kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ছোট দল যেন তাসের ঘর

নিখিল ভদ্র   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:১১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ছোট দল যেন তাসের ঘর

আদর্শ ও উন্নয়নের কথা বলে মুখে ফেনা তোলা হলেও মূলত স্বার্থের দ্বন্দ্বেই ছোট দলগুলোতে চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বড় ধরনের চিড় না ধরলেও ছোট দলের ঘর তছনছ হচ্ছে একের পর এক। ভাঙনের মধ্য দিয়ে দলগুলো খেই হারাচ্ছে বারবার। এর ফলে দেশের ছোট রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে টুকরা টুকরা হচ্ছে। ছোট দল হচ্ছে আরো ছোট। দেশের রাজনীতিতে দলগুলো থেকে যাচ্ছে বামনই! কোনো সময়ই আর ‘চাঁদ’ ছোঁয়া হচ্ছে না।

সর্বশেষ ভাঙনের মুখে পড়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক বর্ধিত সভা ডেকে নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেন দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। ওই সভায় ৫২ জেলার ২৮৩ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আগামী ২৬ ডিসেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার অভিপ্রায়ও জানিয়েছেন। জাতীয় কাউন্সিলকে সফল করার লক্ষ্যে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে আহ্বায়ক করে ২০১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, অর্থবহ পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণফোরাম জাতীয় ঐক্য চায়। সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে আগামী ২৬ ডিসেম্বরের কাউন্সিলে উপস্থিত ডেলিগেটদের মতামত নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে বিতর্কিত লোকদের পরিহার করে দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেন তাঁদের সঙ্গে থাকবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘তাঁদের (মন্টুসহ তিন নেতা) কোনো সাংগঠনিক ক্ষমতা ও এই ধরনের মিটিং করার বৈধতা নেই। তাই মিটিংয়ের সঙ্গে গণফোরামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটি আমাদের দলের সিদ্ধান্ত না।’

এলডিপি-বিকল্পধারা : গত বছরের ১৬ নভেম্বর ভাঙে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। দলের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে বাদ দিয়েই দলের নতুন কমিটি ঘোষণা দেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। নতুন কমিটিতে আবদুল করিম আব্বাসীকে আহ্বায়ক করা হয়। ২০০৬ সালে এলডিপি গঠনের সময় থেকেই শাহাদাত হোসেন দলের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতার শেষ দিকে বিএনপির ৩২ জন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ ১০২ জন নেতা একজোট হয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমদের নেতৃত্বে এলডিপি গঠন করেন। একপর্যায়ে এলডিপি ও এর আগে বিএনপি থেকে বেরিয়ে গঠন করা এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দল বিকল্পধারা বাংলাদেশ একীভূত হয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরে দুই দল আলাদা হয়ে যায়। ২০০৪ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বি চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্পধারা গঠিত হয়।

ওয়ার্কার্স পার্টি : আদর্শগত দ্বন্দ্বের কথা বলে কয়েক দফায় ভেঙেছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। পার্টির দশম কংগ্রেস বর্জন করা নেতারা গত বছরের ২৯-৩০ নভেম্বর যশোরে ওয়ার্কার্স পার্টির ‘মতাদর্শ রক্ষা সমন্বয় কমিটি’র ব্যানারে সম্মেলন করে নতুন কমিটি গঠন করেন। বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্ক্সবাদী) নামের এই নতুন দলের সভাপতি নুরুল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ। দুজনই রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন কমিটির পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন। এর আগে গত বছরের ২২ অক্টোবর পার্টির মূল নেতৃত্বে বিচ্যুতির অভিযোগ তুলে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর আরেক সদস্য বিমল বিশ্বাস। এরপর ২০১৯ সালের নভেম্বরে ওয়ার্কার্স পার্টির দশম কংগ্রেসে রাশেদ খান মেনন সভাপতি ও ফজলে হোসেন বাদশা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন।

জাসদের একাধিক ধারা : স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রথম রাজনৈতিক দল বর্তমান সরকারের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ গঠিত হওয়ার পর দফায় দফায় ভেঙেছে দলটি। জাসদের মূলধারার সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। তাঁরা দুজনই সংসদ সদস্য। তবে এই জাসদ থেকে বেরিয়ে গঠন করা বাংলাদেশ জাসদের একমাত্র সংসদ সদস্য ছিলেন মইন উদ্দীন খান বাদল। ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ গঠিত বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি পদে শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক পদে নাজমুল হক প্রধান নির্বাচিত হন।

১৯৮০ সালে জাসদ প্রথম ভাঙনের কবলে পড়ে। জাসদ থেকে বেরিয়ে বাসদ গড়ে তোলা হয়। ১৯৮৬ সালে কাজী আরেফ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত দল জাসদ (ইনু) হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে জাসদ সাত ভাগ হয়। ২০০২ সালে আ স ম রবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) গঠিত হয়। এই জাসদ ভেঙে আব্দুল মালেক রতনের নেতৃত্বে আরো একটি জেএসডি গঠিত হয়েছে।

জাতীয় পার্টি পাঁচ টুকরা : এরশাদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল জাতীয় পার্টি (জাপা)। নির্বাচন কমিশনে এ দলটি নিবন্ধিত লাঙল প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) ও নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (বিজেপি) গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে নিবন্ধিত। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটভুক্ত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ। এর বাইরে কাঁঠাল প্রতীকে তাসমিনা মতিনের নামেও জাতীয় পার্টির নিবন্ধন আছে।

বাসদ : বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সর্বশেষ ভাঙনের মুখে পড়ে ২০১৩ সালের এপ্রিলে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুবিনুল হায়দার চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই অংশে কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তীও ছিলেন। বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে ‘আদর্শচ্যুতির’ অভিযোগ এনে তাঁরা এই ঘোষণা দেন।

অন্যান্য সংগঠন : সম্প্রতি ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হয়েছে। কারোনা পরিস্থিতিতে পুরো বিশ্ব যখন আতঙ্কিত, তখনই এবি পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী থেকে বেরিয়ে এসে একটি গ্রুপ এই দল গঠন করেছে। জাসদ, বাসদ ও আওয়ামী লীগ হয়ে এখন নাগরিক ঐক্যের নেতৃত্বে আছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব ও গঠনমূলক রাজনীতিচর্চার অনুপস্থিতির কারণেই দলগুলোতে এভাবে ভাঙন চলছে। এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও এর প্রধান কারণ স্বার্থের দ্বন্দ্ব। তবে এই ভাঙনের কারণে শক্তি হারাচ্ছে ছোট দলগুলো। এতে রাজনীতিতে কোনো কোনো দলের আধিপত্য বাড়ছে, যা দেশের রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত।

রাজনৈতিক দলের ভাঙন প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, গত ১০০ বছরে ভাঙেনি কোনো দল? ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙেছে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভেঙেছে। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙেছে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভেঙেছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ভেঙেছে। ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙেছে। সাম্যবাদী দলও ভেঙেছে। সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগেই সর্বহারা পার্টিও ভেঙেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে কতবার ভেঙেছে, তা তাদের নেতাদের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, বড় রাজনৈতিক দলের আদর্শের সঙ্গে নয় বরং নেতৃত্বের মধ্যে বিবদমান দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাসের কারণেই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। তাতেও রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা