kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

স্বাভাবিকতায় আরো বড় সংকটে বয়স্করা

তৌফিক মারুফ   

১ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৩৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাভাবিকতায় আরো বড় সংকটে বয়স্করা

দেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্তদের মধ্যে ৯৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের নিচে। মাত্র ৭ শতাংশের বয়স তার ওপরে। কিন্তু আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। অর্থাৎ বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছেন কম, কিন্তু মারা যাচ্ছেন বেশি।

এই তথ্য সামনে রেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারি নিয়ে মানুষের ভয় অনেকাংশে কেটে গেলেও বাস্তবতা হচ্ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য করোনা ভয়ের ব্যাপারই রয়ে গেছে। করোনাভাইরাস বয়স্কদের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। বিশেষজ্ঞরা জানান, বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুসারেও বেশি মারা যাচ্ছে ষাটোর্ধ্ব মানুষ।

আন্তর্জাতিকভাবে ষাট বছরের ওপরের মানুষকে প্রবীণ হিসেবে ধরা হলেও বিভিন্ন দেশ নিজেদের গড় আয়ু ও মৃত্যুহার অনুসারে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন নীতিমালা ঠিক করে থাকে। বাংলাদেশে জনসংখ্যাবিদরা ৬০ বছরের ওপরের মানুষকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কোটায় ফেললেও জনস্বাস্থ্যবিদরা দেশে নানা ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৫৫ বছর থেকে বয়স্ক বা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষাপটে ৫০ বছরের ওপরের জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৫টি। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে তিন লাখ ৬৩ হাজার ৪৭৯ জন। যাদের মধ্যে মারা গেছে পাঁচ হাজার ২৫১ জন ও সুস্থ হয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৭ জন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে এক থেকে ১০ বছর বয়সের রয়েছে ৩ শতাংশ, ১১-২০ বছরের ৭ শতাংশ, ২১-৩০ বছরের ২৮ শতাংশ, ৩১ থেকে ৪০ বছরের ২৭ শতাংশ, ৪১-৫০ বছরের ১৭ শতাংশ, ৫১-৬০ বছরের ১১ শতাংশ ও ষাটোর্ধ্ব ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ আক্রান্তদের বয়স ২১-৪০ বছরের মধ্যে। আর মোট হিসাবে মাত্র ১৮ শতাংশ রয়েছে ৫১ বছরের ওপরে। 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ মৃত্যুর বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়া পাঁচ হাজার ২৫১ জনের মধ্যে ১০ বছরের নিচের শিশু ২৪ জন বা ০.৪৬ শতাংশ, ১১-২০ বছরের ৪২ জন বা ০.৮০ শতাংশ, ২১-৩০ বছরের ১১৯ জন বা ২.২৭ শতাংশ, ৩১-৪০ বছরের ২৯৯ জন বা ৫.৬৯ শতাংশ, ৪১-৫০ বছরের ৬৭৮ জন বা ১২.৯১ শতাংশ, ৫১-৬০ বছরের এক হাজার ৪১২ জন বা ২৬.৮৯ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ দুই হাজার ৬৭৭  জন বা ৫০.৯৮ শতাংশের বয়স ষাট বছরের ওপরে ছিল। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর হিসাবে প্রায় ৭৮ শতাংশের বয়স ৫১ বছরের ওপরে। এমনকি সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও যে ৩২ জনের মৃত্যু ঘটেছে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭ জন বা প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ছিল ৫১ বছরের বেশি।

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো আকস্মিক সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে বয়স্ক ও শিশুরা। কারণ শিশুদের মধ্যে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, অন্যদিকে বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে শিশুরা আক্রান্ত হলেও তাদের মৃত্যু কম। কিন্তু বয়স্করা এ ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বয়স্কদের মধ্যে যারা আগে থেকেই বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল, তারা করোনায় আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে তাদের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি নজর রাখা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আমরা পরামর্শ দিচ্ছি, ৫০ বছরের ওপরে কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে কিংবা উপসর্গ থাকলে তারা যেন বাসায় না থেকে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেয়। বিশেষ করে যাদের আগে থেকে অন্য কোনো রোগ রয়েছে তাদের অবশ্যই হাসপাতালে যাওয়া দরকার।’

ড. মুশতাক আরো বলেন, বয়স্করা সাধারণ করোনা মহামারির মধ্যে ঘর থেকে কম বের হয়, এমনকি অনেকে বেরই হচ্ছে না। কিন্তু পরিবারের অন্যরা যেহেতু বিভিন্ন প্রয়োজনে বাইরের যাওয়া-আসা করে, ফলে তাদের মাধ্যমে ঘরে এই ভাইরাস প্রবেশ করে। তাই যে পরিবারে বয়স্ক ব্যক্তিরা আছে, সেই পরিবারের যারা ঘরের বাইরে যাওয়া-আসা করে তাদের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, বয়স্কদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সেই সঙ্গে বয়স্করাও যাতে যতটা সম্ভব নিজেদের সুরক্ষায় সচেতন থাকে সে জন্য পরিবারের অন্যদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

এদিকে জনসংখ্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ কে এম নুরুন নবী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন প্রায় ৭ শতাংশ বা এক কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা