kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কিভাবে আদায় হয় স্বীকারোক্তি

এম বদি-উজ-জামান   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিভাবে আদায় হয় স্বীকারোক্তি

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম এবং তাঁর বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার ঘটনায় দায় স্বীকার করে রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইউএনওর বাসার মালি রবিউল ইসলাম। জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি একাই হামলাকারী ও হামলার পরিকল্পনাকারী। রবিউল এই জবানবন্দি দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ওই ঘটনায় আটক স্থানীয় যুবলীগ সদস্য আসাদুল ইসলামের ভূমিকা কী ছিল? ইউএনও ও তাঁর বাবার ওপর হামলার ঘটনায় শুরুতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আসাদুলসহ তিনজন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর গত ৪ সেপ্টেম্বর রংপুরে র‌্যাব-১৩-এর অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলন করে ‘নিছক চুরি’র অভিপ্রায়ে ওই ঘটনা বলে জানান।

কমান্ডার রেজা আহমেদ ফেরদৌস বলেন, ‘আসাদুলের ভাষ্য, তাদের লক্ষ্য ছিল ইউএনওর শয়নকক্ষ ও তাঁর বাসগৃহ থেকে অর্থসম্পদ চুরি করা।’ র‌্যাবের এই বক্তব্যের পর জনপ্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে আসাদুলের বরাত দিয়ে প্রচার করা বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এর কিছুদিন আগে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে তীব্র হোঁচট খাওয়ার একটি ঘটনা ঘটে।

নারায়ণগঞ্জের এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের অভিযোগের ওই মামলায় আটক তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা স্বীকার করেন যে মেয়েটিকে তারা ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আদালতে এই স্বীকারোক্তি দেওয়ার ৪৯ দিনের মাথায় ওই স্কুলছাত্রী জীবিত ফিরে আসে। এই অবস্থায় ওই তিন আসামির পরিবার বলছে, তাঁদের ওপর নির্যাতন করে জবানবন্দি আদায় করা হয়। এতে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়ে ওঠে। প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্টও।

শুধু এ দুটি ঘটনা নয়, এ রকম অনেক মামলা রয়েছে, যেখানে ঘটনায় জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে। আবার কখনো কখনো আদালতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন করে তথ্য প্রকাশ করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুধু জনমনেই নয়, দেশের উচ্চ আদালতেও মাঝেমধ্যেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার তদন্তে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যের গাফিলতি এবং অন্য উদ্দেশ্যে প্রভাব খাটানোর কারণে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাদী, আসামি—সব পক্ষই। আরেক দিকে মূল অপরাধী আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, মূলত রাজনৈতিক প্রভাব, এক পক্ষে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো ও পদোন্নতির লোভে ভালো কাজ দেখানোর কৃতিত্ব নিতে গিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর ঘটনা ঘটছে। আর স্বীকারোক্তি আদায় করতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। এক যুগ আগে দেওয়া উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করেই এখনো এসব চলছে।

পুলিশের নির্যাতনে সিদ্ধেশ্বরীর রুবেল নিহত হওয়ার ঘটনায় করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে হাইকোর্ট রিমান্ড ও আসামি গ্রেপ্তার নিয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। ২০১৬ সালে ওই রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারা অভ্যন্তরে স্বচ্ছ কাচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, যাতে বাইরে থেকে তার আইনজীবী দেখতে পারেন যে আসামির ওপর নির্যাতন হচ্ছে না। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন হলে তা ম্যাজিস্ট্রেটের নজরে এলেই মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেবেন। কিন্তু এসবের অনেক কিছুই মানা হয় না। এ ছাড়া আসামিকে মিডিয়ার সামনে হাজির না করা, তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মিডিয়ায় ব্রিফিং না করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ও মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে চললে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় সংক্রান্ত ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই মামলার তদন্ত আরো স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে জবানবন্দি রেকর্ড পদ্ধতিতে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের বিধান যুক্ত করতে হবে। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের সময় আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ওই সময়ের অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং থাকলে তখন আর এই নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ তুলতে পারবে না কেউ।

আইনজীবীরা বলেন, ‘আমাদের দেশের মতো ভারতেও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন এবং জোর করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ ছিল। কিন্তু ভারত ২০০৯ সালে ফৌজদারি কার্যবিধিতে আসামির স্বীকারোক্তির অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডিং করার বিধান যুক্ত করেছে। এর পর থেকে সে দেশে নির্যাতনের আর অভিযোগ উঠছে না। শুধুই ভারত নয়, সভ্য বলে পরিচিত সব দেশেই একই ব্যবস্থা।’ অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, একটি মামলার তদন্তকালে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব এভিডেন্স সংগ্রহ করা। তিনি নানাভাবে এভিডেন্স সংগ্রহ করেন বা করবেন। ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিও এ রকম একটি এভিডেন্স। কিছু কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে। এতে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা কমছে। এটা দূর করতেই আইন যুগোপযোগী করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা