kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গোলটেবিল বৈঠক

নগর দুর্যোগ মোকাবেলায় দরকার আন্তঃসংস্থা সমন্বয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ অক্টোবর, ২০২০ ২১:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নগর দুর্যোগ মোকাবেলায় দরকার আন্তঃসংস্থা সমন্বয়

ছবি : কালের কণ্ঠ

সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ বাস করে শহরে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজধানীর ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এলাকা হিসাবে পরিচিত। প্রতিদিন শহরটিতে এক হাজার ৪০০ মানুষ নানা কারণে আসছেন। ঢাকার প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় ৪৯ হাজার মানুষ বাস করেন। ঢাকায় দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনে অন্তত ৪২টি সংস্থা কাজ করে। ফলে এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট ঘাটতি বিদ্যমান। ঢাকার অভিভাবক প্রতিষ্ঠান দুই সিটি করপোরেশনকে আইনে দুর্যোগ মোকাবেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা হয়নি। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নাই। 

কালের কণ্ঠ-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। 'নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা : অগ্রগতি ও করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকটিতে সহযোগিতা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন। 

বক্তারা বলেন, ঢাকার মতো আয়তনের এই শহরে ৩০-৫০ লাখ মানুষ বাস করার উপযোগী। কিন্তু রয়েছে প্রায় আড়াই কোটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীবিকার তাগিদে মানুষ শহরমুখী। ফলে এসব মানুষের নাগরিক সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। এই শহরে ভূমিকম্প, বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং ভবন ধসের মতো তীব্র দুর্যোগ ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও আগাম প্রস্তুতির যথেষ্ট অভাব বিদ্যমান। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা এবং মনিটরিংয়ের অভাবও রয়েছে বেশ। এসব সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।  
   
কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, এই শহরে লোক দিন দিন বাড়ছে, আয়তন বাড়ছে। আকাশ সমান দালানে দিন দিন ঢেকে যাচ্ছে। এই শহরের সব মানুষ এক দিনে যদি ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তবে জায়গা হবে না। এই ধরনের একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। প্রতি বছরেই বন্যার মত দুর্যোগ আমাদের মোকাবেলা করতে হয়। তবে আমাদের প্রস্তুতি আরো জোরদার করা উচিত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, একটি শহরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যে কোন দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুর্যোগ ঘটে গেলে একে অপরের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে সময় ক্ষেপণ করার একটা চেষ্টা থাকে আমাদের মধ্যে। দুর্যোগ কখন হবে সেটা বলা যায় না। কিন্তু ১০ বছর পরে হলেও সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। সিটি করপোরেশনকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য আমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানাই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। এই জায়গায় চ্যালেঞ্জগুলোকে ব্যবস্থাপনা করা অনেক কঠিন। এই চ্যালেঞ্জ একা সমাধান করা সম্ভব নয়। সক্ষমতা বৃদ্ধির জায়গাটিতে কাজ করা হবে। প্রতিটি ভবনকে কমপ্ল্যায়েন্সের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, গ্রামীণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমরা অনেক দক্ষ। গ্রামীণ এলাকায় দুই ধরনের দুর্যোগ বেশি পোহাতে হয়। উপকূলীয় এলাকায় ঘুর্ণিঝড় এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যা ও নদী ভাঙন। কিন্তু শহরে আমাদের বেশি ভয় অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্পের। নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ঢাকা শহরকে আমরা মোট আটটি ভাগে ভাগ করেছি। এর মধ্যে ভূমিকম্পের কারণে জমা হওয়া ডেবরি ব্যবস্থাপনা, মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা, এনজিও কার্যক্রম, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি কিভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে এসব বিষয় রয়েছে। তারপরও বর্তমানে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নগরে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আমাদের নেই। এটা স্বীকার করেই আমরা ভালো ব্যবস্থাপনার উদ্দেশে কাজ করে যাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সব সময়েই মানুষের দুর্যোগে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয়। আমরা চেষ্টা করছি দুর্যোগ হওয়ার আগে থেকেই যেন আমরা সামর্থ অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক বাজেট দিচ্ছে। আমার জানামতে মন্ত্রণালয়গুলোর বরাদ্দের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রথম সারিতে আছে। তাই শুধু বরাদ্দ পেলেই হবে না সেটা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজে লাগাতে হবে। তবেই নগর দুর্যোগ হ্রাসে এগুতে পারবো আমরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, পৃথিবীব্যাপী ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দেড়শ ভূমিকম্প হয়, প্রতি সপ্তাহে হয় দেড় হাজারের বেশি, প্রতি মাসে সাড়ে চার থেকে প্রায় ৫ হাজারের মতো এবং বছরে ৬৪ হাজারের বেশি ভূমিকম্পের তথ্য পাওয়া গেছে। এটা গত এক বছরের চিত্র। ২০১৫ সালের নেপালের ভূমিকম্প আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা ছিলো। যখন ভূমিকম্প হয় তখন আমরা অনেক সতর্ক হই। কিন্তু কিছুদিন পরেই ভুলতে বসি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আতিকুল হক বলেন, অনেকের বাড়ি গ্রামে হলেও থাকছি নগরে। তাই দুই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। এ বছর পরপর চতুর্থবার বন্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে আমাদের। নাটোরের নলডাঙার মতো যেসব অঞ্চলে কখনই বন্যা হয়নি, সেসব জায়গাও বন্যা হয়েছে এবার। এসওডি অনুযায়ী আমরা এখনো কাজ করতে পারছি না। তবে বাংলায় তা প্রিন্ট করে বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর অরলা মারফী বলেন, যেকোন দুর্যোগই মানুষের উপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে। সবাইকে যুক্ত করে সমন্বিত পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকার যৌথভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় কাজ করছে। তবে নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জরুরি। আমি মনে করি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবো।

গোলটেবিল বৈঠকে এছাড়াও ফারায় সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন, বাহিনীটির সাবেক মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আলী আহমদ খান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীমা প্রধান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ঢাকা ও কান্ট্রি পোর্টফোলিও ম্যানেজার আফরোজ মহল, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল লতিফ হেলালী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।



সাতদিনের সেরা