kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জনগণকে আশা দেখাতে হবে

গর্ডন ব্রাউন

অনলাইন ডেস্ক   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জনগণকে আশা দেখাতে হবে

আমাদের দেশে যে কভিড-১৯ সংকট দেখা দিয়েছে, মহামারি সঙ্গে করে যে অর্থনৈতিক সংকট ডেকে এনেছে—তার নিরসন এখনো হয়নি। কার্যত তা বিপজ্জনক নতুন পর্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

মার্চ ও এপ্রিলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যে মাত্রায় সংকুচিত হয়েছিল এটা তার দ্বিগুণ। অর্থনীতি সংকট-পূর্বকালে যা ছিল এখন তার অর্ধেকে পৌঁছেছে মাত্র। এখন একটা উদ্ধার পরিকল্পনা (রিকভারি প্ল্যান) দরকার। আমাদের দরকার ফ্রান্সের ৯০ বিলিয়ন পাউন্ড, জার্মানির ১১৫ বিলিয়ন পাউন্ড, যুক্তরাষ্ট্রের এক ট্রিলিয়ন পাউন্ডের মতো বাজেট; জুলাইয়ে চ্যান্সেলর (অর্থমন্ত্রী) ঘোষিত ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের বাজেট নয়।

লাখ লাখ লোককে—এখনকার মতো মাত্র দুই লাখ লোককে নয়, প্রতিদিন পরীক্ষা করতে হবে, যাতে লোকজন কর্মক্ষেত্রে ফিরতে শুরু করলে তা কভিডের দ্বিতীয় প্রবাহের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৮ সালের পর বড় এক সংকটের সময় দেশকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমাকে খুব দ্রুত শিখতে হয়েছিল এবং আমার নিজের ভুল থেকেই শিখতে হয়েছিল। ওই সময় আমি বুঝেছি, নিত্যকার সংকট মোকাবেলা করাই যথেষ্ট নয়, অথবা ঘটনাবলির চেয়ে এক এগিয়ে থাকাও যথেষ্ট নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরবর্তী সমস্যাটি বুঝতে পারা।

প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য আমাকে মূলে পৌঁছতে হতো। প্রায় প্রথাগত চিন্তাকাঠামো এড়িয়ে সেটা করার জন্য অদম্য সংকল্প লাগে। ২০০৮ সালে ব্যাংকগুলো পুঁজিতন্ত্র চালাচ্ছিল কোনো পুঁজি ছাড়া। এটা দেখে আমরা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় করেছিলাম।

ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের অভাবের মধ্যে রয়েছি আমরা। নিয়মিত গণপরীক্ষার দরকার আগেও ছিল, এখনো আছে। রোগটির (কভিড) বিস্তার পরিমাপের কার্যকর উপায় দরকার। এরপর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত সক্রিয় হওয়া দরকার।

আমি শঙ্কিত। যাঁদের ঘাড়ে দায়িত্বভার রয়েছে তাঁরা আগামী দিনের গুরুকর্তব্যে কম মনোযোগ দিয়েছেন। গুরুকর্তব্যটি হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা। ভালো কম্পানিগুলোকে রক্ষা করা, কার্যক্ষমতা ধ্বংস যাতে না হয় সেটা করা এবং মূল পেশা ও দক্ষতার ধ্বংস স্থায়ীভাবে রহিত করার জন্য এখন বিনিয়োগ করার অর্থ প্রধান প্রধান খাতে ফারলো পেমেন্টস মেইনটেন করা—খণ্ডকালীন চাকরির জন্য মজুরি-ভর্তুকির ব্যবস্থা করা ও কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির সময় পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যাকস্টপ অফার (একরকমের ইনস্যুরেন্স) করা। অর্থাৎ জার্মানি ও ফ্রান্সের পথ অনুসরণ করা।

মহামারিতে স্থানীয় লকডাউনের অনিবার্য বৃদ্ধির সময় শ্রমিকদের রোগ সংক্রমণের বিস্তার এড়ানোর জন্য ঘরে থাকতে হয়। তখন তাদের সহায়তার জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে তা দিয়ে তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হয়। এর জন্য সপ্তাহে যে ৯০ পাউন্ড দেওয়া হয় তা দিয়ে আসলে কিছুই হয় না।

আমাদের তরুণসমাজ এখন ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে রয়েছে। বর্তমানের ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট প্রগ্রাম মাত্র তিন লাখ ৫০ হাজার জনকে সহায়তা দিতে পারে, তা-ও ছয় মাসের জন্য। অথচ দেশে অনূর্ধ্ব ২৫ বছরের ৩৫ লাখ লোক আছে। তারা ফুলটাইম এডুকেশনে নেই। কাজেই কাজ, প্রশিক্ষণ অথবা শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নতুন অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, কলেজ, ইউনিভার্সিটি স্পেসের অনেক দ্রুত এক্সপানশন দরকার। দরকার ভালো ফিউচার জবস প্রগ্রাম, যা ছিল ২০০৯ সালে।

টোরিদের কৃচ্ছ্রের কর্মসূচি কখনো ভালো আইডিয়া ছিল না। এটি একটি স্বীকৃত ব্যর্থতা। এটি একটা ইকোনমিক অ্যাবসারডিটি।

মূল্যস্ফীতি একদা এটিকে কৃচ্ছ্রের যুক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে—এখন যুক্তরাষ্ট্রে খুবই কম (low)। ফেডারেল রিজার্ভ মনে করছে, এমপ্লয়মেন্ট ম্যাক্সিমাইজিং এখন তার মূল অগ্রাধিকার হবে। এ ক্ষেত্রেও যুক্তরাজ্য পিছিয়ে। ১৯৯৮ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড অ্যাক্টের জন্য সক্রিয় ছিলাম। এর জন্য ব্যাংককে এমপ্লয়মেন্টের উচ্চ মাত্রা অন্বেষণ করতে হতো। আমিই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বলছি, ব্যাংকের আরো ডিমান্ডিং কনস্টিটিউশন দরকার, যা ডুয়াল ম্যান্ডেট আরোপ করতে পারে। বেকারত্বের বিষয়টিকে মূল্যস্ফীতির মতো গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। একটা অপারেশনাল টার্গেটের সঙ্গে এটাকে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।

বর্তমান সংকট অবশ্যই বৈশ্বিক, এটা অভ্যন্তরীণও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি মহামারি ও অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। আমি দুঃখিত, বিশ্বনেতারা একত্রে খুব কম কাজই করেছেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিওলিবারেল ইকোনমিকসের ইতি ঘটাতে সব দেশের একমত হওয়া উচিত। শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাদের এক্সক্লুসিভ ফোকাসের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটালে হবে না। তাদের ডিরেগুলেশন, লিবারেলাইজেশন এবং প্রাইভেটাইজেশন প্রয়াসের সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটানো উচিত; এর কারণে স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান ও সাসটেইনেবিলিটির ক্ষতি হয়। ‘ওয়াশিংটন কনসেন্সাস’ এখন ওয়াশিংটনেই বিবেচনারহিত। নতুন প্যারাডাইম দরকার, যা ফেয়ার ট্রেডে অগ্রাধিকার দেবে, শুধু ফ্রি ট্রেডে নয়। রেন্ট-সিকিং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর একচেটিয়া মনোবৃত্তি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটা ‘কম্পিটিশন রেজিম’ দরকার। একটা শিল্পনীতি দরকার, যা বিজ্ঞান ও নতুনত্বকে সহায়তা জোগানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে। সব কিছু একসঙ্গে নিয়ে অঙ্গীকার করতে হবে, যাতে জলবায়ু পরিবর্তন ও অগ্রহণযোগ্য বৈষম্য দূর করার কাজে নামা যায়।

এমনটা কি হতে পারে? আমি মনে করি হতে পারে।

সন্দেহ নেই, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব চ্যালেঞ্জই বটে। ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটা জোরালো ঐক্য দরকার। সেটা শুধু একটা রিকভারি প্ল্যানের জন্য চাপ তৈরি করবে না, সারা দেশে সহযোগিতা ও ঐক্যের চেতনারও পুনরুজ্জীবন ঘটাবে। নতুন সংহতির মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণকে সেটাই দিতে হবে, যেটা তারা সবচেয়ে বেশি চায়—সেটা হলো আশা।

লেখক : যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)
ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা