kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সোহরাওয়ার্দী ঘিরে হাসপাতালের হাট, কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

তৌফিক মারুফ   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:১৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সোহরাওয়ার্দী ঘিরে হাসপাতালের হাট, কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

নীল কাচের দেয়ালজুড়ে এখানে-সেখানে ঝুলছে সাইনবোর্ড। কোনোটি পাশাপাশি গায়ে গায়ে লাগানো, আবার কোনোটি ওপরে-নিচে। কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট। দূর থেকেই সহজে চোখে পড়ে সাইনবোর্ডগুলো। এত এত সাইনবোর্ডের ভিড়ের মধ্যে থাকা বড়গুলোর সবই হচ্ছে হাসপাতালের। একটি হাসপাতাল নয়, যতটি সাইনবোর্ড ততটি হাসপাতাল ওই একই ভবনে। শুধু সাইনবোর্ডই নয়, ওই ভবনের সিঁড়িতেও যেন হাসপাতালের ছড়াছড়ি। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ, পাশের দেয়াল, ছাদ—সব কিছুতেই একেকটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নাম। রাজধানীর মিরপুর সড়কের কলেজ গেট বাস স্টপেজ লাগোয়া এই ভবন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের, যার নাম মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার।

ভবনটির নিচের দুই তলা বেইসমেন্ট। আর ওপরে রয়েছে আরো ১৫ তলা। ওপরের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত চারটি ফ্লোর সংরক্ষিত ছিল শপিং মল ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য। ভেতরের অবকাঠামো সাজানো কোনো অংশ দোকানঘরের আদলে স্টল আকারে, আবার কিছু রাখা ছিল ফাঁকা জায়গা হিসেবে। ভাড়ার ব্যবস্থাও প্রতি স্টল হিসাবে। আর সেই স্টলের কয়েকটি করে নিয়ে গড়ে উঠেছে একেকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। আর এর ওপরে রয়েছে আবাসিক ফ্ল্যাট।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটিতে রয়েছে রয়াল মাল্টিস্পেশাল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লাইফ কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল, যমুনা জেনারেল হাসপাতাল, প্রাইম হাসপাতাল, ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতাল, রাজধানী ব্লাড ব্যাংক ও ট্রান্সফিউশন সেন্টার, রয়াল হিয়ারিং সেন্টার, রাজধানী ডেন্টাল ক্লিনিক, ইউনাইটেড ডেন্টাল সার্জারি নামের চিকিৎসাকেন্দ্র।

শুধু এই ভবনেই নয়, কলেজ গেট থেকে শুরু করে শ্যামলী পর্যন্ত গজনবী রোড, বাবর রোড, হুমায়ুন রোডসহ ওই এলাকার প্রধান সড়ক ও প্রতিটি অলিগলিতেই রয়েছে কোনো না কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল। স্থানীয় লোকজন এলাকাটিকে এখন রীতিমতো ‘হাসপাতালের হাট’ বলেই অভিহিত করছে। ওই এলাকার উল্টো দিকেই রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এ ছাড়া শ্যামলী ও আগারগাঁও এলাকাজুড়ে শেরেবাংলানগরের বেশির ভাগ এলাকায় রয়েছে দেশের প্রধান ১৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মূলত এসব সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি অংশকে দালালচক্র কৌশলে ওই সব বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়; যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা নানাভাবে হয়রানি ও প্রতারিত হয়ে থাকে। এমনকি কিছুদিন পর পরই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে হাসপাতালের নামে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক বাণিজ্যের ঘটনা ধরে ফেলে। এসব অভিযানের পর কিছুদিন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও একপর্যায়ে আবার তা ঠিক হয়ে যায়, শুরু হয় আগের মতো রোগী ধরার বাণিজ্য। অবশ্যই ওই কথিত হাসপাতাল হাটের ভেতরে কোনো কোনো হাসপাতালে তুলনামূলক ভালো কিছু সেবা দেওয়া হয় বলেও জানান কেউ কেউ। ওই পুরো এলাকায় প্রায় এক শ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে বলে জানায় স্থানীয় লোকজন। এর মধ্যে চার-পাঁচটি রয়েছে বড় ও তুলনামূলক কিছুটা ভালো হাসপাতাল।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, ওই হাসপাতালগুলোর মালিকানার সঙ্গে উল্টো দিকে থাকা সরকারি হাসপাতালগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিসৎসক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা জড়িত আছেন কোনো না কোনোভাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের একাধিক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানান, এই ভবনে যে হাসপাতালগুলো রয়েছে, সেগুলোর মান নিয়ে খুবই সংশয় রয়েছে তাঁদের। মাঝেমধ্যেই রোগীদের নানা অভিযোগ নিয়ে ঝামেলা হতে দেখেন তাঁরা। এমনকি হাসপাতালের কর্মীরা রীতিমতো রোগী ও স্বজনদের টানাহেঁচড়া করে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে এসব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স বা স্টাফ হিসেবে যাঁরা আসা-যাওয়া করেন, তাঁদের গতিবিধি নিয়েও অনেকেই মাঝেমধ্যে সন্দেহ করেন। কিন্তু ভয়ে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করেন না কেউ। কারণ স্থানীয় একটি চক্রও ওই হাসপাতালগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে জড়িত রয়েছে। এ ছাড়া সবগুলো হাসপাতালের লাইসেন্স আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তাঁরা। বাসিন্দারা বলছেন, হাসপাতাল বাণিজ্যের কারণে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন ভবনটির পরিবেশও নষ্ট হয়ে গেছে।

ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি ঢাকায় থাকেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে একজন রোগী তাঁর কাছে আসেন ডাক্তার দেখাতে। তিনি পরিচিত একজন ডাক্তারের কাছে ওই রোগী নিয়ে যান, যাঁর চেম্বার ওই মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে। ওই ভবনে ঢুকতেই সিঁড়ির গোড়ায় তাঁদের নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি রোগী নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন।

ওই ভবনে থাকা রয়াল মাল্টিস্পেশাল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ডা. আবিদ হোসেন। তিনি জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে বদলি করা হয় কুষ্টিয়ায়। সেখানে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হন তিনি। বর্তমানে তিনি বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রয়েছেন।

ডা. আবিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার প্রধান হাসপাতাল পাশের আরেকটি গলিতে। এই ভবনে রয়েছে হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিট। আমি চিকিৎসক হিসেবে মনে করি, একই ভবনের মধ্যে এতগুলো হাসপাতাল থাকা ঠিক না। এ ছাড়া সবগুলোর মান যে ঠিক আছে তা-ও মনে করি না। অনেক সময় শুনি রোগী নিয়ে টানাটানির কথা। তবে আমার হাসপাতালে কোনো দালালের জায়গা নেই।’ তিনি বলেন, তাঁর হাসপাতালের নিবন্ধন নবায়ন করা আছে। বৈধতার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই।

ওই চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালগুলোর সেবা শতভাগ যে মানসম্পন্ন, সেটিও দাবি করা কোনো হাসপাতালের পক্ষে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইফতেখারুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়ম অনুসারেই স্টল ও খালি জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে। এটি পরিকল্পনা করেই করা হয়েছে। যারা বরাদ্দ পেয়েছে তারা হাসপাতালকে ভাড়া দিয়েছে। এটা নিয়ে কিছু বলার থাকতে পারে না।’

ভবনেরই একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী বলছিলেন, বেশির ভাগ সময়ই সামনের সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালরা রোগী নিয়ে আসে। অনেক সময় রোগীরা মার্কেটের মধ্যে হাসপাতাল দেখে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।

বাবর রোডের বাসিন্দা ও সরকারি উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা রীতিমতো যেন ‘হাসপাতালের হাটে’ আছেন। এখানে সেবার চেয়ে রোগী বেচাকেনা হয় বলেই দৃশ্যত মনে হয়। গলিতে গলিতে রোগী নিয়ে টানাটানি করতে দেখা যায় মাঝেমধ্যেই। যখন র‌্যাব-পুলিশের অভিযান হয়, তখন কিছুদিন স্বস্তি লাগে। রোগী নিয়ে বাণিজ্য কম থাকে। কয়েক মাস আগে একসঙ্গে কয়েকটি হাসপাতাল সিলগালা করা হলেও কিভাবে যেন কিছুদিন পরেই আবার সেগুলো চালু হয়ে গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের ১৫ হাজারেরও বেশি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার গত ২৩ আগস্টের মধ্যে নিবন্ধন নবায়ন করেছে। আরো প্রায় সমসংখ্যক প্রক্রিয়াধীন। তার পরও দুই-তিন হাজার হয়তো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই এসব নিবন্ধনহীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘লোকবলসংকট আমাদের বড় সমস্যা। এ কারণে আমরা সঠিক মাত্রায় মাঠে নেমে মনিটরিং করতে পারছি না। তবে কলেজ গেট-শ্যামলী-মোহাম্মদপুর এলাকার হাসপাতালগুলোর বিষয়ে নজর রয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা