kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

২০০তম জন্মদিন

বিদ্যাসাগর আজও প্রেরণা

আবুল কাসেম ফজলুল হক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:১০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিদ্যাসাগর আজও প্রেরণা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী আজ। অনেক প্রতিষ্ঠান দিবসটি উদ্যাপন করছে। লেখকরাও তাঁর সম্পর্কে লিখছেন। যাঁরা মনীষী, তাঁদের স্মরণ করা অত্যন্ত ভালো কাজ। অতীতের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের কীর্তি স্মরণ করলে নিজেদের মধ্যে উন্নত চিন্তার উদয় হয়। এদিক দিয়ে বিদ্যাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যু ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে। ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে তাঁর জীবন ও কর্ম চলেছে। কলকাতা শহর ছিল গড়ে ওঠা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও নিজে বিকশিত হয়েছেন, চারপাশের সমাজকে সমৃদ্ধ করার কাজ করেছেন। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে পড়েছেন। কলেজের সব পরীক্ষায় তাঁর ফলাফল অত্যন্ত ভালো ছিল। যাঁরা অসাধারণ রেজাল্ট করেন, সংস্কৃত কলেজের সর্বশেষ পরীক্ষায় তাঁদেরই বিদ্যাসাগর উপাধি দেওয়া হয়।

ঈশ্বরচন্দ্রও সে রকম বিদ্যাসাগর উপাধি পেয়েছিলেন। অন্য যাঁরা বিদ্যাসাগর উপাধি পেয়েছিলেন, তাঁরা কেউ বিদ্যাসাগর বলে পরিচিত হননি। একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্রই পরিচিত হন বিদ্যাসাগর উপাধিতে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যে পাণ্ডিত্য, মানসিক স্থিতি, তাঁর যে বিদ্যা-জ্ঞান—সবই অতুলনীয়। বিদ্যাসাগর ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের শিক্ষক ছিলেন কিছুদিন। এরপর সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক ছিলেন, অধ্যক্ষও হয়েছিলেন। তিনি স্কুল ইন্সপেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। ছাপাখানা করেছিলেন, বই ছাপতেন। বই লিখে, প্রকাশ ও বিক্রি করে আয়ও করেছিলেন।

বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্য ভাষা সুশৃঙ্খলভাবে লিখেছেন। তাঁর আগে রামমোহন রায়, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা বাংলা লিখেছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর যেভাবে লিখেছেন, তা খুব সুন্দর। বাক্যে ক্রিয়া, কর্ম, কর্তা কোথায় কিভাবে বসবে তিনি যেভাবে লিখেছেন, সবাই তা অনুসরণ করেছেন। বাংলা বানানে যে বিশৃঙ্খলা, তাতেও তিনি কিছুটা শৃঙ্খলা ফেরান। বাংলা বর্ণমালা, স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ এগুলোর অবস্থানেও বিশৃঙ্খলা ছিল। বিদ্যাসাগর এগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনেন। দাঁড়ি-কমার ব্যবহার ছিল না। ইংরেজির অনুসরণে দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলন, প্রশ্নবোধক চিহ্ন, ড্যাশ, হাইফেন এগুলো বিদ্যাসাগর ব্যবহার করেন। এসবের মধ্য দিয়ে বাংলা গদ্য ভাষাকে একটি সুশৃঙ্খল রূপ দেন তিনি। তাঁর গদ্য ভাষা পড়তে গেলে দেখা যায়, কেমন যেন একটা ছন্দ আছে। শিল্পিত বাংলা গদ্য। এ কারণেই বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। আমরা বলব বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের অন্যতম স্রষ্টা।

শুধু ভাষাচর্চা নয়, সে কালের হিন্দু সমাজে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার, আচার-আচরণে অনেক কিছুই ছিল অনুচিত ও ভুল। এগুলোর প্রতিকারে তাঁর মন ছিল সমাজসংস্কারকের মন। ফলে সমাজসংস্কারমূলক কাজেও তিনি সারা জীবন নিয়োজিত ছিলেন।

তাঁর সমাজসংস্কারমূলক কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাল্যবিবাহ বন্ধ। সে কালে ছয়-সাত বছর বয়সে ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হতো। বিদ্যাসাগর এটি বন্ধে প্রচার শুরু করেন। বহুবিবাহ; অর্থাত্ পুরুষরা একাধিক মেয়েকে বিয়ে করতেন। এই বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও লিখেছেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ছিল বিধবা বিবাহ প্রচলন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লক্ষ করেন, স্বামী মারা গেলে সতীদাহের নামে মেয়েদের স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারা হয়। বিদ্যাসাগরের সময় সেটি বন্ধ হয়েছিল। রামমোহন রায়ের চেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার আইন করে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছিল। কিন্তু বিধবারা বেঁচে গেলেও তাদের জীবনযাত্রা কঠোর নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। সাদা কাপড় পরে থাকবে, রঙিন কাপড় পরবে না। খাবারে বিধি-নিষেধ—পেঁয়াজ, রসুন খাবে না। জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। বিদ্যাসাগর বিধবা নারীদের এই কষ্টকর জীবন লক্ষ করেছিলেন। তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য আন্দোলন করেছেন। নিজে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর ছেলেকেও বিধবার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিধবা বিবাহের প্রচলনটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। এর বিরুদ্ধে সমাজে প্রতিক্রিয়াও ছিল। বিদ্যাসাগর তার পরও বিধবা বিবাহ প্রচলনে কাজ করেছেন। বিদ্যাসাগর নিজে বলেছেন, বিধবা বিবাহ প্রচলন আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এসব কাজের জন্য বিদ্যাসাগর স্মরণীয়।

বিদ্যাসাগর অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মেয়েদের জন্যও অনেক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সবার পড়ার জন্য আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে দেখলেন ভালো পাঠ্যপুস্তক নেই। তিনি পাঠ্যপুস্তক রচনার ব্যবস্থা করলেন। এই পাঠ্যপুস্তক রচনার মধ্যেও তাঁর মনটা সমাজসংস্কারকের মন। শিশুরা যদি উন্নত চিন্তা-চেতনা নিয়ে অগ্রসর হয়, তাহলেই সামাজ ভালো হবে। এ জন্য তিনি শিক্ষায় পরম গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিদ্যাসাগর গরিব ঘরের সন্তান ছিলেন। কিন্তু কর্মজীবনে বিপুল অর্থ আয় করেছিলেন। ওই অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন সমাজসংস্কারের কাজে। এই যে বিষয়গুলো আমরা পাচ্ছি—তিনি বাংলা গদ্যের নির্মাতা, বিধবা বিবাহ প্রচলন থেকে নারীর অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, অনেক স্কুল-কলেজ স্থাপন; এসব কিছুর জন্যই বিদ্যাসাগরকে সবাই সমাজসংস্কারক হিসেবে স্মরণ করেন। আজকের দিকে এগুলো মনে হবে সামান্য কাজ। কিন্তু সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে এগুলো সামান্য কাজ ছিল না, অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল।

বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি দীন-দুঃখী মানুষকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। মানুষের দুঃখ দেখলে তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ত, তাদের সাহায্যের চেষ্টা করতেন।

বিদ্যাসাগর প্রখর আত্মমর্যাদা বোধ, নীতিবোধসম্পন্ন, যুক্তিপরায়ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁর অনেক ঘটনা জনশ্রুতি হয়ে আছে। তাঁর মাতৃভক্তি, পিতৃভক্তিও জনশ্রুতি হয়ে আছে। এগুলো তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর অজেয় পুরুষের পরিচয় দেয়। দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দেয়।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজে বিদ্যাসাগর ছিলেন নিঃসঙ্গ। তিনি যে চিন্তাভাবনা করতেন সে রকম লোক পাননি। উল্টো তিনি বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরের নিঃসঙ্গ জীবন, অসুখী জীবন নিয়ে লিখেছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা, পৃথিবীজুড়েই দেখা যাচ্ছে মানুষের খাওয়া-পরা, চলা অনেক বেড়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই দারিদ্র্য এখন আর নেই। ভাত-কাপড়ের অভাব মানুষ কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু মনের দিক দিয়ে মানুষ মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এ রকম একটা বাস্তবতা। মানবিক গুণাবলির দিক দিয়ে মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যাসাগরের জীবন, তাঁর কাজ যাঁরা দেখবেন তাঁদের মধ্যে অবশ্যই মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হবে।

লেখক : সমাজ বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অনুলিখন : আজিজুল পারভেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা