহ চালচিত্রে প্রথম প্রশ্ন, ‘কেন বয়স-নির্বিশেষে নারীর ওপর এই যৌন নিষ্ঠুরতা নিয়মিত চলছে?’ কারণ অনেক। সমাজ, রাজনীতিসহ বহু কিছু এর পেছনে সক্রিয়। একটি কাগজে সমাজসেবী খুশী কবিরের মন্তব্য—সামাজিক অবক্ষয়, দূষিত রাজনীতির প্রভাব ও সেই ছত্রচ্ছায়া ইত্যাদি। আরেক বিশিষ্টজনের মন্তব্য উদ্ধৃত করে আরেকটি দৈনিকের শিরোনাম : ‘ক্ষমতার আশ্রয়ে ধর্ষকেরা বেশি বেপরোয়া’। ঘুরেফিরে একই রকম উৎস সূত্র।

ধর্ষণের পেছনে বড় কারণ যে প্রকৃতই সামাজিক-রাজনৈতিক আর্ষশক্তি, তাতে কমবেশি সবাই একমত। একই বিবেচনায় কালের কণ্ঠে একটি খবর, ‘সংঘবদ্ধ নিপীড়নের পেছনে বড় মদদ’/‘উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে দলবদ্ধ ধর্ষণ’/‘চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ২০৮টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে’। প্রশ্ন উঠতে পারে, ঘটনার শুরুতে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল নাগরিকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?

নারী ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে যেসব বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান গবেষণায় নিয়োজিত তাদের প্রতিবেদন ও পরামর্শ কতটা গ্রাহ্যের মধ্যে আসে? তাদের প্রতিবেদনে ধর্ষকের শাস্তিবিষয়ক দিকটির বিশ্লেষণ বনাম সুবিচারের দিকটি কতটা প্রতিফলিত, আইনের সংস্কার পরামর্শসহ যথাযথ গুরুত্বে? আসলে মোটাদাগের বিচারে গুরুত্বহীনতা একটি বড় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। দেখা যাক, এবারের প্রবল আলোড়ন নারীর নিরাপত্তার পক্ষে কতটা সুফল বয়ে আনে।

সত্যি বলতে কী, ধর্ষণ ও তার ধারাবাহিকতা এবং কখনো তার বিস্ফোরক রূপটির মূল কারণ এর আগে যাঁরা চিহ্নিত করেছেন, তা মোটামুটি সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। ভয়ে এবং একাধিক বোধগম্য কারণে অনেকে সে সম্পর্কে মুখ খুলতে চান না। তবে সংবাদপত্রের কথা আলাদা। সত্যের পক্ষে তাদের কিছুটা স্বাধীনতা রয়েছে বলে এমন সংবাদ শিরোনাম প্রকাশ সম্ভব হয় : ‘ক্ষমতার ছায়ায় ভয়ংকর এক দেলোয়ার’, যে দেলোয়ার উল্লিখিত ভয়াবহ ঘটনার মূল হোতা।

তিন.

আমাদের স্বস্তি (জানি না তা কতটা স্থায়ী) যে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে সারা দেশে মানুষ ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড এবং অবিলম্বে আইন তৈরি ও ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে সোচ্চার হয়েছে, প্রতিটি দৈনিক যথাযথ গুরুত্বে তা প্রকাশ করেছে আরো নানা ঘটনার সন্নিবেশে। একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় শিরোনাম : ‘জাতি লজ্জাবনত, ধর্ষণ মামলার বিচার ত্বরান্বিত করুন’।

নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে সুবিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে সারা দেশ। এবার শাসনযন্ত্রের সময় এসেছে যথাযথভাবে সাড়া দেওয়ার। দ্রুত আইন তৈরি, দ্রুত বিচার, দ্রুত শাস্তি বিধান—তা না হলে এই ব্যাধির অবসান ঘটবে না। সরকার আইন পরিবর্তন করেছে। একটি খবরে তেমন ইঙ্গিত : ‘বিক্ষোভ, প্রতিবাদের মধ্যেই ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার উদ্যোগ’।

‘কোন দেশে ধর্ষণের কী শাস্তি’ তা নিয়ে বিবেচনার প্রয়োজন আমাদের নেই। আমাদের বিবেচ্য বাংলাদেশ পরিস্থিতি এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত। তবু হিসাবটা নিতে গেলে দেখা যায়, ‘ভারত, চীন, ইরান, রাশিয়াসহ এশিয়া-ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়েসহ বিশ্বের উন্নত (আসলে উদারপন্থী) দেশগুলোতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছর কারাদণ্ড।’ বাংলাদেশে এই শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে এতে শুভংকরের ফাঁকিও আছে, সে প্রসঙ্গ থাক।

দেশব্যাপী বর্তমান দাবি ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই আইনি স্বীকৃতি পেল। এখন সে আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হলে আশা করা যায় বাংলাদেশে ধর্ষণের উন্মাদনা হ্রাস পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের বিধানও থাকতে হবে। না হলে বিলম্বিত বিচারের প্রবাদবচনসহ বিলম্বের নানা কুফল অপরাধীর পক্ষেই যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে এ সম্পর্কে ব্যবস্থা নেবে। যেকোনো মূল্যে নারী ধর্ষণ বন্ধ করতে হবে।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা