kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশেষ লেখা

এ লজ্জার দায় কার?

আহমেদ নূর

অনলাইন ডেস্ক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এ লজ্জার দায় কার?

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০০ বছর আগে সিলেট এলে এমসি কলেজের শিক্ষার্থীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘স্বদেশের পুঞ্জীভূত লজ্জা দূর করবার ভার তোমাদের ওপর। তোমরা আকাঙ্ক্ষাকে বড় করবে, সাধনাকে সত্য করবে।’ এর পাঁচ বছর পর ১৯২৪ সালে কলেজে এসে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী সরোজিনী নাইডু বলেছিলেন, ‘এ কলেজে যারা পড়ে তাদের প্রত্যেকের কবি হওয়া উচিত।’ ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যাঁদের ওপর লজ্জা দূর করার ভার দিয়েছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরিরা মাত্র দুই দিন আগে গোটা সিলেটবাসীকে লজ্জায় ডুবিয়ে দিয়ে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ গণধর্ষণ করেছে। এর আগে ২০১২ সালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে ঐতিহ্যের স্মারক এই কলেজের ছাত্রাবাসটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। লজ্জা দূর করা কিংবা ‘কবি’ হওয়ার বদলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তি ধ্বংসে তারা এখন তৎপর।

সিলেট এমসি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯২ সালে। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন অন্য যেকোনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রায় ছয় একর ভূমির ওপর নির্মিত কলেজ ছাত্রাবাসটির স্থাপত্যশৈলী যেকোনো দর্শনার্থীর দৃষ্টি কাড়ত। ছাত্রাবাসের সামনে সুবিশাল মাঠ, ছয়টি ব্লকে ভাগ করা ছাত্রাবাসের এক ব্লক থেকে অন্য ব্লকের দূরত্ব অনেক। যে স্থাপত্যকলায় ছাত্রাবাসের ভবনগুলো নির্মিত হয়েছিল, তা এখন বিশ্বে বিরল। স্থাপত্যকলার ভাষায় এই ভবনগুলোর নাম ‘সেমি পাক্কা আসাম টাইপ’। কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে ঐতিহ্যবাহী সেই ছাত্রাবাসটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আর এবার স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়েছে। সিলেটের ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম। কিন্তু যে বা যারা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তাদের এটি প্রথম অপকর্ম নয়। এর আগে ছাত্রাবাস জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়াও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে গোলাগুলি, ছাত্রাবাস ভাঙচুর, টেন্ডারবাজি, ছাত্রাবাস দখলসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে তারা জড়িত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাদের কখনো আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।

সিলেটের সবাই জানে এসব কারা করছে। রাজনৈতিক নেতারা জানেন, প্রশাসনও জানে। কাদের মদদে দিনের পর দিন এসব অপকর্ম চলছে, তা-ও অজানা নয়। কিন্তু কেউ তাদের লাগাম টেনে ধরছে না, যা বিস্ময়কর। সিলেটে এর আগে এমনটি দেখা যায়নি। সেটি আওয়ামী লীগের আমলে হোক আর বিএনপি সরকারের আমলে হোক। নেতারা তাঁদের দুষ্ট কর্মীদের লাগাম টানার চেষ্টা করেছেন। কারণ সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির বিপক্ষে রাজনৈতিক সম্প্রীতির জন্য সিলেট সব সময়ই উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আর এই সিলেটে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কেন?

দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি ২০০০ সালের কথা। যখন সরকারি ও বিরোধী দলের পরস্পরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ, ঠিক সেই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হানাহানির প্রেক্ষাপটে সিলেটের রাজনৈতিক ও পেশাজীবী নেতারা একমত হয়ে সিলেটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রায় ৯ মাস ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর সব ধরনের তৎপরতা বন্ধ ছিল, যা সে সময় সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এক দশক ধরে আমরা এমন উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। নেতৃত্বের সংকটের কারণেই এমনটি ঘটছে কি না অনুসন্ধান করা দরকার।

এমসি কলেজে গণধর্ষণের পরদিন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করবেন কেন? এর আগে কি একবারও তিনি কাউকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন? কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? এমনকি একবারও তো তিনি অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতাদের বিষয়টি জানাননি। তাই এ দায় তিনি কিভাবে এড়াবেন। অথচ এই সিলেটে কলেজে নয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে চড় মারার অভিযোগে এক ছাত্রকে চিরতরে বহিষ্কার করার উদাহরণও রয়েছে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জন ছাত্রলীগকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কারের ঘটনাও বহুল আলোচিত। আর এমসি কলেজের কথাই যদি বলি, তবে অধ্যক্ষ হাসান ওয়ায়েজের কথা এখনো এই কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্মরণ করেন। প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। তাই অধ্যক্ষ যতই অসহায় বলুন না কেন, নৈতিকভাবে তিনি এ দায় এড়াতে পারেন না।  

আসলে এই দায় কেউই এড়াতে পারেন না। সিলেটের রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই। গত ১০ বছরে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১১ জন কর্মী খুন হয়েছে। ছাত্রলীগের যে গ্রুপটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে, এরাই আট বছর আগে ছাত্রাবাসে আগুন দিয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ছাগল উন্নয়ন খামারের ‘পাঁঠা’ না দেওয়ায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে আহত করেছে এই গ্রুপটিই। তবু তাঁরা আশ্চর্যজনকভাবে নির্লিপ্ত ছিলেন। কেন এই নীরবতা তার জবাব দেওয়ার সময় বোধ হয় এখন এসে গেছে।

এমসি কলেজের বয়স এখন ১২৮ বছর। সিলেট অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই কলেজটির অতীত গৌরবোজ্জ্বল। স্বাধীন বাংলাদেশের তিনজন অর্থমন্ত্রী যথাক্রমে এম সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত এ কলেজেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ছাড়া সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও এই কলেজের ছাত্র। দেশভাগের আগে তৎকালীন আসামের শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদ, পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ও ডন পত্রিকার সম্পাদক আলতাফ হোসেনও এই কলেজের ছাত্র ছিলেন। তাঁরা সবাই এই কলেজের, সিলেট অঞ্চলের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছেন। আর এখন এই কলেজের বিপথগামী শিক্ষার্থী নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সিলেটবাসীর মুখে কলঙ্কের কালিমা মাখিয়ে দিচ্ছে।

সিলেটবাসীর এই লজ্জা দূর করবে কে বা কারা? তার আগে ভাবতে হবে এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হলোই বা কেন? সিলেটের রাজনৈতিক নেতারা, নাগরিক সমাজ যত দ্রুত বিষয়টি অনুধাবন করবে, লাগাম টেনে ধরার উদ্যোগ নেবে, ততই মঙ্গল। কারণ কতিপয় দুর্বৃত্তের দুর্বৃত্তপনার কারণে সিলেটের ঐতিহ্য বিনষ্ট এবং ভাবমূর্তিকে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা