kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণহীন হলে মহাবিপদ হবে

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

অনলাইন ডেস্ক   

১৪ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:৪৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণহীন হলে মহাবিপদ হবে

৭ অক্টোবর কালের কণ্ঠ’র অনলাইন ভার্সনে অন্যতম প্রধান খবর ছিল, উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে গোলাগুলি, তাতে নিহত চারজন, আহত আরো ৫০। গোলাগুলিকারী এবং নিহত-আহত সবাই রোহিঙ্গা। খবরটি শুধু উদ্বেগজনক নয়, এর সুদূরপ্রসারী পরিণতির কথা ভাবলে মনে আসে, তাহলে যাদের মানবতার খাতিরে আশ্রয় দিলাম, তারাই কি বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমেই ভয়ংকর বিপজ্জনক হয়ে উঠছে? রোহিঙ্গা অস্ত্রধারীরা যেমন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপদ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি দেশি-বিদেশি যেকোনো পক্ষ বা শক্তি, যারা বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়, তারাও ওই অস্ত্রধারীদের ব্যবহার করতে পারে।

কালের কণ্ঠে ৮ অক্টোবর আরেকটি উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়। এতে বলা হয়, ওপারের উসকানিতে এপারে সংঘাত। এই খবরটির সঠিকতা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকতে পারে, তবে প্রতিবেদনের ভেতরে যা বলা হয়েছে তার মধ্যে সারবত্তা আছে। মিয়ানমার সরকার সব সময় বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের ভেতর থেকে বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গি সন্ত্রাসী সশস্ত্র সংগঠন তৈরি হয়েছে, যেটি মিয়ানমারের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য বড় হুমকি। রোহিঙ্গা সমস্যার লিগ্যাসি এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরসা অর্থাৎ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি নামের সশস্ত্র সংগঠনের অ্যাকশন ইত্যাদি আমলে নিলে মিয়ানমার সরকারের অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাছবিচারহীন পন্থায় সব জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য যেভাবে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে মিয়ানমারের উল্লিখিত অভিযোগ অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী চরিত্রটি সামনে আনার জন্য ৮ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ওপারের উসকানিতে এপারে সংঘাত’ খবরটিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেওয়ার অজুহাত সৃষ্টিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যা ইচ্ছা করতে পারে। গত তিন বছরের ঘটনাবলিতে এটি স্পষ্ট যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে না পারলে মিয়ানমার এই রোহিঙ্গাদের কোনো দিন ফেরত নেবে না। সুতরাং রোহিঙ্গাদের কাছে অস্ত্র এবং ভেতর থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে বড় বিপজ্জনক অশনিসংকেত।

কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। আমার দৃষ্টিতে এমনিতেই ১৯৭৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুটি হ্যান্ডেল করার ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো সরকারই দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেনি। ১৯৭৮ সাল থেকে এই ইস্যুতে কী ঘটেছে, এর সামনে-পেছনে কারা ছিল, তাতে বাংলাদেশের কী লাভ-ক্ষতি হয়েছে তার সব কিছুই বিবেচনায় আনতে হবে। ভাবতে হবে, এই রোহিঙ্গারা অনির্দিষ্টকালের জন্য এভাবে যদি কক্সবাজারে অবস্থান করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কী কী নিরাপত্তার সংকট সৃষ্টি হতে পারে, তার স্বরূপ ও বিস্তৃতি কেমন হবে এবং তার পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো পক্ষ ও শক্তির কোনো হাত থাকতে পারে কি না ইত্যাদি বিবেচনা করে এখনই তা প্রতিরোধ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তিন বছরে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করা কেন গেল না—এই ভাবনায় কখনো কখনো আমার কাছে মনে হয়, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে ঘিরে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর যেসব স্বার্থ রয়েছে, সেটি চরিতার্থ করার জন্য কেউ বাংলাদেশ আবার কেউ বা মিয়ানমারের ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার জন্য সংকটটিকে জিইয়ে রাখছে। ফিরে আসি অস্ত্রবাজ ও সন্ত্রাসীদের কথায়। এবারই প্রথম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোলাগুলি হয়েছে, তা নয়। এর আগেও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার ক্যাম্পের ভেতর হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে ক্যাম্পের ভেতরে ৫০ জনের বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। পুলিশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে বটে; কিন্তু এসব ঘটনায় ব্যবহৃত সব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে এমন খবর পত্রিকায় দেখিনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্প একটি সীমাবদ্ধ এলাকার মধ্যে এত গোলাগুলি হলো, অস্ত্রগুলো এ পর্যন্ত উদ্ধার করা গেল না। এর অর্থ কী দাঁড়ায়। তাহলে কি ধরে নেব, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওখানে যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন, তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ক্যাম্পের ওপর নেই। নাকি ধরে নেব, কোনো অজানা কারণে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না অথবা সে চেষ্টাও তাঁরা করছেন না। যেটাই হোক, কোনোটাই বাংলাদেশের জন্য ভালো সংবাদ নয়। দেশি-বিদেশি সব সাহায্যকারী সংস্থা ও দেশ ক্যাম্পের ভেতরে মানবিক সাহায্যের কাজগুলো অবাধে করবে। কিন্তু কক্সবাজার বাংলাদেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সার্বভৌম ভূখণ্ড। এই এলাকায় রোহিঙ্গাসহ অন্য সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এবং স্থানীয় জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের হাতে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকতেই হবে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি এসব বিষয়ে আপস করেন, তাহলে মহাবিপদ হবে।

গত বছর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের মিলনায়তনে একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছিলাম। ওই সেমিনারে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বেশ কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের মুখেই ছিল বহুবিধ ভয়, শঙ্কা আর আতঙ্কের কথা। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্য বললেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা তাঁকে মোবাইল ফোনে সরাসরি হুমকি দিয়েছে। বলেছে, রোহিঙ্গাদের কাজকর্মে বাধা দিলে ওই ইউপি সদস্যকে এলাকাছাড়া করা হবে। শিবিরে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে বৃহত্তর অংশই সাধারণ ও নিরীহ। কঠোর ব্যবস্থা নিতে গেলে হয়তো এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাধারণ নিরীহ রোহিঙ্গাদের সামনে এলে মানবাধিকার গেল বলে চিৎকার করতে চাইবে। সুতরাং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব দিকে আটঘাট বেঁধেই কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। হয়তো একসময় দেখা যাবে দেশি-বিদেশি কোনো কোনো পক্ষ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এই অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর পেছনে মদদ দেবে, বাংলাদেশকে চাপে ফেলবে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাদক, অস্ত্র চোরাচালান এবং নারী পাচারের মতো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যাচ্ছে। এরাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য আরো বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। মনে রাখা দরকার, বৈশ্বিক বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্ব-প্রতিযোগিতায় মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশও ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং বৈদেশিক নীতির জায়গায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারের মতো কোনো এক বড় পক্ষের ঘাটে নৌকা বেঁধে রাখা বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হবে।

তাই রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য কত বড় সংকট সৃষ্টি করেছে, তা ভাবতে গেলে কূলকিনারা পাওয়া যায় না। এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করার জন্য ভাসানচরে উন্নত মানের বাসস্থানসহ সব ব্যবস্থা করা হলো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সেখানে নেওয়া গেল না। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্য থেকে কিছু ক্ষমতাবান লোক একটি বড় সিন্ডিকেট ও নেক্সাস তৈরি করেছে। দুর্বৃত্তায়নের নেক্সাসের কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, দেশ ও রাষ্ট্রের কথা তাদের চিন্তায় আসে না। সুতরাং কঠোর ব্যবস্থাই একমাত্র পথ। রোহিঙ্গারা আশ্রয়প্রার্থী, বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। তাদের জন্য মানবিক দিকের সব কিছুই করা হচ্ছে। তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ন্যায্য দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যত রকম ভূমিকা রাখা যায় তার সব কিছুই বাংলাদেশ করছে। তাদের ওপর নির্যাতন ও গণহত্যার ন্যায্য বিচারের জন্যও বাংলাদেশ সব রকমের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তাদের সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে, যা ইচ্ছা অবাধে তা করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন, রোহিঙ্গাদের সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তারা সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের মতামত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে পারে। এটি বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী কাজ হবে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক অধিকার নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস করছে। তারা নিজেদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পক্ষে সোচ্চার হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কক্সবাজার ক্যাম্প যদি একবার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ হবে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা