kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সেলাই করা খোলা মুখ

খিচুড়ি ও রুই-কাতলাদের গল্প

মোফাজ্জল করিম

অনলাইন ডেস্ক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৩৩ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



খিচুড়ি ও রুই-কাতলাদের গল্প

অবিশ্বস্ত সূত্রের গুজবে প্রকাশ, বাংলাদেশের বৌ-ঝিরা, এবং তাঁদের দেখাদেখি বুয়ারা, নাকি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয়ের ব্যাপারে লিখিতভাবে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে তাঁরা একটি সংবাদ সম্মেলন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনেরও নাকি চিন্তা-ভাবনা করছেন। বিষয়টি কী? বিষয়টি আর কিছু না, ওই যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুপুরে খিচুড়ি খাওয়ানো এবং খিচুড়ি কী করে রাঁধতে হয় তা শেখার জন্য শ’পাঁচেক কর্মকর্তার বিদেশ সফরের প্রস্তাবসংবলিত ওই মন্ত্রণালয়ের বহুল আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রস্তাব। কিন্তু বৌ-ঝি ও বুয়াদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সাংবাদিকদের বলেছেন, খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য বিদেশ সফরের কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে কী করে খাওয়ার ব্যাপারটা ‘ম্যানেজ’ করা হয় তাই দেখতে বিদেশ যাবেন কর্মকর্তারা। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী তাঁর সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করেছেন, সাংবাদিকতা পেশায় ইদানীং কিছু কিছু বিএনপি-জামায়াতের লোক ঢুকে পড়েছে, যারা এ-ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। হয়তো তিনি ভাবছেন, সাম্প্রতিককালে তাঁর দলে যেমন দলের নেতাকর্মীদের ‘সরলতার সুযোগ নিয়ে’, তাঁদের মতে, বিএনপি-জামায়াত নামক দুষ্ট ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তেমনি সাংবাদিকতার মতো পবিত্র পেশাতেও বিএনপি-জামায়াতের গেরিলারা ঢুকতে শুরু করেছে। ...সত্যি, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী নিঃসন্দেহে একজন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ বিজ্ঞ দলঅন্তপ্রাণ চিন্তক, যিনি শুধু নিজ দলেই নয়, আর কোথায় কোথায় কোন কোন অঙ্গনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখছেন। সাধু, সাধু! এতে কেউ তাঁকে জন্ডিসাক্রান্ত বললেও তাঁর বয়েই গেল।

খিচুড়ির ব্যাপারে অবলা নারীদের হঠাৎ অবোলা থেকে সবোলা হওয়া বা সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ আর কিছু নয়। তাঁদের কথা, দেশের জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে যাঁরা খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে কর্মকর্তাদের পাঠাতে চান, তাঁরা কি কোনোদিন তাঁদের মায়েদের, বৌয়েদের বা বুয়াদের হাতের খিচুড়ি খাননি? নাকি সেই খিচুড়ি এতই অখাদ্য যে তার মানোন্নয়নের জন্য, তথা নিজেদের ‘মুখ বদলানোর’ জন্য বিদেশে গিয়ে খিচুড়ি রান্না শিখে এসে এ দেশের রাঁধুনিদের শেখাতে হবে? বাংলাদেশের নারীকুল সঙ্গত কারণেই মনে করেন এতে তাঁদের দারুণ ‘অপমান নষ্ট’ হয়েছে। গুজবে প্রকাশ, তাঁদের ভাষায়, এই অবমাননাকর, জাতীয় ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী, পর্বতপ্রমাণ অপচয় রোধ করতে তাঁরা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবেন। আবার অনেকে বলেছেন, ওই ম্যানেজ করা বা ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা লাভ করতে এ দেশের হল-হোস্টেল-এতিমখানা-লিল্লাহ বোর্ডিং দেখতে গেলেই তো হয়।

২.
তা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খিচুড়ি খাওয়ানো নিয়ে মন্ত্রণালয় বা মিডিয়া বিষয়টিতে যতই জগাখিচুড়ি পাকাক না কেন, প্রাথমিক শিক্ষা নামক অনাথ শিশুটি যে আমাদের অনাদর-অবহেলায় চিরঅপুষ্ট, চিররুগ্ন রয়ে গেছে তা বোধ হয় কেউ অস্বীকার করবেন না। ছাত্রছাত্রীদের খিচুড়ি বা অন্য কোনো টিফিন খাওয়ালে নিশ্চয়ই তাদের স্বাস্থ্য ভালো হবে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার স্বাস্থ্য ভালো হবে বলে মনে হয় না।

আমাদের খাদ্যাভাবের দেশ দেখতে দেখতে আমাদের চোখের সামনেই মাশাল্লাহ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে বা হতে যাচ্ছে, আমাদের গ্রামের কাদামাটির সব রাস্তা দ্রুতই একদিন পাকা হয়ে যাবে, বাপ-দাদার আমলের ছন-বাঁশের ঘরগুলো গা ঝাড়া দিয়ে জাতে উঠেছে,—এখন তারা হয় পাকা দালান, আর না হয় অন্তত তাদের মাথার ওপর কিস্তি টুপির মতো টিনের চাল,—বাঁশের সাঁকো হয়েছে ঝকঝকে পাকা ব্রিজ, যে আঙ্গুর-আপেল শুধু ছিল মৃত্যুপথযাত্রীর স্বপ্নের ফল, এখন তা বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে বেশুমার পাওয়া যায়। আরো কত কী। উন্নয়নের কি আর শেষ আছে। আমাদের নিজেদের টাকায় আমরা পদ্মা নদীর ওপর সেতু বানাচ্ছি। আমরা আগে বাঁচতাম গড়ে ৪০-৪২ বছর। এখন বাঁচি ৭০-৭২ বছর। কম কথা! আমাদের এখন আর অশিক্ষিত বলা যাবে না। সেই ৫০ বছর আগের শতকরা ২৫ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে সাক্ষরতার হার বেড়ে এখন হয়েছে ৭৩। আর চতুর্দিকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়েছে কত। কী তাদের শান-শওকত। দালানকোঠা-কম্পিউটার-ল্যাপটপ ইত্যাদি দেখলে তাক লেগে যায়।

অথচ এর বিপরীতে দুয়োরানি প্রাথমিক শিক্ষার দৈন্যদশা দেখে সত্যি মায়া হয়। হ্যাঁ, আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগের বাঁশের বেড়া-ছনের/টিনের চালের পাঠশালা ঘর হয়তো আর নেই। মানলাম। এখন প্রায় সবখানেই পাকা ঘর হয়েছে, যদিও এর অনেকগুলোই সংস্কারের অভাবে জীর্ণদশাগ্রস্ত। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও আর আগের কালের ‘আন্ডারম্যাট্রিক পাশ’ নন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আগের ৩০-৪০ জনের জায়গায় ৩০০-৪০০ হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যেকটি স্কুলে আগের ১০-১২টি লজ্জাবতী লতার মতো নতমুখী গ্রাম্যবালার জায়গায় অর্ধেকেরও বেশি হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়েশিশুর উপস্থিতি দেখে মনে হয় বাংলাদেশের গ্রাম সত্যি জেগে উঠেছে।

কিন্তু তার পরও কথা থেকে যায়। শিক্ষার হার বেড়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে যুগান্তকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা আগের তুলনায় অনেক অনেক বেশি স্কুলমুখী হয়েছে। তাদের অভিভাবকরা আগের তুলনায় অনেক সচেতন, দায়িত্বশীল। শিক্ষার্থীরা বইপত্র ফ্রি পায়, উপবৃত্তি পায়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতনও খুব একটা খারাপ না। খারাপ কী তা হলে? যদি বলি, শিক্ষার মান কি স্কুলের দালান, শিক্ষকের বেতন, খিচুড়ি-প্রকল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে? প্রাথমিক পর্যায়ের শতকরা ৮০ জন শিক্ষার্থী গ্রামীণ বিদ্যালয়ে পড়ে। তারা কি তাদের সহপড়ুয়া শহরের ছেলেমেয়েদের মতো মেধায়-মননে সমান? তাদের সব শিক্ষক-শিক্ষিকার যোগ্যতা-দক্ষতা কি কাঙ্ক্ষিত মানের? (শিক্ষা-ব্যবস্থার রূঢ় বাস্তবতার দিকটি তুলে ধরতে প্রশ্নটি উত্থাপন করলাম, কাউকে কটাক্ষ করতে নয়। বিশেষ করে আমি যে সম্প্রদায়কে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি, তাঁদের সম্বন্ধে কোনো বিরূপ মন্তব্য করার প্রশ্নই আসে না। প্রসঙ্গত, উনিশ শ ষাটের দশকে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগদানের পূর্বে আমার নিজের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল কলেজ শিক্ষক হিসেবে। শিক্ষার ব্যাপারে অবহেলা-অনাচার দেখলে তাই এখনো মন পোড়ায়। আফটার অল, ফার্স্ট লাভ বলে কথা!)

৩.
তা এই খিচুড়ি-মিচুড়িসংক্রান্ত সংবাদাদি পত্রপত্রিকায় দেখে ভেবেছিলাম আজকের লেখাটি লিখব আমার প্রিয় প্রসঙ্গ ‘প্রাথমিক শিক্ষা’ নিয়ে। কিন্তু তা আর হলো কই। হঠাৎ করে খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় পারলে পুরো আট কলামই ছেড়ে দিতে হয় এমন এক ভি ভি আই পি এসে আমার কলমের গতি দিলেন রুদ্ধ করে। সুফী দরবেশের মতো আবক্ষ সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত তাঁর নূরানি চেহারা পত্রিকায় দেখে শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে যে কারো মন ভরে যাবে। কদিন ধরে সংবাদপত্রের পাতায় এই সংসারবিবাগী সন্তপুরুষই হিরো। অথচ জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন একেবারে জিরো—একজন সাধারণ গাড়িচালক। এখন তিনি আর গাড়ি চালান না, চালান একটি অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে আমলা-কামলা সবাইকে। তাঁর কথায় নাকি বড় সাহেব, মেজো সাহেব থেকে শুরু করে পিয়ন-চাপরাশি-ড্রাইভার সবাই ওঠ্-বস করেন। তবে অফিসের খাতায় এখনো তাঁর পদবি ড্রাইভার। ড্রাইভার আব্দুল মালেক। বাপ-মার দেওয়া ডাকনাম বাদল। এলাকার লোকে ডাকে বাদল হাজি। শোনা যায়, অফিস পাড়ায় এখন আর কেউ তাঁকে মালেক ডাকে না, বা ডাকার সাহস রাখে না, এমনকি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও না। তিনি এখন মালেক সাহেব। বসের যে গাড়িটি তাঁর চালানোর কথা সেটি চালান তাঁরই নিয়োগ দেওয়া আরেক ব্যক্তি। হ্যাঁ, তাঁরই নিয়োগ দেওয়া। মালেক সাহেব এখন মহাব্যস্ত একজন মানুষ। তাঁকে সমস্ত স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পেনশন ইত্যাদি দেখতে হয়। গাড়ির স্টিয়ারিং ধরার সময় কোথায় তাঁর। এ জন্য নিজেই একজন বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে দিয়ে তিনি ‘কোচের’ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। শুধু কোচ নন, তিনি ফেডারেশনের সভাপতি, প্রধান নির্বাচক, তহবিল সংগ্রাহক, কোষাধ্যক্ষ। কী নন? সবই তিনি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত স্বাস্থ্য সাম্রাজ্যের সবার মুশকিল আসান তাঁর হাতে। তিনি আপামর ডাক্তার-কর্মচারীর ঘরের ডাক্তার, বিপদের বন্ধু। আর একটা সরকার যেমন চলে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় (সম্পাদক মহোদয়, দেখবেন ভুলে যেন আবার যন্ত্রণালয় ছাপা না হয়ে যায়!) ও দপ্তরের মাধ্যমে, মালেক সাহেব তেমনি তাঁর সাম্রাজ্য চালান বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

এখানে জনান্তিকে একটা কথা বলে রাখি। দুষ্ট লোকে বলে, এ ধরনের সিন্ডিকেট নাকি সব মন্ত্রণালয়-দপ্তর-অধিদপ্তর-কর্পোরেশনে সক্রিয় আছে এবং তাতে নাকি অনেক কর্তাব্যক্তি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো মৌন সম্মতি লক্ষণ নীতি অনুসরণ করে চলেন। এমনকি কেউ কেউ নাকি সাইলেন্ট পার্টনার। অনেকে অনারারি অ্যাডভাইসার। (তবে ‘অনাহারী’ নন!)

আর আমরা যে বিভাগটি নিয়ে আজ আলোচনা করছি সেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রতি খোদা হাফেয জানানো মহাপরিচালক মহোদয় নাকি তাঁর দপ্তর ভবনের বাইরে সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লিখে রেখেছেন : ‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’। তা প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ রকম স্বলিখিত সার্টিফিকেট দেওয়ার দরকার পড়ল কেন? এটা কি ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’ ‘আমি কলা খাই না’ মার্কা কিছু। নাকি উঠতে-বসতে সারাক্ষণ ‘এই অফিসের সবাই, এমনকি চেয়ার-টেবিল, ইট-পাথরও দুর্নীতিবাজ’ কথাটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়াতে মহাপরিচালক চিকিৎসক মহোদয় ‘ক্লিন বিল অব হেলথ’-এর মতো নিজের সার্টিফিকেট নিজেই দিয়ে রেখেছেন? আর ওই সাইনবোর্ড দেখে বুয়া টাইপের কেউ যদি বলে, ‘এ্যাঁ, ঢং দেখে আর বাঁচি না! বলিহারি মিনসের হায়-শরম!’ তখন? আসলে কোনটা আমগাছ আর কোনটা তেঁতুলগাছ তা সাইনবোর্ড লিখে চেনাতে হয় না। সেই পুরানো কথা : ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী?’ ‘ফলেন পরিচয়তে’।

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখের কালের কণ্ঠতে প্রথম পৃষ্ঠায় স্বাস্থ্যের ১২ জনসহ আরো ২০ জন কর্মচারীর নাম-পদবি ও তাঁদের স্ত্রীর নাম ছাপা হয়েছে। দুদক নাকি এঁদের সয়-সম্পত্তির ঠায়-ঠিকানা খুঁজে দেখছে। হয়তো এঁদের মধ্যেও মালেকের মতো, থুকিক, মালেক সাহেবের মতো, আরো দুই-চারজন ‘সুয়া হুয়া রুস্তম’ (ঘুমন্ত রুস্তম) থেকে থাকতে পারে। ফলাফল কী হবে জানি না। তবে আপাতত একটা ঘটনা যে ঘটবে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। খবরটা বেরোবার পরদিনই স্কুলে-কলেজে তাঁদের সন্তানদের সহপাঠীরা নির্ঘাত একটা প্রশ্ন করবে : ‘কী রে বল্টু, তোর বাবাকে নাকি পুলিশে খুঁজছে? তাই তো বলি, এই দামি মোবাইল, আর এই চকমকে মোটর বাইক কোত্থেকে আসে!’ আর এই অকস্মাৎ ভি আই পি বনে যাওয়া কোনো হুজুরের ছেলে বা মেয়ের ভালো একটা বিয়ের সম্বন্ধও যদি এই কারণে ভণ্ডুল হয়ে যায় তবে বিস্মিত হবো না।

৪.
শেষ করার আগে একটা কথা জোর দিয়ে বলতে চাই। মালেক (সরি, আর সাহেব বলতে মন চাইছে না) বা মালেকদের অঙ্কুরোদ্গম, তারপর চারাগাছ হয়ে বেড়ে ওঠা, তারপর একদিন বিরাট বিটপী হয়ে অভ্রংলিহ উচ্চতায় এই সমাজে দাবড়িয়ে বেড়ানো এমনি এমনি হয় না। সেই অঙ্কুরোদ্গমকাল থেকে এদের জল-হাওয়া দিয়ে, ছাগলের মুখ থেকে রক্ষা করে, প্রটেকশন বেড়া দিয়ে বড় করতে হয়। নেপথ্যে থেকে সেই কাজটি নীরবে-নিভৃতে যারা করে, তারা কি চিরকালই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে? মালেকরা মাফিয়া হলে তাদের গডফাদার কারা? গডফাদারদের টিকিটিও আজ পর্যন্ত স্পর্শ করা গেল না কেন?...প্রশ্ন আছে, জবাব নেই। জবাব না দিয়ে শুধু তর্জন-গর্জন করলে সংস্কৃত ভাষার সেই প্রাচীন শ্লোকটিই শোনাব : অজাযুদ্ধে, ঋষিশ্রাদ্ধে, প্রভাতে মেঘডম্বরু, দাম্পত্যকলহচৈব/বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। (ছাগলের যুদ্ধে, ঋষিদের শ্রাদ্ধক্রিয়ায়, প্রাতঃকালে মেঘের গর্জনে, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায়, শুরুটা যেমন ঢাকঢোল বাজিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে হয়, আসল কাজের কাজ তেমন হয় না)।

এ দেশের মানুষ কথার ফুলঝুরি, আতশবাজি অনেক দেখেছে, চুনোপুঁটি খেতে খেতে তাদের পেটে চড়া পড়ার জোগাড়, তারা এখন কিছু রুই-কাতলার স্বাদ পেতে চায়। সেই রুই-কাতলা যদি কারো পেয়ারা বান্দাও হয়, অথবা কোনো কারণে নিজেকে কর্তৃপক্ষের কাছে, বা কোনো দলের কাছে অপরিহার্য (‘ইনডিসেপন্সেবল’) করে তুলে থাকে, তবু ছাড় দেবেন না। অন্যথায় আখেরে পস্তাবেন।

আমার শিক্ষাদীক্ষার দৌড় তো প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বাল্যশিক্ষা পর্যন্ত। ওই সময়ে স্কুলে যা শিখেছিলাম, এবং আব্বা-আম্মা যা শিখিয়েছিলেন, ওগুলোই মগজের ভেতর তাবিজ করে রেখেছি। সেই শিশুপাঠ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করি : আমাদের দেশে কবে সেই ছেলে হবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।...

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা