kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঘুষের শক্তি দুর্নীতির মুক্তি

মোস্তফা মামুন

অনলাইন ডেস্ক   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৫২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঘুষের শক্তি দুর্নীতির মুক্তি

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ঘটনা। এক ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শুনে ভরা আদালতে হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই অপরাধে যদি আমাকে গ্রেপ্তার করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক পাঁচ কোটি পুরুষকেই কারাগারে আটকে রাখতে হবে।’

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, একটা কাজ পেতে তিনি সরকারি সংস্থাকে ঘুষ দিয়েছিলেন। আর এখানে কোনো দ্বিমত নেই যে এই অপরাধ বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক বেশির ভাগ পুরুষই করেছেন। অপ্রাপ্তবয়স্করাও করে। এবং খুব সম্ভব অপ্রাপ্ত বয়সে অল্পস্বল্প ঘুষ দেওয়ার যে বৃত্তে আমরা ঢুকে পড়ি সেখান থেকে এই জীবনে আর বেরোনো হয় না। দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নের এই জগতে ঘুষ দেওয়ার ভিত্তিতে আমরা মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। যারা কাজটা খুব ভালো পারে তারা অনেক ওপরে ওঠে। যারা মোটামুটি পারে ওরা টিকে থাকে। যারা একদমই পারে না তারা তলিয়ে যায়।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর বোর্ডে সার্টিফিকেট ওঠাতে গেছি। কাগজপত্র যাঁর কাছে জমা দিতে হয় তাঁকে কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর একটা চেয়ার আছে। সেই চেয়ার বেশির ভাগ সময় খালি। কাউকে জিজ্ঞেস করেও সুবিধা হচ্ছে না। প্রত্যেকেই অত্যন্ত বিরক্ত। পরে বুঝলাম, তাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে খোঁজার ব্যাপারটা তাদের গায়ে লাগছে। একজন পান চিবাতে চিবাতে বললেন, ‘ওরে লাগবে কেন? আমরা কি কিছু করতে পারি না?’

‘আমার কাগজপত্র ওনার কাছে জমা দিতে হবে। ওখানেই সার্টিফিকেট বলে শুনেছি।’

রাগার মতো উত্তর নয়, তবু রেগে গেলেন। দেখলাম, প্রায় সবাই রেগে আছে। যার কাছে যাই সে-ই রাগ দেখায়। শেষে বিকেলবেলা পরম করুণাময় মুখ তুলে তাকালেন। শূন্য চেয়ারটি ভরে উঠল। মানুষটির অপেক্ষায় দুপুর থেকে ভিড় করে ছিল অনেক ছাত্র। কাজেই সামনে পর্যন্ত যেতে বিস্তর হ্যাপা গেল। তিনি কাগজপত্র ঠিকমতো না দেখেই বললেন, ‘কাগজ তো ঠিক নেই। কালকে আসেন। কালকে।’

‘দেখেন না প্লিজ। ঠিক আছে তো মনে হয়।’

‘আমার চেয়ে বেশি বোঝেন! আইএ পাস করেই এই অবস্থা।’

‘মার্কশিট, ছবি সবই তো আছে। আর কী লাগবে?’

‘কালকে... কালকে’ ভদ্রলোক আর কথা বলতে চান না।

পেছনে আরো অনেকে অপেক্ষমাণ। ওদের ধাক্কায় সরে আসতে হলো। বাইরে বেরিয়ে এই অকূলপাথার থেকে কিভাবে উদ্ধার পাওয়া যায় ভাবছি, তখনই সমব্যথী একজন পাশে এসে দাঁড়াল। ভরসা দেওয়ার মতো করে বলে, ‘ভাইয়ের কি জরুরি দরকার?’

‘জরুরি। আজকেই ঢাকা ফিরে যেতে চাচ্ছিলাম।’

সে হাতের ঘড়ি দেখে বলে, ‘আজ তো আর সম্ভব না। তবে যদি চান কালকে ফার্স্ট আওয়ারে হতে পারে।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ।’ বলে কাগজপত্র দেখেটেখে বলল, ‘১২টার দিকে আসবেন।’

‘হয়ে যাবে?’ আমি বিস্মিত। চেয়ারে বসা মানুষটির হেলাফেলা দেখে মনে হচ্ছিল সার্টিফিকেট পেতে আরেকবার ইন্টারমিডিয়েট দিতে হবে।

‘বোঝেনই তো কিছু খরচাপাতি লাগবে। প্রস্তুতি নিয়া আইসেন।’

বিশ্বাস করিনি। কিন্তু ম্যাজিকের মতো কাজ। পরদিন ১২টার কিছু পর গিয়ে দেখি, সাময়িক সনদপত্র তৈরি।

চুক্তি করা টাকা দিলাম। এরপর কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বুঝলাম, চেয়ারে বসে থাকা মানুষের বিরক্তি আর এর উদারতা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। উনি দেরির ভয় দেখাবেন। এ ভীত মানুষদের পাশে দাঁড়াবে। তারপর টাকার অঙ্কটা দুজনে ভাগাভাগি হবে।

তখন বয়স কম। উত্তেজনা বেশি। মনে হলো, এ রকম অনিয়ম চলতে দেওয়া যেতে পারে না।

কুমিল্লায় পড়াশোনা করার কারণে এক প্রভাবশালী ছাত্রনেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। যোগাযোগ করলাম। শুনে বললেন, ‘কত নিয়েছে?’

অঙ্কটা জানার পর প্রতিক্রিয়া, ‘খুব বেশি না। ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করছি। তোমার টাকা ফেরত পেয়ে যাবে।’

‘টাকা তো চাইছি না। চাইছি এর একটা বিহিত হোক। এ রকম গলাকাটা! কর্তৃপক্ষকে জানানো দরকার।’

ছাত্রনেতাটি হাসলেন। ‘তোমার কি ধারণা বোর্ড অফিসের সামনে দু-চারজন দালাল একা একাই এসব কাজ করে ফেলছে। এর সঙ্গে সবাই আছে। যার কাছে তুমি অভিযোগ করতে যাবে, তিনি পর্যন্ত সব জানেন।’

‘সবাই জড়িত?’

‘সবাই না। তবে বেশির ভাগ। আর যাঁরা জড়িত নন তাঁরাও জড়িতদের ভয়ে চুপ করে থাকেন।’

সেই ২০-২৫ বছর আগে সরকারি অফিস আর দপ্তরের যে ঘিনঘিনে ছবিটা বেরিয়েছিল পরের সময়ে এর দুর্গন্ধ বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিক নিয়মে কাজ হবে না। দালালরা থাকবে। এরা টাকা নেবে। লুটের ভাগ সবাই পাবে। এই হলো বাংলাদেশ।

আর তাই আজকাল যখন মালেক, করিম-রহিমরা ধরা পড়ে তখন ঠিক দুঃখ হয় না। হাসি পায়। এরা তো আসলে ভাসতে থাকা কচুরিপানা। ঠেলে সরালে ভেতরে যাদের দেখা যাবে সেটা সহ্য করতে পারব না বলেই বোধ হয় কেউ বের করে না। নতুন আইন হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্যায় করলেও গ্রেপ্তার করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। অথচ আইনটা হওয়া উচিত, নিচু পদের কেউ অপরাধ করলে ওপরের যে বা যাঁরা আছেন তাঁদেরও সরাসরি আইনের আওতায় আনা হবে। ড্রাইভার শতকোটি টাকা কামিয়েছেন। এর ওপরের ডেস্ক অফিসার কী করছিলেন! এর ওপরের কর্মকর্তা! এর ওপরের পরিচালক। মহাপরিচালক? ধরা যাক, তাঁরা সেই সংখ্যালঘুদের দলে, নিজেরা জড়িত নন কিন্তু তাহলেও প্রত্যেকে শাস্তিযোগ্য। এটাও তো তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যে অধীনরা ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে জড়াচ্ছে কি না সেটা দেখা। অবশ্য বেশির ভাগ তো জানেনই না শুধু, পদানুযায়ী ভাগও পান। সেই ছাত্রনেতার টিটকিরিমাখা হাসিটা মনে আসে, ‘সবাই জড়িত। সবাই সব জানে।’ ঘুষ-দুর্নীতি পুরো বিষয়টার মধ্যে অবশ্য এখন হাসি ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। কেউ একজন ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। এখন জানা যাবে, তার ট্যাক্সের কাগজ ঠিক নেই। বিদেশে টাকা পাচার করে। অবৈধ অস্ত্র আছে। আইন-পুলিশ-দুদক সবাই ঝাঁপাবে। ওর গুপ্ত সম্পত্তি বের করে কৃতিত্বও দেখাবে। অথচ পুরো লুটতরাজটা যখন ঘটে তখনো এই প্রতিষ্ঠানগুলো জীবন্তই ছিল। কিন্তু কেউ কিছু দেখেনি। শোনেনি। জানেনি। এখন জেনে হুংকার। সেই হুংকারগুলো কৌতুকের মতো শোনায়। বেশ হাসি যায়।

এই কৌতুকময় পরিবেশে এটাও নিষ্ঠুর কৌতুক যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় সেই ক্ষেত্রটাতে যেটা হওয়া উচিত সবচেয়ে শুদ্ধ ও সুস্থ। কেন? একবার স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে কাজ করেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ ধরনের মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, ‘স্বাস্থ্যে তো দুর্নীতি বেশি হবেই।’

‘কেন হবে?’

‘এখানে মানুষ আসে অসহায় হয়ে। সেই বিপন্ন সময়ে দুষ্ট লোকরা যা সুবিধা নিতে চাইবে তাই নিতে পারবে। এখানে তাই হয়।’

‘এটা তো না হয় হাসপাতাল, অপারেশন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে। কিন্তু এই যে কেনাকাটায় হাজার হাজার কোটির ঘাপলা।’

‘এখানেও সায়েন্স আছে। অন্য যেকোনো জিনিসের দাম মোটামুটি মানুষ জানে। ধরো, একটা স্কুলে বই কেনা হচ্ছে, একটা অফিসে চেয়ার-টেবিল কেনা হচ্ছে—সবারই এর সম্পর্কে ধারণা আছে। কিন্তু হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য খাতের জিনিসপত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তেমন ধারণা নেই। তাঁর কাছে এর দাম এক লাখও হতে পারে, এক কোটিও হতে পারে। এই সুযোগটাও নেয় ওরা।’

জানি না এই যুক্তি ঠিক কি না; কিন্তু এটা ঠিক যে ঘুষ-দুর্নীতি-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব কিছু একটা তামাশা হয়ে গেছে। তামাশা যখন তখন একটা তামাশার গল্পই শুনি।

এক লোক একটা সরকারি দপ্তরের সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন। পকেটে ছিল শেষ সম্বল ২০টা টাকা। অসাবধানতায় সেটা পড়ে গেল। পুরনো আমলের কাঠের সিঁড়ি, দুটি সিঁড়ির ফাঁকে সামান্য একটু জায়গা, ঢুকে গেছে সেখানেই। উদ্ধার করতে মরিয়া চেষ্টায় নামলেন। যত চেষ্টা করেন টাকাটা তত ভেতরে ঢোকে। শেষে একেবারে এমন জায়গায় ঢুকল যে আর বের করা যাবে না। ভদ্রলোকের এই চেষ্টাটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অনেকের। তারা খুব সহানুভূতি নিয়ে দেখছিল। মানুষটি চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর দাঁড়িয়ে বললেন, ‘দেখলেন তো! সরকারি অফিসের সিঁড়িও টাকা খায়।’

আমাদের সরকারি অফিসে সিঁড়ি টাকা খায়। এর ওপরে যে ঘর, সেই ঘরের চেয়ার-টেবিল টাকা খায়। নিচে যে গাড়ি সেই গাড়িও টাকা খায়। কাজেই এর আর আশ্চর্য কী যে সেই গাড়ির ড্রাইভার শত শত কোটি টাকার মালিক হবে!

আফসোস, চুনোপুঁটিদের শতকোটি টাকার দেখা মিলছে। রাঘব বোয়ালদের হাজার হাজার কোটি টাকা এখনো প্রভাবের পর্দায় ঢেকে আছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা