kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও আইসিটির ব্যবহার

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

অনলাইন ডেস্ক   

১৫ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও আইসিটির ব্যবহার

আজ ৫২তম বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। সাদাছড়ি বহনকারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিরাপদে পথ চলতে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস পালিত হয়। এবারের সাদাছড়ি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সাদাছড়ির উন্নতি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির অগ্রগতি’। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিরাপদে চলাফেরা নিশ্চিত করতে ১৯৬১ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। লায়নস ইন্টারন্যাশনালের হিসাব মতে, বিশ্বে ২৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পুরোপুরি ও আংশিকভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ২০০৫ সালের এক জরিপের ফল বলছে, দেশে মোট প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার মধ্যে ৩২.২ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার শিকার। ২০১১ সালের অন্য এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৫.১ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ। ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ বলে বিবেচিত হবেন যথা—এক. সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীনতা  (blindness) : উভয় চোখে একেবারেই দেখতে না পারা বা যথাযথ লেন্স ব্যবহারের পরও দৃষ্টি তীক্ষ্ণতা  (visual acuity) ৬/৬০ বা ২০/২০০-এর কম বা দৃষ্টি ক্ষেত্র  (visual field) ২০ ডিগ্রি বা তার চেয়ে কম; দুই. আংশিক দৃষ্টিহীনতা  (partial blindness), যথা—এক চোখে একেবারেই দেখতে না পারা; তিন. ক্ষীণদৃষ্টি  (low vision) : উভয় চোখে আংশিক বা কম দেখতে পারা বা যথাযথ লেন্স ব্যবহারের পরও দৃষ্টি তীক্ষ্ণতা  (visual acuity) ৬/১৮ বা ২০/৬০ এবং ৬/৬০ বা ২০/২০০-এর মধ্যে; বা দৃষ্টিক্ষেত্র  (visual field) ২০ থেকে ৪০ ডিগ্রির মধ্যে (প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩)। এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ চলাচলের জন্য হাতে সাদাছড়ি ব্যবহার করে থাকে, যাতে তাদের চলাচলে সহজসাধ্য হয়।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিবন্ধী মানুষের সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রায় সব ধরনের সেবা ও অধিকারভিত্তিক কর্মপদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্প্রতি এই ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি’, যার সুবিধা প্রয়োগ করে সাদাছড়িসহ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অগ্রগতির আজ অনেকাংশে দৃশ্যমান। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে আইসিটির বহুমুখী প্রয়োগের বিপুল সম্ভাবনা বিদ্যমান। প্রতিবন্ধী মানুষের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও যোগাযোগ চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে যথাযথ ও সচেতনভাবে আইসিটি ব্যবহার করা গেলে, বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের টেকসই উন্নয়নে এই প্রযুক্তির প্রসার ও প্রয়োগ হতে পারে এক কার্যকর হাতিয়ার। তাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এখন শুধু সাদাছড়ি আর হুইলচেয়ার নয়, প্রয়োজন তাদের হাতে কম্পিউটার, ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোন। এই অধিকারের কথা জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ’-এর ৯ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

গত তিন দশকে সারা বিশ্বে আইসিটির বিপুল অগ্রগতি হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্যাপকভাবে এর সুবিধা গ্রহণ করতে পারেনি। তবে বর্তমান সরকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাচল ও শিক্ষায় আইসিটির ব্যবহারে কিছুটা সহজগম্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অনেক দেশে ব্রেইল (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের লিখনপদ্ধতি) কম্পিউটারের ব্যবহার, ডিজিটাল টকিং বুক বা কথা বলিয়ে বই ও কম্পিউটারের পর্দার লেখা পড়তে পারে এমন সফটওয়্যার যেমন ই-টেক্সট ও মাল্টিমিডিয়াভিত্তিক ক্লাসরুম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ ছাত্র-ছাত্রী ২৩ হাজার ৫০০ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণে অংশ নিচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিবন্ধী মানুষকে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়। আমাদের দেশে মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ৩২ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং এদের বড় একটি অংশ স্কুলগামী উপযোগী শিশু। কম্পিউটারভিত্তিক বহুমাত্রিক মাধ্যমের সুবিধাপ্রাপ্তি ও ব্যবহার নিশ্চত করা গেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বেশির ভাগ শিশুকে শিক্ষা ও শিক্ষা-পরবর্তীকালে কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ হতে পারে একটি অন্যতম উপায়। ঘরে বসে ওয়েবসাইট তৈরি, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ বিবিধ বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অফিসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও কম্পিউটারে অফিস প্যাকেজের ব্যবহার, তথ্য ও যোগাযোগে ইন্টারনেট, ই-মেইল, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলো সহজে ব্যবহার করে শিক্ষা ও কর্মে উভয় জায়গায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা টেকসই উন্নয়ন সাধন করতে সক্ষম হবে।

লেখক : প্রশিক্ষক, লেখক ও সমাজকর্মী
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা