kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা

তথ্য প্রকাশে বাধা, অন্য বিষয়ে চুপ!

বাহরাম খান   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তথ্য প্রকাশে বাধা, অন্য বিষয়ে চুপ!

প্রকৃত তথ্য প্রকাশে সরকারিভাবেই বাধা দেওয়া হচ্ছে। করোনাকালে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে নিজেদের কর্মচারীদের তথ্য প্রকাশে বিধি-নিষেধ আরোপ করলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল। এরই মধ্যে গত ২৪ আগস্ট কেন্দ্রীয়ভাবে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশে বা কথা না বলতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু একই বিধিমালায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা উল্লেখ আছে। সেগুলোর বিষয়ে পৃথকভাবে চিঠি দেওয়ার নজির নেই। শুধু তথ্য প্রকাশে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চিঠি দেওয়াকে আপত্তিকর হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

৪১ বছর আগে প্রণীত ওই বিধিমালার ১৩ নম্বরে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর প্রদর্শিত সম্পত্তির হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব বিবরণী যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের নিকট দাখিল করবেন।’ আরো বলা হয়েছে, চাকরিতে ঢোকার সময়ও কর্মচারী নিজের এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা শেয়ার, সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি, বীমা পলিসি এবং ৫০ হাজার টাকা বা ততোধিক মূল্যের অলংকারাদিসহ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা করবেন।

কিন্তু বাস্তবে পাঁচ বছর অন্তর দূরের কথা, পুরো চাকরিজীবনে সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বাড়ল নাকি কমল, তার খোঁজ নেওয়া হয় না। কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধে এই বিধি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে বলে ২০১৯ সালের জুনে হওয়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জনপ্রশাসনবিষয়ক এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে। কিন্তু কোনো মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের পক্ষ থেকেই সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় না। উল্টো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে প্রকারান্তরে দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন গত আগস্টে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে দেওয়া চিঠির বিষয়ে বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি মনে করিয়ে দেওয়া দোষ নয়।’ কিন্তু ভিন্নমত পোষণ করে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা মানে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। তিনি বলেন, ‘৪০-৫০ বছরের পুরনো অনেক কিছুই এখন সংশোধন হচ্ছে। সেখানে এমন একটি বিষয় পৃথকভাবে মনে করিয়ে দেওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’ সচিবালয়ে একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাও বিষয়টিতে বিব্রত মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলছেন, বিধিমালার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া অসুন্দর দেখায়। এ ছাড়া সরকার তো জনগণের জন্যই কাজ করে। সেখানে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় বিষয়গুলোর বাইরে অন্য তথ্য প্রকাশ পেলে সমস্যা কোথায়? ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-তে মোট ৩৪টি বিধি আছে। এতে বর্তমান সময়ের চাহিদায় অনেক বিষয়ে ঘাটতি থাকলেও যতটুকু আছে তারও অনেক পালন করা হয় না। ২০ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, ‘কোন সরকারি কর্মচারী তাঁর পক্ষে হস্তক্ষেপ করার জন্য কোন অনুরোধ বা প্রস্তাব নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন সংসদ সদস্য বা অন্য কোন বেসরকারি ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে পারবেন না।’ অথচ সচিবালয়সহ সর্বত্র সরকারি কর্মচারীদের তদবির প্রকাশ্যেই দেখা যায়। অনেকে বদলির পর কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগেই পছন্দের জায়গায় বদলির তদবির করেন।

‘কোন কর্মচারী তাঁর সম্মানে কোন সভা বা কেবল তাহাকে প্রশংসা করার উদ্দেশ্যে কোন বত্তৃদ্ধতা বা তাঁর সম্মানে কোন আপ্যায়ন অনুষ্ঠান সংঘটনে উৎসাহ প্রদান করতে পারবেন না’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিধি-৭-এ। কিন্তু শীর্ষ পদে থাকা অনেক কর্মকর্তাকেই এমন উৎসাহ দিতে দেখা যায়। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ওই বিধিমালা শুধু সরকারি কর্মচারী নয়, কর্মচারীর স্ত্রী, স্বামী, সন্তান, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সঙ্গে বসবাসরত এবং তাঁর ওপর প্রত্যাক্ষভাবে নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের (স্বামী/স্ত্রীর আত্মীয়) জন্যও প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত, পরিবার-আত্মীয় তো দূরের কথা, কর্মচারীরা নিজেরাই বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম পালন করেন না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা