kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ কার্তিক ১৪২৭। ২৯ অক্টোবর ২০২০। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জাহালম ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৯:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাহালম ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না : হাইকোর্ট

ভুল আসামি হয়ে তিন বছর কারাবন্দি থাকা পাটকল শ্রমিক জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংককের দুই কর্মকর্তা চিহ্নিত করায় এই জরিমানা করা হয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে। রায়ের কপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই টাকা পরিশোধের এক সপ্তাহের মধ্যে তা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। 

আদালত বলেছেন, জাহালমের এ ঘটনায় তার নিজের কোনো দোষ নেই। বিনাদোষে তাকে তিনটি বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে। তার জীবন থেকে তিনটি বছর চলে গেছে। তাকে তার পেশাটাও হারাতে হয়েছে। তার পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই জাহালম ক্ষতিপূরণ পাবার অধিকারী। 

একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত ৩৩ মামলায় পুনরায় শুরু হওয়া তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে তা নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়া এ ঘটনায় দুদকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, এক্ষেত্রে আমরা একটা স্বচ্ছ চিত্র দেখতে চাই। 

বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় ঘোষণা করেন। ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেওয়া হয়। এ রায় ঘোষণার সময় জাহালম সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে উপস্থিত ছিলেন। আদালতে জাহালমের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র দাস, দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান, ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আমিনুল হাসান, সিটি ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন সামির সাত্তার, সোনালী ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল এম সাইফুল আলম।

রায়ের পর জাহালম সাংবাদিকদের বলেন, বিনা দোষে তিন বছর জেল খেটেছি। এখন আদালত ১৫ লাখ টাকা দিতে রায় দিয়েছেন। আদালতের রায়ে আমি খুশি। এই টাকা তাড়াতাড়ি চাই। 

তিনি বলেন, আমি গরিব মানুষ। পাটকলে চাকরি করতাম। এখন চাকরি নেই। এরইমধ্যে অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছি। তাই দ্রুত টাকা পেলে দায়দেনা পরিশোধ করবো।  

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি রোধ করাই যাদের প্রধান কাজ। তারা স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ করবে। জনগণের প্রত্যাশা, দুদক সবকিছুর উর্ধ্বে থেকে স্বচ্ছভাবে দায়িত্ব পালন করবে। আইনের আলোকে জাহালমের ঘটনায় দুদককে দায়ী করা না গেলেও দুদকের নবীন কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও অদক্ষতা প্রতিয়মান হয়েছে। যদিও সিনিয়র কর্মকর্তাদের তদারকির দায়িত্ব ছিল। কিন্তু ওই তদারকি কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। 

আদালত বলেন, আমরা আইনের আলোকে বিবেচনায় নিচ্ছি যে দুদক কাজটি করেছে সরল বিশ্বাসে। এখানে দুদকের অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। 

আদালত বলেন, মামলার অনুসন্ধানকালে নাগরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেছিলেন জাহালম হতদরিদ্র। যে ব্যক্তি জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা নিতে পারে তার বাড়ি বা আর্থিক অবস্থা কি রকম হতে পারে তা অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার বোঝা উচিত ছিল। 

আদালত বলেন, আমরা আশা করি, দুদক ভবিষ্যতে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক থাকবে। দুদকের করা মামলায় যেন নিরাপরাধ আর কাউকে জেল খাটতে না হয়। জাহালমের মতো ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না হয়। আমরা প্রত্যাশা করি, এটাই যেন হয় শেষ ঘটনা। 

রায়ে ব্র্যাক ব্যাংক প্রসঙ্গে বলা হয়, ব্যাংকটির দুই কর্মকর্তা সাবিনা শারমীন ও ফয়সাল কায়েস জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে সনাক্ত করেছেন। এই সনাক্ত করাই জাহালম কাণ্ডের মূল সূত্রপাত। সেকারণেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায় ব্যাংকটির ওপর বর্তায়। 

সোনালী ব্যাংক প্রসঙ্গে আদালত বলেন, সোনালী ব্যাংক তার নথিপত্রে কোথাও আবু সালেককে জাহালম হিসেবে উল্লেখ করেনি বা সনাক্তও করেনি। তাই এক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের কোনো দোষ দেখছি না।

“৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি জেলে” শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ আদেশ দেন হাইকোর্ট। আদালতে প্রতিবেদনটি নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী (বর্তমানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল) অমিত দাসগুপ্ত। এরপর আদালত গতবছর ২৮ জানুয়ারি স্বতপ্রনোদিত হয়ে আদেশ দেন। জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতবছর ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জাহালমকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন এবং তাকে কারামুক্তির নির্দেশ দেন। এ নির্দেশে সেদিন রাতেই জাহালমকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রশ্নে রুল জারি করেন। এছাড়া জাহালমকে আসামি করার পেছনে দুদকের ১৪ কর্মকর্তার অবহেলাকে দায়ী করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেয় দুদকের অভ্যন্তরীন তদন্ত কমিটি। পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও দায়ী করা হয়। 

এছাড়াও জাহালমকে আসামি করার পেছনে দুদক ও বিভিন্ন ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারি জড়িত তারা যেন চাকরির টাকা-পয়সা নিয়ে পালাতে না পারে সেজন্য তাদের ওপর নজরদারি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রশ্নে রুলের ওপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুনানি সম্পন্ন হওয়ায় রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। এ অবস্থায় আজ ভার্চুয়ালি রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে প্রায় তিনবছর ধরে জেল খাটছেন, আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। এরইমধ্যে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে কারাবন্দি জাহালমকে নিরাপরাধ উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর আদালত একটি মামলায় তাকে জামিন দিয়েছে।’ 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা