kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আমাদের ভবিষ্যৎ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৪৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমাদের ভবিষ্যৎ

আমাদের বাংলাদেশের আশু ভবিষ্যৎ কেমন দাঁড়াবে? ভালো যে নয় সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। গত বছর ডেঙ্গুতে কাবু ছিলাম; এ বছরে তার আশঙ্কা যে নির্মূল অবস্থায় আছে তা নিশ্চয়ই নয়। ভয়ংকর একটা বন্যা আক্রমণ করেছে, করোনা না থাকলে তার পরিণাম নিয়ে আরো বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া যেত; বড় বিপদ এসে ছোট বিপদের হিসাব-নিকাশটাকে নিচে চাপা রেখে দিয়েছে। কিন্তু কয়েকটা বিপদ তো একেবারে ঘাড় চেপে ধরবে। অনেক মানুষ এরই মধ্যে বেকার হয়েছে, যাদের কাজ আছে তাদেরও বড় একটা অংশ ঠিকমতো বেতন পাচ্ছে না। সঞ্চয় ভাঙিয়ে খাচ্ছে। ক্ষুদ্র পুঁজি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ছাঁটাই চলছে। ছাঁটাই আরো বাড়বে। বিদেশ থেকে আমাদের মেহনতি ভাইয়েরা ফেরত আসবেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা হারিয়েছেন; অনানুষ্ঠানিক খাতের লোকদের কর্মচাহিদা নেই। জীবিকার সন্ধানে যারা শহরে এসেছিল, তারা দলে দলে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু গ্রামে কর্মের সংস্থান নেই বলেই না তারা শহরে এসেছিল, গ্রামে গিয়ে খাবেটা কী?

চিকিৎসাব্যবস্থাটা দুর্বলই ছিল, করোনার আঘাতে তার ভেঙে পড়ার দশা। পণ্য সংস্কৃতির ফেলো কড়ি মাখো তেল নীতিটা চিকিৎসাক্ষেত্রে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত; পাবলিকের জন্য যেসব হাসপাতাল সেগুলোর অবস্থা দেশের পাবলিকের মতোই করুণ, বিপরীতে প্রাইভেট বেশ রমরমা। তবে প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার মতো কড়ি তো আর পাবলিকের পকেটে নেই, যেতে হলে জমিজমা বেচতে হয়, না পারলে নিশ্চিত মরণ। সুবিধাভোগীরা বিদেশে যান; চিকিৎসার জন্য যান, চেকআপের জন্যও যান। ভিভিআইপি যাঁরা, তাঁরা রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে যান, তাঁরা যে যাচ্ছেন, সেটা যাওয়ার সময় একবার খবর হয়, ফিরলে সেটাও খবরে আসে; বলা হয় মহামান্যদের দেশে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, মনে হয় দেশ বুঝি তাঁদের জন্য দেশ নয়, বিদেশ বটে। এই যে করোনার সময়, বাংলাদেশ বিদেশ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, বিমান চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে  গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাঁরা আছেন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর তাঁদের আস্থারই যদি এখন ম্রিয়মাণ দশা হয়, তাহলে কি কোনো সন্দেহ থাকে যে চিকিৎসা ব্যবস্থাটা কোনমুখে এগোচ্ছে?

করোনা চিকিৎসা ধরিয়ে দিল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার হাল পতনে কতটা উন্মুখ। প্রাইভেট হাসপাতাল তো করোনার রোগী নেবেই না, পাবলিকের ব্যবস্থা নেই নেওয়ার। পাবলিক, প্রাইভেট কোনো হাসপাতালেই করোনা রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা ছিলই না বলা যায়, কোনো মতে যখন অল্পস্বল্প আয়োজন করা গেল তখন দেখা গেল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাতে ভীষণ ঘাটতি। টেস্টিং ল্যাবরেটরি খোলা হয়েছে তো টেকনিশিয়ান নেই, যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, নমুনার সংগ্রহ অপর্যাপ্ত। এসবই স্বাভাবিক। কারণ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুবই অল্প, তদুপরি সেখানে ভয়াবহ রকমের লুটপাট চলছে। এর কিছুটা মাত্র আভাস পাওয়া গেল এই খবর থেকে যে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের ঠিকাদাররা জোচ্চুরি এবং যোগসাজশের মাধ্যমে এক-দুই নয়, এক শ কোটি টাকা এরই মধ্যে হাতিয়ে নিয়েছেন। ঠিকাদারদের একজন নকল কিট সরবরাহ করে টাকা বুঝে নিয়ে হজম করে ফেলতে প্রায় সক্ষমই হয়েছিলেন, একটি হাসপাতাল সন্দেহ প্রকাশ করাতে ধরা খেয়েছেন। তাঁর মতো অনেক দক্ষই যে অধরা রয়ে গেছেন, তাতে সন্দেহ কী! খাদ্যে ভেজাল মেশানোর চেয়েও চিকিৎসায় ভেজাল ঢুকিয়ে দেওয়া যে অধিক প্রাণঘাতী, এটা তাদের কে বোঝাবে, কেই-বা নিবৃত্ত করবে? ওদিকে চিকিৎসা খাত দুঃসহরূপে কেন্দ্রীভূত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা নেই যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবে, সব কিছু আসে ওপর থেকেই। টেস্ট করানোর জন্য পাবলিককে যে কড়ি গুনতে হবে এই সিদ্ধান্তটাও ওপরেই গৃহীত।

প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর কোনো কোনোটি এগিয়ে এসেছে। কিন্তু দেখা গেল বিপন্ন চিকিৎসাপ্রার্থীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এমন সব অঙ্কের টাকা তারা হাতিয়ে নিচ্ছে, যেটা শুনলে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা। প্রতারণার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছেন একজন হাসপাতালওয়ালা। তাঁর এক হাসপাতালের দুই শাখা। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে গেছেন করোনা মোকাবেলায় বিনা মুনাফায় সেবা দেবেন বলে। তাঁর ল্যাবরেটরিতে টেস্টিং হবে। তাঁর হাসপাতাল উন্মুক্ত থাকবে চিকিৎসাসেবার জন্য। তা তিনি কাজে কোনো তৎপরতার অভাব দেখাননি। তাঁর দপ্তর থেকে হাজার হাজার ভুয়া সার্টিফিকেট ছাড়া হয়েছে, কত কোটি টাকা আয় করেছেন এবং কত লোককে যে বিপদে ফেলেছেন কে জানে। তবে এটা জানা গেছে যে ধরা পড়ার আগে নিজের ভুয়া স্বেচ্ছাসেবী কাজের জন্য এক কোটি ৯৬ লাখের একটি বিল তিনি দাখিল করেছিলেন, অল্পের জন্য সফল হননি। তাঁর হাসপাতালে করোনা রোগীদের ভর্তিও করা হয়েছে, টাকাও নেওয়া হয়েছে যথারীতি, কিন্তু সেখানে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। যে জন্য তাঁর নিজের পিতা যখন করোনায় আক্রান্ত হন তখন তাঁকে নিজের হাসপাতালে না এনে অন্যের হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। পিতা মারা গেছেন। প্রতারক ভদ্রলোকের কর্মপ্রতিভা বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি অনেক কাজে যুক্ত ছিলেন। ধরা পড়ার পর জানা গেছে যে টাকা জাল করাতেও নিয়োজিত ছিলেন। তাঁকে ধরতেও বিস্তর কষ্ট হয়েছে। তাঁর কর্মচারীরা ধরা পড়েছেন, তিনি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে একটানা ৯ দিন লুকিয়ে ছিলেন নাকি দেশের ভেতরেই; ধরা পড়লেন দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে, বোরকা পরে, নারী সেজে পগার পার হয়েই গিয়েছিলেন, অল্পের জন্যই কাত হয়েছেন। এমনটাই তো আমরা শুনতে পেলাম। আরো গভীর কিছু থাকলে জানেন তা অন্তর্যামী।

এই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে যেসব তথ্য এরই মধ্যে পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় আমাদের দেশে ডিটেকটিভ গল্প যাঁরা লেখেন তাঁদের এখন আর বিদেশি কাহিনির ছায়া অনুসরণ বা কায়া ধরে টানাটানি করার দরকার নেই, দেশের ভেতরেই প্রচুর খাঁটি জিনিস উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতারক এই ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ সাহেদ; কিন্তু সেটা তাঁর একমাত্র নাম নয়; সাহেদ করিম, মেজর করিম, কর্নেল চৌধুরী ইত্যাদি যখন যেমন তখন তেমন নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর অসাধারণ বাস্তববুদ্ধি তাঁকে বাতলে দিয়েছিল যে সাফল্যের জন্য গুটিকয়েক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত রাজনৈতিক যোগাযোগ। সেটা তাঁর ছিল, নিজেকে তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির একজন সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উচ্চ মহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। প্রতারক ভদ্রলোক এটাও বিলক্ষণ জানতেন যে যুগটা হচ্ছে মিডিয়ার, মিডিয়াকে ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলে অনেকেই কুপোকাত হবেন। তা মিডিয়াকে তিনি ঠিকমতোই ধরেছিলেন। আমরা দেখিনি, তবে যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলেছেন যে টক শোতে তাঁকে নিয়মিতই দেখা যেত। আর নিয়ম তো এই যে মিডিয়াতে যত দর্শনদান ততই প্রতিপত্তি বৃদ্ধি। সেটা তাঁর ক্ষেত্রে ঘটেছে। সাধারণ দর্শক তো অবশ্যই, এমনকি সরকারের পদস্থ লোকেরাও অনুমান করেছেন ইনি রাস্তাঘাটের লোক নন, অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর বিচরণ তাতে সহজতর হয়েছে। জানা যায়, টিভির ওপর সবটা নির্ভরতা না রেখে, প্রিন্ট মিডিয়ার দিকেও তিনি নজর দিয়েছিলেন। তাঁর ভিজিটিং কার্ডগুলোর একটিতে তাঁর পরিচয় দৈনিক নতুন কাগজ নামের পত্রিকার সম্পাদক। কার্ডটি নাকি প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা। অকালে ধরা না পড়লে আমরা হয়তো একটি নতুন দৈনিকেরও দেখা পেতাম।

এ যুগের আরেক অস্ত্র সেলফি; ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দেওয়া, প্রয়োজনমতো প্রদর্শন করা। সাহেদ সাহেব সেই কর্তব্যকে মোটেই উপেক্ষা করেননি। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে তাঁর ছবি তোলা, অথবা তৈরি করা অবস্থায় মজুদ রয়েছে। যেগুলো দেখে কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত ধারণা করতেন যে ইনি মস্ত একজন কেউকেটা। তাতে আমলা ও রাজনীতিক, উভয় মহলেই তাঁর গুরুত্ব বাড়ত এবং নিশ্চিত অবস্থানে থাকত।

একটা ছবি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি তাঁর ভুয়া কাজের জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে ঘটা করে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে। প্রবল বিক্রমে তিনি স্বাক্ষর দিচ্ছেন।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা