kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

লোমহর্ষক নিপীড়নেও চুপ প্রতিরোধ কমিটি

বাহরাম খান ও তানজিদ বসুনিয়া    

৯ অক্টোবর, ২০২০ ০২:০৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লোমহর্ষক নিপীড়নেও চুপ প্রতিরোধ কমিটি

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে কোনো কমিটি নেই। একটি আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি এক যুগ আগে গঠিত হলেও এর কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নেই। স্থানীয়ভাবে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় থাকা নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিগুলো নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যত ভূমিকা পালন করছে না। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি বহুল আলোচিত ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এসব কমিটিকে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় নতুন কমিটি গঠনের তোড়জোড় চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ৬৪ জেলার ডিসি এবং ৪৯২টি উপজেলার ইউএনওদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। একাধিক জেলার ডিসি ও ইউএনওদের সঙ্গে কথা বলে এমন নির্দেশনা দেওয়ার সত্যতা জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ইউনিয়ন কমিটির নেতৃত্বে আছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। আর উপজেলা ও জেলায় রয়েছেন যথাক্রমে ইউএনও ও ডিসিরা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে ডিসি ও ইউএনওদের বলা হয়েছে যে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারী ও শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও এমন ঘটনা আশানুরূপভাবে কমছে না। তাই এই বিষয়ে স্থানীয় কমিটিকে আরো সক্রিয় করার মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।

মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বহু আগে থেকেই কার্যকর আছে। অপরাধের বিচারের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির আরো উদ্যোগী ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

ডিসি ও ইউএনওদের দেওয়া নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষিত বিবেচনায় নারী ও শিশু নির্যাতন শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিকে আরো উদ্যোগী ভূমিকা পালন করার প্রত্যাশার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি কমিটির কার্যক্রম জোরদারকরণের মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে থাকা পদক্ষেপগুলোর কথা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজগুলো মূলত নারী ও শিশুরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরবর্তী ধাপের সেবা। কিন্তু নির্যাতন প্রতিরোধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ওই বছরের জুন মাসে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে প্রধান করে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং যৌতুকবিরোধী জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি শীর্ষক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদসচিব, চারজন সংসদ সদস্য, ৯ জন সচিব, আইজিপি, বিভিন্ন এনজিও ও সুধীসমাজের চারজন প্রতিনিধিসহ ৩২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই কমিটি আর পুনর্গঠন করা হয়নি। প্রায় এক যুগ আগে গঠিত ওই কমিটিতে থাকা অনেক সংসদ সদস্যই আর তাঁদের পদে নেই। তাই ওই কমিটি এখন আর কার্যকর নেই।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রণালয়ে নতুন কমিটি গঠন করার জন্য কাজ চলছে বলে শোনা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সেল) সাবিনা ফেরদৌস কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলার দায়িত্ব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। আমি উত্তর দিতে পারব না।’

এরপর মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তারকে অন্তত চারবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। তাঁর মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

২০০৯ সালে গঠিত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং যৌতুকবিরোধী জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির কার্যপরিধিতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌতুকের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ, রুজু করা মামলা, নিষ্পত্তি করা মামলার সংখ্যা, মামলাভিত্তিক শাস্তির বিবরণ সংগ্রহ, পর্যালোচনা ও দিকনির্দেশনাসহ নারী শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত আরো অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা আছে, কিন্তু বাস্তবে এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বর্তমান প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর এসংক্রান্ত কোনো বৈঠক হয়নি।

এ বিষয়ে ফোনে কথা বলা সম্ভব হয়নি প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার সঙ্গে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এরপর সম্প্রতি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিন নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৯৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ২০৮টি ছিল সংঘবদ্ধ চক্রের দলবদ্ধ হয়ে ঘটানো অপকর্ম।

কথাসাহিত্যিক ও বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বঙ্গবন্ধু চেয়ার সেলিনা হোসেন গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর কমিটি থাকা দরকার। স্থানীয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিগুলো যাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে তার জন্য জাতীয়ভাবে কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো ঘটছে, তা দেশের জন্য লজ্জা। বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের লেখায় নারীদের সম্মানের কথা লিখে গেছেন।

একাধিক ডিসি ও ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা ও উপজেলায় হাজারো কাজের ঝামেলার মধ্যে থাকতে হয় তাঁদের। তাই নারী ও শিশুদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যোগ নিলে তাঁরা সেসব কাজে উৎসাহ দেন, কিন্তু নিজেদের নিয়মিত কাজের মতো এসব বিষয়ে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না।

একজন ডিসি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো জায়গায় বাল্যবিয়ের খবর জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু কাজটি এমন হওয়া দরকার যে কেউ বাল্যবিয়ে বা নারী-শিশুদের নির্যাতনের বিষয়টি চিন্তাই না করে। এর জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সামাজিক ও স্থানীয় উদ্যোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা