kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ফিলিস্তিনিদের বুকে পদাঘাত

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৩৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফিলিস্তিনিদের বুকে পদাঘাত

১৫ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। স্থান আমেরিকার প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস। এদিন দুই আরব রাষ্ট্র—সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পৌরোহিত্যে স্বীকৃতি প্রদানসহ ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করল, যার নাম দেওয়া হয়েছে শান্তিচুক্তি। এই চুক্তিকে শান্তিচুক্তি নাম দেওয়া হলো কেন তার কোনো যৌক্তিকতা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ ইউএই ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের অমীমাংসিত কোনো ইস্যু যেমন কখনো ছিল না, তেমনি তারা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধেও কখনো লিপ্ত হয়নি। বরং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব কর্মকাণ্ড পরস্পরের মধ্যে যেটি এত দিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণমাত্রায় চলছিল সেটিকে শুধু আনুষ্ঠানিক করা হলো, এই যা। এতে কিছুরই কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রকৃত অর্থে এর মাধ্যমে লাভ হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর, যাঁরা নিজ নিজ দেশে এখন কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার সম্মুখীন। আর ইউএই ও বাহরাইনের শাসকগোষ্ঠী নিশ্চিত হলো, ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমকে গদি থেকে উত্খাত করতে গেলে ভারতীয় সেনাবাহিনী যেমন তাঁকে রক্ষা করেছিল, তেমনি সে রকম ঘটলে আমেরিকার সেনাবাহিনী দুই রাজতন্ত্রকে রক্ষা করবে। তবে ফিলিস্তিনি জনগণ, যারা জাতে আরব তাদের ওপর ইসরায়েল ৭২ বছর ধরে যে সীমাহীন অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন চালিয়ে আসছে তার বিরুদ্ধে সমগ্র আরব জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতীকী একটা প্রতিবাদ এত দিন ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে সেটির শবযাত্রা শুরু এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আশার বুকে চরম একটা পদাঘাত হলো। তারপর চুক্তিটি যে সময়, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক আবহে হলো তাতে এটিকে আরব জাতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন আরব বুদ্ধিজীবীরা।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা আরবে নয়, ১৯৪৮ সাল থেকে সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় যত রকম যুদ্ধবিগ্রহসহ জঙ্গি সন্ত্রাসের উত্থান এবং রক্তপাত ঘটেছে তার মূল প্রেক্ষাপট তৈরিতে কাজ করেছে ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃখ, বেদনা ও বঞ্চনার নির্মম করুণ ইতিহাস। তাই সেই সমস্যা সমাধানের কথা যেখানে নেই, যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণের সামান্য মতামতের তোয়াক্কা পর্যন্ত করা হয়নি, সেটিকে শান্তিচুক্তি বলে চালানোর উদ্দেশ্য অন্য যা-ই হোক, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কোনো পরিবেশ যে সৃষ্টি করবে না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়। এরপর ওমান, কুয়েত, সুদান ও সৌদি আরব হয়তো একই পথে হাঁটবে। তাতে ফিলিস্তিন অনেকখানি চাপে পড়বে, এ কথা সত্য। কিন্তু ৭২ বছর ধরে যা ঘটছে, লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে শরণার্থী হিসেবে ভাসমান রেখে এবং আরো প্রায় অর্ধকোটিকে ইসরায়েলের করুণার ওপর রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না, এ কথা সবাই জানেন। তার পরও মঞ্চের দুই প্রধান অভিনেতা নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের জন্য এই নাটকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যার কারণ একটু আগেই উল্লেখ করেছি। নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন ডিমোক্লিসের তরবারির নিচে আছেন, তার সঙ্গে ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সব জরিপই বলছে, ট্রাম্পের কোনো আশা নেই। তাই এটিকে বিরাট সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার প্রচার এখন তুঙ্গে আছে। আমেরিকার রাজনীতি ও নির্বাচনে ইহুদি লবি প্রচণ্ড শক্তিশালী। গত সাড়ে তিন বছর ইহুদি লবিকে খুশি করার জন্য ট্রাম্প ইসরায়েলের পক্ষে যা করা সম্ভব তার সব কিছুই করেছেন। বিশ্বের সব জনমত, এমনকি ইউরোপীয় মিত্রদের পরামর্শকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেছেন। এখন শেষ রক্ষা হিসেবে পরম মিত্র সৌদি রাজতন্ত্রের কৃপায় শান্তিচুক্তির নাটকটি ট্রাম্প সুন্দরভাবে মঞ্চস্থ করেছেন। অন্যদিকে সৌদি রাজতন্ত্রও সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিপাকে আছে। ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের আঙুল উঠেছে যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমানের দিকে। সুতরাং ডেমোক্র্যাটদলীয় প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে আসীন হওয়া সৌদি রাজপরিবারের জন্য শঙ্কার কারণ হতে পারে। আলোচ্য চুক্তি এবং একই পথে আরো দু-একটি আরব রাষ্ট্র গেলেও তাতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি যে আসবে না তার আরো কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরি। পশ্চিম তীর, গাজাসহ ছয় হাজার ২০ বর্গকিলোমিটার জায়গায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কোনো রকমে একপ্রকার স্বায়ত্তশাসন চালাচ্ছে। এই জায়গার মধ্যে আবার প্রায় ২৫ লাখ ইহুদি ইসরায়েলের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় বসবাস করছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের আওতায় আছে প্রায় সাড়ে ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি। নেতানিয়াহু সম্প্রতি হুমকি দিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ পশ্চিম তীর তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করবেন। এই সংযুক্তির হুমকি স্থগিত করেছেন, বাতিল নয়; তাতেই আমিরাত ও বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয় সেদিন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে এটাকে আরব জনগণের বিশাল বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ক্ষমতার জোরে দুনিয়ার তাবত মানুষকে বোকা ঠাওরাচ্ছেন আর কি। আরেকটু বড় হুমকি দিয়ে এবং সেটা আবার স্থগিত করার নামে সৌদি আরবের সঙ্গে একই চুক্তি হয়তো করতে পারবে ইসরায়েল। কিন্তু ১৯৬৭ সালে দখলকৃত পশ্চিম তীরের সব জায়গা ইসরায়েল ছেড়ে না দিলে টেকসই স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো হবে না, স্থায়ী শান্তিও কোনো দিন আসবে না। ফিলিস্তিনের জনগণ নিজেদের বিলুপ্তির পরিকল্পনা মেনে নেবে বলে মনে হয় না। হাজার বছর ধরে বসবাসরত ভূখণ্ড থেকে ফিলিস্তিনিদের ১৯৪৮ সালে শুধু পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক শক্তির দ্বারা উত্খাত এবং সেখানে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭২ বছর ধরে কয়েক লাখ মানুষ, তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জর্দানসহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ভাসমান জীবন যাপন করছে, তাদের কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

দ্বিতীয়ত, ১৯৪৮ সালে সর্বসম্মতিতে গৃহীত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৯৪ নম্বর রেজল্যুশনে বলা হয় মোট ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড সমান দুই ভাগ করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাশাপাশি থাকবে। কিন্তু ইসরায়েল তার কিছুই মান্য করল না। বরং যতটুকু যা বাকি ছিল তাও ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল দখল করে নিল। ফিলিস্তিনের জনগণ সম্পূর্ণ ভাসমান জাতি হয়ে গেল। তারপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে ১৯৪৮ সালের ১৯৪ নম্বর রেজল্যুশনের কথা ছেড়ে দিয়ে নতুন করে বলা হলো, সমান সমান দুই ভাগের প্রয়োজন নেই, ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলকৃত জায়গাগুলো ছেড়ে দিলেই চলবে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ সেটাও মেনে নিল। এ মর্মে ১৯৬৭ সালে রেজল্যুশন নম্বর ২৪২, ১৯৭৮ সালে ৪৪৬ এবং ১৯৮০ সালে ৪৬৫ নম্বর রেজল্যুশন আমেরিকাসহ সবার সম্প্রতিক্রমে গৃহীত হলো। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব রেজল্যুশনের একটিরও কার্যকর হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর জামাতা জার্ড কুশনারের নতুন শান্তি পরিকল্পনায় ওই সব রেজল্যুশনের কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে এবং এখন সামান্য যতটুকু জায়গায় ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসন আছে তার থেকেও ইহুদি সেটলারদের জায়গা বাদ দিয়ে যতটুকু থাকে তা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী গঠিত ফিলিস্তিন হবে সম্পূর্ণ ভঙ্গুর এবং চিরদিন ইসরায়েলের করুণানির্ভর রাষ্ট্র। এ কারণেই ফিলিস্তিনি জনগণ, ইউরোপসহ বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ জার্ড কুশনারের শান্তি পরিকল্পনাকে গ্রহণ করতে পারেনি, বেশির ভাগ মানুষই প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং শান্তির আশা নেই। বরং এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ, এই কথার মূল্য ও অর্থ আর থাকবে না। ওআইসি, আরব লীগ মুখ থুবড়ে পড়বে। আরব ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে। তাতে একদিকে ইরান ও তুরস্ক, আর অন্যদিকে সৌদিবলয়। ভ্রাতৃঘাতী প্রক্সি যুদ্ধ বৃদ্ধি পাবে, যা এখন লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় চলছে। এসব রাষ্ট্র ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেরুদণ্ডহীন আরব রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটবে। সাদ্দাম ও গাদ্দাফির মতো জাতীয়তাবাদী নেতা আর আসবে না। আর কেউ কোনো দিন ইসরায়েলকে ধমক দিতে পারবে না। সুতরাং ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে শুধু ফিলিস্তিন নয়, সমগ্র আরব জাতির জন্য এটি বুকের ওপর পদাঘাতস্বরূপ।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা