kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভিন্নমত

একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে

আবু আহমেদ

অনলাইন ডেস্ক   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৩৪ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে

গত বছর ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সরকার হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। এ বছরও একই সময়ে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এবার যে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক তা হচ্ছে, ভারতে পেঁয়াজের দাম খুব বেশি বেড়ে গেছে তা কিন্তু নয়। এবার দাম কিছুটা বাড়ার আগেই তারা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশই কেন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ল? এর জবাবটা আমাদের খুঁজতে হবে। আমাদের এই পেঁয়াজ সমস্যার সমাধানও এ প্রশ্নের উত্তরেই রয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানীকৃত পেঁয়াজের ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। তাই মোটাদাগে কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাই আমাদের সংকটের কারণ। এ ছাড়া বহির্বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দৃঢ়তার অভাবের সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়ীদের কারসাজি এবং জনগণের হা-হুতাশও কম দায়ী নয়। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রতিফলন না ঘটাও একটা কারণ।

দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী গত বছর দিল্লি যাওয়ার পর অনুরোধ করেছিলেন যে তারা যদি আমাদের এ ধরনের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বন্ধ করেই দেয়, তাহলে তারা যেন অন্তত দুই সপ্তাহ আগে জানায়, যাতে আমরা প্রস্তুতি নিতে পারি। কারণ পেঁয়াজ আনতে বিকল্প উৎস খোঁজা, এলসি খোলা, কোথায় দাম ভালো পাওয়া যাবে, তা অনুসন্ধান করা—এগুলো দেখতে দেখতে দু-তিন সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধটা রাখেনি ভারত।

ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর আমাদের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভরতার কারণে যখনই সে দেশে দাম বেড়ে যাওয়া বা রপ্তানি বন্ধের খবর আসে, তখনই আমাদের বাজারে এর প্রভাব পড়তে থাকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা-সরবরাহ (ডিমান্ড-সাপ্লাই) নীতি অনুযায়ী তখন যতটা না বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়া উচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি ঊর্ধ্বমুখী হয়। এর কারণ, মাত্রাতিরিক্ত দাম বাড়াতে এখানে সিন্ডিকেটেড ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে ওঠেন। তাঁরা নিজেরা দ্রুত সিন্ডিকেট গঠন করে নেন। এই সিন্ডিকেটে ওপরের স্তর, মধ্যস্তর ও নিম্নস্তর রয়েছে। কিন্তু এই সিন্ডিকেটকে অকার্যকর করে দেওয়ার যে ব্যবস্থাপনা, সেটা আমাদের এখানে নেই কিংবা থাকলেও কাজ করে না। ফলে তারা পেঁয়াজের দাম অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে আমাদের বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা প্রতি কেজি। আর আমাদের দেশি পেঁয়াজ ছিল পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেশি। সেটা হয়তো কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়তে পারত; কিন্তু দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ হয়ে যায় স্থানীয় সিন্ডিকেশনের কারণে। যথেষ্ট পেঁয়াজ থাকা সত্ত্বেও এই সিন্ডিকেট রপ্তানি বন্ধের খবর কাজে লাগিয়ে কারসাজিতে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা এক বছরের ব্যবসা দু-তিন মাসেই করে ফেলে। তারা সব সময় তা-ই করে আসছে। তারা যখন জানে দাম কমানোর সরকারি অস্ত্র টিসিবির ট্রাকসেল সব জায়গায় পৌঁছানো যায় না এবং সামর্থ্যেও সীমাবদ্ধতা আছে, তখন তারা ভেবেচিন্তেই সুযোগটা নেয়।

পেঁয়াজ দ্রুত পচনশীল পণ্য। ছয় মাসও ধরে রাখার মতো নয়। তাই তা ভারত থেকে আনাই আমাদের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী। কিন্তু ভারত আমাদের এই চিন্তাটাকে মূল্য দেয় বলে মনে হয় না। তারা অতীতেও তা করেছে। কোনো ধরনের আগাম তথ্য জানানো কিংবা নোটিশ ছাড়াই তারা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এটা অতীতে চাল রপ্তানির ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। তাই বাংলাদেশকে এটা মনে রাখতে হবে যে ভারত আমাদের ভবিষ্যতেও জানাবে না। সেটা ধরে নিয়েই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আনার এই প্রস্তুতি নিয়েও সমস্যা রয়েছে। আমাদের আমদানিকারকরা গত সপ্তাহে বললেন যে তাঁরা অন্যান্য দেশ থেকে অবশ্যই পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে খরচটা সামান্য বাড়তি হবে। কিন্তু তাঁদের নিশ্চয়তা দিতে হবে যে ভারতীয় পেঁয়াজ আনা হবে না। কারণ ভারত যদি দুই সপ্তাহ বা এক মাস পর রপ্তানির দরজা খুলে দেয়, তখন অন্যান্য দেশ থেকে বেশি দামে আনা পেঁয়াজ নিয়ে বিপদে পড়বেন আমদানিকারকরা।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নীতিতে পরিবর্তন আনা দরকার। ভোক্তাদেরও নিজেদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন ডিমান্ড-সাপ্লাই নীতি অনুযায়ী দাম বাড়বে এবং চাহিদা কিছুটা কমে যাবে। প্রতিটা পরিবারে তখন পেঁয়াজের ব্যবহার কিছুটা কমে আসার কথা। এটা তো লবণ নয় যে ব্যবহার কমানো যাবে না। আবার শতভাগ না হলেও কিছু মাত্রায় এর বিকল্পও আছে। ফলে দাম বাড়লেও চাহিদা কমে যাওয়ায় খরচও কমে যাবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের মানসিকতায় এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইচ্ছাটা থাকতে হবে। এ কারণে গত বছর যখন দাম বেড়ে যায়, তখন আমি নিজেও পেঁয়াজ কম কিনেছি।

বাজারে জিনিসের সরবরাহ কম, তাই দাম বেশি এবং চাহিদা কম—এমনটা ঘটাই তো স্বাভাবিক। অথচ দেখা যাচ্ছে, দাম আরো বেড়ে যাবে, পাওয়া যাবে না—এই আশঙ্কায় একেকজন ১৫ থেকে ২০ কেজি করে পেঁয়াজ কিনে বাসায় নিয়ে জমা করছে। এটা ভোক্তা হিসেবে একেবারেই আমাদের বোকামি। পণ্যটা পাওয়া যাবে না—এটা ভাবতে হবে কেন? আর দাম বাড়লেও তাতে মাসিক খরচে কত টাকা বাড়বে? অথচ হুমড়ি খেয়ে পড়ায় দাম যে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছি, সেটা আমরা ভাবব না কেন?

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ভারত যদি পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করতেই চায়, তাকে সেটা করতে দিন। কারণ রপ্তানি বন্ধ করলে আমাদের লাভও আছে। আমাদের কৃষকরা দুটি পয়সা বেশি পাবেন। দরকার হলে ৫০ টাকা বাড়িয়ে আমরা দেশি পেঁয়াজ কিনব। আমাদের কৃষকরা উপকৃত হবেন। আমাদের পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়বে। কোরবানিতে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ। তাতে কি আমাদের কোরবানি হয়নি? তাই আমাদের ভারতের পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বাঁচতে শিখতে হবে।

ভারতের নীতি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আমরা একক দেশের ওপর পেঁয়াজের আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারিনি বলে ভারতও তো আমাদের সফট টার্গেট করে রেখেছে। খেয়াল করা দরকার, ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় শ্রীলঙ্কা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, মালদ্বীপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, নেপালও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তারাও তো ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ আমাদের মানুষ বেশি, চাহিদা বেশি এবং ভারতের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতাও বেশি। বিপরীত দিকে আমাদের নীতিগত দুর্বলতাও বেশি এবং জনগণের মানসিক দৃঢ়তার অভাবও বেশি। আমরা কেন আরো শক্ত করে দাঁড়াতে শিখি না? অবাক লাগে, আগের এলসি করা পেঁয়াজের ট্রাকগুলোও সীমান্তে আটকে দেওয়া হয়। পরে সেগুলো ছাড়া হলেও প্রায় ৩০ শতাংশ পেঁয়াজই নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। কেন এটা করা হলো? এর মধ্য দিয়ে ভারতের একতরফা মানসিকতা এবং আমাদের দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া যায়।

একসময় ভারত নেপালে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে চীন আকাশপথে ট্যাংকারে করে তা সরবরাহ করে। আমাদের পেঁয়াজ তো জ্বালানি তেলের মতো এতটা দরকারি না। তার পরও সাধারণ মানুষ এটা নিয়ে চিন্তিত থাকে। তাই ভারতকেও বুঝতে হবে যে আমাদের সম্পর্কটা একতরফা নয়। বাংলাদেশের জনগণের মনে এর প্রভাব পড়ে। আমাদের সরকারকেও তা বুঝতে হবে, জনগণের আবেগের মূল্য দিতে হবে।

এখন আমাদের ভাবতে হবে, ভারত এবার যা করেছে, তা গত সেপ্টেম্বরেও করেছিল। সুতরাং আগামী সেপ্টেম্বরের জন্য আমাদের আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানি—দুটি নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে। আর অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য মজুদ থাকার পরও যেন সরবরাহব্যবস্থা ঠিক থাকে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সব সময় বিকল্প উৎস উন্মুক্ত থাকলে এবং কোন দেশে থেকে কতটুকু পেঁয়াজ কবে নাগাদ আসছে, সেসব খবর সরকার যথাযথভাবে প্রচার করলে সিন্ডিকেট মজুদ বা দাম বাড়ানোর ঝুঁকি নেবে না। আর ভোক্তাদেরও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এত হাহাকার করা উচিত নয়। অনেকে বলছেন, ইলিশ মাছ দিচ্ছি, পেঁয়াজ আসছে না। এটা কোনো কাজের কথা নয়। আমাদের যদি লাভ হয়, আমাদের ইলিশ যেতেই পারে। এটার সঙ্গে ওটা মেশানোর কোনো দরকার দেখি না। আমরা দেখব লাভ পাচ্ছি কি না। আবার ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলে আমাদের পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়বে—সেটাই শেষ কথা নয়। এখানেও একটা সমস্যা আছে। কৃষক উৎপাদন বাড়ালেন। দেখা গেল, দেশে ভারতীয় পেঁয়াজের বন্যা বয়ে গেল। তখন কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়বেন এবং পরের বছর আবার উৎপাদন কমিয়ে দেবেন। তাই মৌসুমের শুরুতে আমাদের শুল্ক বাড়িয়ে পেঁয়াজ আনা একটু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৪০ টাকার উৎপাদন খরচের পেঁয়াজ আমরা ৩০ টাকা দিয়ে খাব—এই মানসিকতাও আমাদের ছাড়তে হবে। এ জন্য আমাদের বর্ডারে শুল্ক বসানো দরকার, যাতে যথাযথ দাম পেয়ে কৃষক উৎসাহিত হন।

অর্থনীতির আরেকটা কথা আছে, ইলাস্ট্রিসিটি অব ডিমান্ড। দাম বাড়লেও ডিমান্ড কমবে না। যেমন লবণের ক্ষেত্রে হয়। তাই সরকারকে দেখতে হবে, মার্কেটটা যাতে স্বচ্ছ থাকে, প্রতিযোগিতামূলক থাকে। কেউ অন্যায়, বেআইনিভাবে সুযোগ নিতে না পারে, অতিরিক্ত মুনাফা না করতে পারে। আর করোনাভাইরাসের শুরুর দিকে যেভাবে ওষুধ, মাস্ক ও স্যানিটাইজারের প্রতি মানুষ হুমড়ি খেয়ে দাম বাড়িয়েছে, সেই ধরনের মানসিকতা আমাদের বদলাতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা