kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভার্চুয়াল সেমিনারে বক্তারা

দূষণমুক্ত নদ-নদীর জন্য প্রয়োজন সমন্বয় ও জনসচেতনতা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২২:২১ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দূষণমুক্ত নদ-নদীর জন্য প্রয়োজন সমন্বয় ও জনসচেতনতা

সারা দুনিয়ার শতদেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব নদী দিবস। দেশের ১২টি পরিবেশবাদী সংস্থার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘দূষণমুক্ত নদী-সুস্থ জীবন’ শিরোনামে ভার্চুয়াল সেমিনার।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। যৌথভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষণাগারের সমন্য়কারী ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া ও রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্ম্দ এজাজ।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ মুকিত মজুমদার বাবুর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহমুদ হাসান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব ও এটুআইয়ের যুগ্ম প্রকল্প পরিচালক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর, দি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব এপেক্স ক্লাবস বাংলাদেশের জাতীয় সভাপতি এপেক্সিয়ান নিজামউদ্দিন পিন্টু ও বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন। অতিথি হিসেবে ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিশ্ব নদী দিবসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ার মার্ক এঞ্জেলো।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদের লোক-নদীর লোক, বলে তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, আজ থেকে দশ-পনেরো বছর আগেও এমনটা ভাবা যেতো না, যে একই বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন মিলে একসাথে আলোচনা করছেন, কাজ করছেন। বিশ্বের সকল নদীর জন্যই আমরা কাঁদি, এটাই হোক আজকের প্রধান বিষয়।

তিনি লেন, আমরা কাজ করে হালদা নদীর পোনা উত্পাদন বাড়িয়েছি। যেখানে মাঝে পোনা উত্পাদন অনেক কমে গিয়েছিল। আপনারা দেখবেন, ঢাকার চারপাশে বিশেষত যেখানে শিল্পায়ন হয়েছে, সেখানেই দূষণ হযেছে। দূষণ হচ্ছে অধুনিকায়নের কুফল।

তিনি আরো বলেন, নদীর সংখ্যা নিয়ে নানা তথ্য আছে। তবে আমরা কাজ করতে গিয়ে ৫০৪টি নদী সচল পেয়েছি। পানি প্রবাহ আছে।ডেল্ট পেস্ননের আওয়তায় কাজ করতে গিয়ে আরও নদী পেয়েছি। এই নদী বাঁচাঁতে সারা দেশে একযুগে নদী পাড়ে উচ্ছেদ করেছি। করোনার জন্য এখন বন্ধ আছে। তবে শিগগিরই শুরু হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষণাগারের সমন্য়কারী ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দূষণমুক্ত নদীর সাথে স্বাস্থ্যকর জীবনের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ, কার্বনডাইঅক্সাইড, পিএইচ, কনডাকডিভিটি, লবণাক্তততা, টারভিডিটি ইত্যাদিকে ইনডেক্স হিসেবে বিবেচ না করলেও দূষণমুক্ত নদীর বলতে সাধারণ কনসেপ্ট এখনো এরকম যে নদীর পানি পানযোগ্য, গোসলযোগ্য এবং নিত্য প্রয়োজনীয় গৃহস্থলীর কাজে ব্যবহার উপযোগী নদীকেই বুঝায়।

তিনি আরো যুক্ত করেন, ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং শীতলক্ষ্যা নদী, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দিকে তাকালে বর্তমান বাংলাদেশের নদী গুলোরএকটি বাসত্মব চিত্র দেখাযায়। ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈব দূষকে দূষিত দেশের অধিকাংশ নদ-নদী। দূষকের উত্স হিসেবে দেখলে টেনারী, শিল্পবর্জ্য, গৃহাস্থলীবর্জ্য, কৃষিবর্জ্য, পস্নাস্টিক, হেভিমেটাল, আর্সেনিক, পোলট্রি, তেল দূষণ ও কয়লা বিদ্যু থেকে পারদ দূষণ অন্যতম। এ অবস্থা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। 

আরেকটি মূল প্রবন্ধে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্ম্দ এজাজ বলেন, আমাদের দেশের শহর ও গ্রামের প্রায় সকলেরই তাদের খাদ্য উত্পাদন ও জীবন জীবিকার জন্য যেই পানির প্রয়োজন পড়ে তা নদী ও তার অববাহিকার থেকে প্রাপ্ত পানিদিয়েই পুরন কওে থাকে। এসডিজি ১,২, ৩,৪,৬, সহ আরো ১০টি টারগেট নদী জলাশয়ের অবদানের সাথে সরাসরি সমিপ্রক্ত। সুতরাং, টেকসই উন্যয়নের জন্য সুস্থ নদ-নদী আমাদের জন্য আবশ্যক। অথচ এখন সরকারি মিউনিসিপ্যাল্টি, শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য দিয়ে নদীর সাস্থ্য নষ্ট করার জন্য জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। সাথে সাথে কভিড সময়ে পানিবাহিত মহামারি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিও বয়ে আনছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক ১২টি সংগঠন নদীকে ভালোবাসেন বলেই তারা এই আয়োজন করেছেন। আমরা যদি দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গঠন করতে চাই, তাহলে নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। নদীর পানি প্রবাহকে ঠিক রাখতে ড্রেজিং করতে হবে। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু এটা প্রথম শুরু করেন, পরবর্তী পর্যায়ে আজকে প্রধানমন্ত্রী এটিকে আরো এগিয়ে নেন। এখন আরো অনেক ড্রেজার সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমরা ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদী খননের কাজটি এগিয়ে নিতে চাই। নদী সুরক্ষায় আমাদের এই কাজে সিটি কর্পোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নদী পাড়ের নাগরিকদের যুক্ত করতে হবে। নদী দখল রোধে সরকারের টাস্কফোর্স কাজ করছে। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করে এখন তুরাগে এই কার্যক্রম চলছে। এই সময়ে আমরা ব্যাপক উচ্ছেদ কার্যক্রম চালিয়েছি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ. কে এম রফিক আহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশ একটি নদী মাতৃক দেশ। আমাদের নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, নগরায়ন, শিল্পায়ন।বিশেষ করে নদী আমাদের জীবন-জীবীকা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতীর পিতা নদী দূষণ রোধে আইন করেছিলেন। এটি মূলত নদীকে দূষণ মুক্ত রাখতেই আইনটি করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে পরিবেশ আইন, ১৯৯৭ সালে বিধিমালা। ক্ষতি যা হওয়া হয়ে গেছে। ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকভাবে পরিবেশ অধিদপ্তর আইনের প্রয়োগ করছে। পরিবেশের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি। সারা বিশ্ব কোভিডের পরে নড়েচড়ে বসেছে, এই সময়ে মানুষের এক্টিভিটি কম ছিল, পরিবেশ নির্মল ছিল। বাতাসের মানও আমরা পরিবিক্ষণ করি। গত বছরের তুলনায় এ বছরের মানও ভালো। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও অন্যান্য নদীর অবস্থাও ভালো। 

পরিবেশ,বন ও জলবায়ূ পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহমুদ হাসান ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব ও এটুআইয়ের যুগ্ম প্রকল্প পরিচালক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর নদীর গুরত্ব, তাত্পর্য ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরত্বারোপ করেন। 

এপেক্সিয়ান নিজামউদ্দিন পিন্টু বলেন, বর্তমানকালে নদ-নদী ও জলাভূমির সমস্যাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এর জন্য সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী সংস্থা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নদী তীরের মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী সমন্বয় ও পার্টনারশিপ প্রয়োজন। 

সভাপতির বক্তব্যে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ মুকিত মজুমদার বাবু সবার বক্তব্যের সারমর্ম উপস্থিত সবার মাঝে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নদী দূষণ ও পরিবেশ দূষণ এবং প্রকৃতি ধ্বংস আমরাই করছি এবং এর দায় আমাদেরই নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন আমরা কাঁদে কাদ মিলিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছি, এবারও তাই করতে হবে। আমাদের সবাইকে সংগঠিত হতে হবে। তবেই আমাদের সমন্বিতভাবে ভালো থাকা হবে। 

সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, আজকের এই দিবসটি শুরু হয় ১৯৮০ সালে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়। কানাডার খ্যাতনামা নদীবিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলো 'নদী দিবস' পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে অনুমোদন দেয়। এরপর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে, যা দিন দিন বিসত্মৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এ দিবস পালিত হচ্ছে। আমরা ১২টি সংগঠন মিলে দিবসটি পালন করছি। আমরা এবারের আলোচনার বিষয় ঠিক করেছি ‘দূষণমুক্ত নদী, সুস্থ জীবন’। বিশ্ব নদী দিবসের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অ্যাঞ্জেলো বিষয়টি জেনে আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন, প্রশংসা করেছেন। তিনি একটি ভিডিও বার্তাও পাঠিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা সমন্বয়ে বিশ্বাস করি। যেকারণে আজকের আয়োজনে নদী সাথের সংশ্লিষ্ট, নদী সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষকে যুক্ত করেছি। নদী সুরক্ষায় আমরা একটি সমন্বিত পদক্ষেপ চাই। পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজি মহোদয় এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, কলকারখানাবহুল জেলাগুলোতে যেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয স্থাপন করা হয়। নদী সুরক্ষায় মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।সেইসাথে নদী পাড়ের মানুষদের সচেতন করতে হবে। তারা সচেতন হলেই নদী নিরাপদ থাকবে।

আর সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের এক্সিকিউটিভ মেম্বার শাহিজয়া শাহিরন আনিকা। মিডিয়া পার্টনার দৈনিক কালের কণ্ঠ ও চ্যানেল আই।

আয়োজক সংস্থাগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা নদী গবেষণাগার, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, রিভার বাংলা, দি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব এপেক্স ক্লাবস বাংলাদেশ, হালদা নদী রক্ষা কমিটি, জিবিএম বেসিন বেইজ্ড পিপলস নেটওয়ার্ক, ব্রহ্মপুত্র সুরড়্গা আন্দোলন, ক্লিন রিভার বাংলাদেশ এবং পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা