kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘ট্রানজিট বাণিজ্যে’ দেশে নতুন মাদকের শঙ্কা

এস এম আজাদ   

৬ অক্টোবর, ২০২০ ০২:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘ট্রানজিট বাণিজ্যে’ দেশে নতুন মাদকের শঙ্কা

বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বিমান ও স্থলপথে পাচার হচ্ছে প্রচলিত-অপ্রচলিত নানা মাদক। কোকেন, খাত, আইস পিল (এনপিএস), ক্রিস্টাল, এমডিএমএ, অ্যামফিটামিন নামে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য মিথ্যা ঘোষণায় এনে আবার বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন পথে চলছে এই পাচার কার্যক্রম। নজরদারি এড়িয়ে মাদকের এই দেদার ‘ট্রানজিট বাণিজ্যে’ দেশে নতুন নতুন মাদক ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে তথ্যবিনিময়ে বিমানবন্দরে মাদকের কিছু চালান ধরা পড়লেও নজরদারির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আবার ট্রানজিট বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা মাদকগুলোর বেশির ভাগই এখনো সেভাবে চিহ্নিত নয়। এগুলোর মধ্যে আইস পিল, খাত ও অ্যামফিটামিন ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে ‘টাপেন্টাডল’ ট্যাবলেটকে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের (২০১৮) খ শ্রেণির মাদকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিষয়টির ভয়াবহতা অনুধাবন করে ডিএনসি মাদক শনাক্তকরণে হযরত শাহজালালে স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি ডগ স্কোয়াড তৈরির প্রস্তাব তৈরি করা হলেও তা এখনো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।

ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিমানবন্দরে স্ক্যানার স্থাপন ও ডগ স্কোয়াড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন এজেন্সি কাজ করে। বিভিন্ন বিষয়ে অনুমতির ব্যাপার আছে। আবার কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে নজরদারির মধ্যে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসতে হবে।’

ডিএনসির সাবেক ডিজি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রথম ‘খাত’-এর চালান ধরি। এমন আরো কিছু চালান ধরা হয়, যেগুলো অন্য দেশ থেকে এসে আবার ভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছিল। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এসব মাদক দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এরই মধ্যে দেশে ‘আইস’ ব্যবহারের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। অবশ্য বিমানবন্দরে স্ক্যানারসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র স্থাপনে একটি প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হলেও আমি অবসরে যাওয়ার আগে তা শেষ হয়নি।”

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত ৯ সেপ্টেম্বর সাতটি কার্টন তল্লাশি করে জিন্সের প্যান্টের আড়ালে অভিনব কায়দায় লুকানো ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম সন্দেহজনক দ্রব্য জব্দ করে ডিএনসি। পরে নমুনা পরীক্ষায় অ্যামফিটামিন পাওয়া যায়, যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তালিকাভুক্ত মাদক। কুরিয়ার সার্ভিসে হংকং হয়ে অস্ট্রেলিয়া অভিমুখী পার্সেলটিতে প্রাপকের ঠিকানা লেখা ছিল—দাস সিং, ৩৪ কলম্বিয়া রোড, মেলবোর্ন, নারে ওয়ারেন লিআইসি ৩৮০৫। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত মোট ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকসহ আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্র জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে।

ডিএনসির প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ডা. দুলাল কৃষ্ণ সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশঙ্কার বিষয় হলো, অ্যামফিটামিন ইয়াবা তৈরির এক প্রকার কাঁচামালও। চীন, ভারতে এটি তৈরি এবং বিভিন্ন দেশে পাচারের খবর আছে। এর আগে আইস ও এনপিএস পাওয়া যায়, যা উচ্চমাত্রার ক্যাটামিনের মতোই মাদক। খাত পাচারের প্রমাণ এবং ব্যবহারের গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।’

২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট বিমানবন্দরে দেশের ইতিহাসে প্রথম নিউ সাইকোঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্সেস (এনপিএস) ‘খাত’-এর চালান আটক করেন ডিএনসির গোয়েন্দারা। গ্রেপ্তার করা হয় নাজিম নামের এক কারবারিকে। ধারাবাহিক অভিযানে ৯ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরে জিপিওর বৈদেশিক পার্সেল শাখা থেকে ৯৬টি কার্টনে ২০টি ঠিকানায় ‘গ্রিন টি’ নামে আসা এক হাজার ৫৮৬ কেজি ৩৬০ গ্রাম খাত জব্দ করে সিআইডি। পরে আরো কিছু খাত ধরা পড়ে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে মাদক কারবারি জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ পাঠান এসব চালান। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হতো এই চালানগুলো।

গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর জিগাতলায় এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ডিএনসির কর্মকর্তারা আইসপিল, ক্রিস্টাল, এমডিএমএ নামের তিন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেন। গ্রেপ্তার করা হয় হাসিব মুয়াম্মার রশিদ নামের এক তরুণকে।

এভাবে একের পর এক নতুন নতুন মাদকের চালান ধরা পড়ার ঘটনায় দেশে নতুন মাদক ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় নজরদারি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে ‘টাপেন্টাডল’ ট্যাবলেটকে মাদক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ব্যথানাশক এই ট্যাবলেট ইয়াবা ও হেরোইনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিএনসির উপপরিচালক (ঢাকা মেট্রো-উত্তর) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘কুরিয়ারে পার্সেল মাদক পাচারের তথ্য পেয়ে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। পার্সেল ডেলিভারির ক্ষেত্রে যেন প্রেরক ও প্রাপকের সঠিক ঠিকানা, এনআইডির কপি সংগ্রহ, সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ে আমরা চিঠি দিচ্ছি।’

কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সিএসএবি) সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিস কখনো মাদক চোরাচালানে সহযোগিতা করে না। আমরা সরকারের কাছে স্ক্যানার চেয়েছি। ভর্তুকিও দিচ্ছি। কিন্তু সরকার এখনো কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা