kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বড় অবকাঠামো নির্মাণ খাতে বড় সম্ভাবনা

মাসুদ রুমী   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:০৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বড় অবকাঠামো নির্মাণ খাতে বড় সম্ভাবনা

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার বড় বড় মেগাপ্রকল্পের কাজ শুরু করে। পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রো রেল, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পায়রা বন্দরের মতো অবকাঠামোগুলো অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আসছে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্প ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন রড, সিমেন্ট, পাথরসহ অন্যান্য সংযোগ শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, সরকারি মেগাপ্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা যে হারে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এই খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুযোগ আছে।  

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিডাব্লিউ রিসার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে সিমেন্টের ব্যবহার ৩৫ শতাংশ। ব্যক্তি উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার ৪০ শতাংশ। আবাসন খাতে তা ২৫ শতাংশ। উদ্যোক্তারা জানান, গত দুই দশকে দেশে সিমেন্টের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। ২০০০ সালে মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার ছিল মাত্র ৪৫ কেজি। তবে গত বছরের শেষের দিকে এটি ২০০ কেজি বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে গত কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩৬টি সক্রিয় সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। শীর্ষ ১০টি কম্পানি বাজারের ৮১ শতাংশ শেয়ার দখল করে আছে। যদিও সিমেন্টের চাহিদা বার্ষিক তিন কোটি ৫০ লাখ টন, কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা আট কোটি টন। আগামী তিন বছরে এটি আরো ১ দশমিক ১ কোটি টন বাড়বে। এই খাতের উদ্যোক্তারা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। লক্ষাধিক নির্মাণ শ্রমিক, কর্মচারী, খুচরা বিক্রেতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

এদিকে বিশ্বের স্টিলশিল্পের অন্যতম উদীয়মান বাজার বাংলাদেশ। স্টিল উৎপাদনে বিশ্বের দুই শীর্ষ দেশ চীন ও ভারতের মাঝখানে থাকা বাংলাদেশের এ খাতও গত এক দশকে তাক লাগানো সাফল্য দেখিয়েছে। ইবিএল সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী দুই দশকে দেশের স্টিল খাতে বার্ষিক দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি আসবে। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে করোনা। উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনায় ঘুরে দাঁড়ানো তাঁদের জন্য এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের সহায়তা ছাড়া সংকট উত্তরণ কঠিন হবে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘সিমেন্ট হলো উন্নয়নের প্রতীক। কোন দেশের উন্নয়ন কেমন হচ্ছে তা ওই দেশের মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে লাখ লাখ নির্মাণ শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা জড়িত।’

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, সিমেন্টশিল্প বর্তমান সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সবচেয়ে বড় খাত। এ খাতকে অগ্রাধিকার না দিলে দেশের মেগাপ্রকল্পগুলো যেমন স্থবির হয়ে পড়বে, দেশের নির্মাণ খাতও স্থবির হয়ে পড়বে। তাই এ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে চলতি মূলধন হিসেবে দ্রুত এবং সহজ শর্তে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

এদিকে বড় বড় মেগাপ্রকল্পে পাথরের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু কিছু অসাধু আমদানিকারক পাথরের পরিবর্তে লাইমস্টোন আমদানি করছে, যা দেখতে ঠিক পাথরের মতো হলেও এগুলো কিন্তু পাথর নয়। লাইমস্টোনের গুণগত মান ও দীর্ঘস্থায়িত্ব কম। পাথরের তুলনায় দাম ও ডিউটি অনেক কম হওয়ায় বিভিন্ন আমদানিকারক লাইমস্টোন আমদানি করে পাথর হিসেবে বিক্রি করছে। আমদানি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মনীতি ও ঠিকমতো তদারকি না থাকায় এগুলো আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। নির্ধারিত মাত্রা ও মানের না হওয়ায় এসব পাথর ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর সরকারের টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী যেকোনো নির্মাণকাজে পাথর ব্যবহারের আগে তার গুণগত মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পালন করা হয় না। তাই ব্যবহারের আগেও পাথরের মান নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গুণগত মানের হওয়ায় সরকারের যে চলমান মেগাপ্রকল্পগুলো রয়েছে তার বেশিরভাগেই বসুন্ধরা গ্রুপের আমদানি করা পাথর ব্যবহার হচ্ছে বলে জানালেন পাথরের বসুন্ধরা গ্রুপের চিফ ফিন্যানশিয়াল অফিসার (সেক্টর-সি) মির্জা মুজাহিদুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ দুবাইয়ের সবচেয়ে ভালো মানের পাথর আমদানি করে থাকে। তাই পাথর উন্নতমানের হওয়ায় এসব বড় বড় প্রকল্পে ব্যবহার হচ্ছে।’

জানা গেছে, দেশের অনেক আমদানিকারক পাথরের সঙ্গে ডাস্ট আমদানি করে থাকে। পরে পাথরের সঙ্গে বিনা মূল্যে ডাস্ট মিশিয়ে বিক্রি করেন। বিশেষ করে কিছু কিছু রেডিমিক্স কম্পানি এটি ব্যবহার করে। তাদের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি তদারকি কম থাকায় এ সুযোগে কিছু রেডিমিক্স কম্পানি নিম্নমানের পাথর ও ডাস্ট ব্যবহার করছে। পাথরের সঙ্গে ডাস্ট ব্যবহার করায় অবকাঠামোর স্থায়িত্ব কমে যায়। তাই আমদানি করা পাথরগুলোর গুণগত মান ঠিক আছে কি না তা খালাস করার আগেই মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশের যেসব শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তার মধ্যে সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্প খাত অন্যতম। সরকার ঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে সিমেন্ট কারখানাগুলোতে ৯০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অথচ পরিচালন খরচ কমেনি। তা ছাড়া সিমেন্টের কাঁচামাল শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ পর্যন্ত যত এলসি খোলা হয়েছে, সেটিও এখন আমাদের জন্য একটি বড় বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

বিসিএমএ সভাপতি মো. আলমগীর কবির বলছেন, ব্যাংক থেকে যে চলতি মূলধন নেওয়া হয়েছে, তার সুদ ও আসল চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে; প্রকল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য যে ব্যাংক ঋণ রয়েছে, সেগুলোরও ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় ছোট-বড় সরকারি-বেসরকারি সব প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে। আর সেই কারণে নির্মাণের অন্যতম উপাদান তথা সিমেন্টের ব্যবহার অনেক কমবে এবং একই সঙ্গে উৎপাদনও কমে যাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা