kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনা বিভ্রান্তি এবং টিকা নিয়ে কী করা উচিত

শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা বিভ্রান্তি এবং টিকা নিয়ে কী করা উচিত

করোনাভাইরাসের বিস্তার ও প্রতিরোধ নিয়ে আজ মানুষের মধ্যে যত অবিশ্বাস, ভয় ও বিভ্রান্তি কাজ করছে, তাতে জনগণের চেয়ে অপিনিয়ন লিডারদের (মতামত তৈরিতে প্রভাব বিস্তারকারী নেতা) ভূমিকাই বেশি। বিশেষ করে বাস্তবতার সঙ্গে তাঁদের বক্তব্যের কোনো মিল না থাকার কারণেই বিভ্রান্তিগুলো ছড়িয়েছে। এখন করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। আমি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, ১৯৮০ সালে প্রথম এইচআইভি ভাইরাস এবং প্রায় একই সময়ে হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস পৃথিবীতে আসার পর আজ পর্যন্ত এ দুটির কোনো ভ্যাকসিন আমরা পাইনি। এইচআইভি ও এইচসিভি নিয়ে সাফল্য না পাওয়ার মধ্যেই এখন আমাদের করোনাভাইরাস নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে।

টিকা কখন আসবে, কোনটা বেশি কার্যকর হবে, এর সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টন নিয়ে নানা কথাবার্তা চলছে। এ প্রসঙ্গে বলব, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কিছু করতে রাজি নই। এর পরও নিরাপত্তা বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। রাশিয়া প্রথম যে টিকার ঘোষণাটি দিল, তার আগে তারা কোনো গবেষণা পাবলিকেশনে যায়নি। পরে তাদের পাবলিকেশনটি ল্যানসেটে আসে। ল্যানসেটে তাদের পাবলিকেশনে টিকাটির পরীক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ৫৬ জনের ওপর গবেষণা চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বেশ কিছুদিন পর সম্প্রতি জানা গেল, রাশিয়ায় ওই টিকা দেওয়ার পর প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আর এটা জানিয়েছে রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। আমরা এখনো জানি না এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দীর্ঘ মেয়াদে থেকে যাবে, নাকি স্বল্পমেয়াদি হবে।

টিকা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবা দরকার। যদি এমন হতো যে আজ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই ভাইরাসটি থেকে আমরা মুক্তি পাব, তাহলে তড়িঘড়ি করে আমাদের কিছু একটা করা দরকার ছিল। কিন্তু সর্বশেষ যে তথ্যটা আমরা পাচ্ছি এবং যা আমেরিকার সিডিসি ও এফডিএ থেকেও বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে কমপক্ষে ২০২২ সাল পর্যন্ত আমাদের করোনার সঙ্গে বসবাস করতে হবে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে তাড়াহুড়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সবাই জানি, আমেরিকায় প্রথমেই অসম্ভব রকমের তাড়াতাড়ি একটি টিকা উদ্ভাবন হয়ে যাবে মনে করা হয়েছিল। পরে ওই সময়সীমাটি ধরে রাখা যায়নি। আসলে সময়সীমা দিয়ে বিজ্ঞানে কিছু করা যায় না। বিজ্ঞানে এভাবে কিছু উদ্ভাবন করা যায় কিংবা উদ্ভাবন করা উচিত, তা কল্পনা করা ঠিক নয়।

আরেকটা বিষয় বলা দরকার। আমরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রথম ঢেউ, দ্বিতীয় ঢেউ বা তৃতীয় ঢেউ নিয়ে নানা ধরনের কথা বলছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব কথার একটাও এভিডেন্স বেজড (প্রমাণসাপেক্ষ) নয়। প্রকৃতপক্ষে অনেক দেশেই এটি প্রথম ঢেউয়ের পিকে আসেনি। প্রথম ঢেউয়ের পর দ্বিতীয় ঢেউ এবং এরপর তৃতীয় ঢেউ আসে। আমি সহজ একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিই, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার বিমান গ্রাউন্ডেড হয়ে আছে। এখনো মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সেভাবে আসেনি। তাই বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন তৎপরতা যখন আরো বাড়বে, তখন সংক্রমণের ঢেউ পর্যায়ক্রমে আসবে এবং সেটাই হবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ।

এখন টিকা নিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। টিকার বৈশ্বিক রাজনীতি হচ্ছে এবং এর নিরাপত্তা নিয়ে যেসব কথা হচ্ছে আমি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একমত। টিকার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকারিতার জায়গায় হয়তো কিছু উনিশ-বিশ হতে পারে।

একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে আমরা একটি টিকা তৈরি করতে পারি কি না। একটি টিকা তৈরির জন্য ন্যূনতম আবশ্যকতা কী কী হতে পারে। শুধু একটা ল্যাব থাকলেই চলে না। তাতে একজন এপিডিমিওলজিস্ট, একজন বায়োকেমিস্ট, একজন প্রোটিন কেমিস্ট থাকতে হবে। তারপর ফেজ ওয়ান ও ফেজ টু-থ্রি ট্রায়াল করার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত একটি টিকা, বিশেষ করে করোনার মতো একটা টিকা তৈরি এখনই সম্ভব নয়। যেখানে এটি একটা সিঙ্গল অ্যান্টিজেনের বিষয় নয়, সেখানে একটি গ্রুপ অব অ্যান্টিজেন থেকে বা মেসেঞ্জার আরএনএ থেকে বা অন্যান্য জিনিসের সুবিধা গ্রহণ করা কিংবা সেই রকম একটা কিছু করার মতো পর্যায়ে আমরা আসিনি। তবে দ্রুত সময়ে আমাদের এই প্রক্রিয়াটি চালানো উচিত।

অল্প সময়ের মধ্যেই এটা করা সম্ভব যদি আমরা ন্যাশনাল প্রজেক্ট হিসেবে এটাকে গ্রহণ করি। তবে বর্তমানে নেই।

আমি আবারও করোনাভাইরাস ও এর টিকা নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়ে ফেরত আসি। আজকের এই বিভ্রান্তি সাধারণ মানুষ তৈরি করেনি, রাজনৈতিক দলগুলো এগুলো তৈরি করেছে বিভিন্ন দেশে এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছে আমেরিকা। যেখানে অ্যান্থনি ফসি কথা বলছেন, সিডিসির (আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল) পরিচালক কথা বলছেন, এফডিএ থেকে বলা হচ্ছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একরকম কথা বলছেন, বিরোধী দল একরকম কথা বলছে, হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ আরেক রকম কথা বলছে। নানা মহল থেকে নানা রকম কথা হচ্ছে। আমরা আসলে এখন এমনই এক পৃথিবীতে বাস করছি।

সব শেষ কথা হলো, আমরা যে দেশ থেকেই টিকা আনি না কেন, যে টিকা আমাদের ‘সেন্স অব সিকিউরিটি’ দিতে পারবে, আমরা সেটাই গ্রহণ করব।

লেখক : জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা