kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

হাসপাতালের ভিড়ে কভিড রোগীও

তৌফিক মারুফ   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:৩১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাসপাতালের ভিড়ে কভিড রোগীও

কিছুদিন আগেও কভিড ও খুব জটিল রোগী ছাড়া কেউ হাসপাতালমুখো হতো না। এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা শুরু হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ঠাঁই মিলছে না বেডে। বারান্দায়ও রোগীদের এমন ভিড়ের দৃশ্য গতকালের। ছবি : শেখ হাসান

কাগজে-কলমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় দেশে এখন করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরি সুবিধা আছে ৯৭টি। কিন্তু এর প্রায় অর্ধেক ল্যাবের নামটিই শুধু রয়েছে সরকারি তালিকায়, কোথাও একেবারেই পরীক্ষা হচ্ছে না আবার অনেক ল্যাবে পরীক্ষা হচ্ছে নামমাত্র। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পরীক্ষায় আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণেই এই অবস্থা। তবে এতে প্রমাণিত হয় না করোনার রোগী কমে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে ৯৭টি ল্যাবের মধ্যে ১৬টিতেই গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় কোনো পরীক্ষা হয়নি। আর ২৮টি ল্যাবে পরীক্ষা হয়েছে ৫০টিরও নিচে। ১৮টি ল্যাবে পরীক্ষা হয়েছে ১০০ থেকে ২০০টির মধ্যে, ১২টিতে পরীক্ষা হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০টির মধ্যে, একটিতে পরীক্ষা হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০টির মধ্যে, তিনটিতে পরীক্ষা হয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০টির মধ্যে এবং একটিতে পরীক্ষা হয়েছে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০টি নমুনার মধ্যে। কোনো কোনো ল্যাবে একটি, পাঁচটি, ছয়টিও পরীক্ষা হচ্ছে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষায় মানুষের আগ্রহ কমে গেছে, তবে তার মানে রোগী যে কমেছে সেটা ভাবা ঠিক নয়। হাসপাতালগুলোতে চোখ রাখলেই রোগীর ভিড় দেখা যায়। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই নানা ধরনের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছে। ফলে তাদেরও পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ নন-কভিড রোগীদের মধ্যে অল্পসংখ্যক কভিড রোগী মিলেমিশে থাকলে তা সংক্রমিত হবেই। এতে ঝুঁকি আরো বাড়বে।’ এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, সরকারের উচিত প্রয়োজনে পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য নতুন কোনো সহজ ও সুলভ কৌশল চালু করা। এ ছাড়া র‌্যাপিড টেস্টের ব্যাপারেও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া পরীক্ষার ওপর মানুষের যে আস্থাহীনতা বা সন্দেহ তৈরি হয়েছে, সেটা দূর করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়াটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ সামনে যদি সেকেন্ড ওয়েব আসে এবং তখন যদি মানুষ পরীক্ষা না করাতে আসে, তবে কিন্তু বিপদ বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষা করাতে কেউ না আসায় অনেক বুথ যেমন বন্ধ করে দিতে হয়েছে, তেমনি নমুনা না পাওয়ায় অনেক ল্যাবেই পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া দেশে করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ায় করোনার রোগীও এখন কমে গেছে। উপসর্গও অনেক কম।’

তবে মানুষ পরীক্ষায় আগ্রহী না হলেও হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়, যাদের অনেকেই করোনার মতো উপসর্গ নিয়ে ছুটছে হাসপাতালে। হাসপাতালের চিকিৎসকরাও যৌক্তিক কারণেই তাদের ভর্তি করছেন।

গতকাল রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বারান্দা, করিডর, ওয়ার্ড—কোথাও খালি নেই। ঠিক যেন গত বছরের ডেঙ্গুর প্রকোপের মতো ভিড় উপচে পড়ছে। বেশির ভাগেরই জ্বর, কাশি, গায়ে ব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা। এ ছাড়া আছে ডায়াবেটিস, জন্ডিস, পেটের সমস্যাসহ আসা কিছু রোগীও। ঠাসাঠাসি অবস্থা রোগী ও স্বজনদের। সামাজিক বা শারীরিক দূরত্বের বালাই নেই। স্বাস্থ্যবিধিও মানার উপায় নেই। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এমন উপচে পড়া রোগীর ভিড় ছিল না কোনো হাসপাতালেই।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-৪-এর সামনে বারান্দায় স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, চার দিন আগে থেকে তাঁর স্ত্রীর জ্বর শুরু হয়। সঙ্গে কাশি ও পাতলা পায়খানাও ছিল। শনিবার অবস্থা খারাপ হলে তাঁকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ওয়ার্ডের মধ্যে জায়গা না থাকায় বারান্দার মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। এর মধ্যে করোনা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

তাঁর পাশেই কোহিনুর নামের আরেক স্বজন বলেন, ‘আমার বোনেরে নিয়া আইছি, তার ডায়াবেটিস আছে আগে থেইকাই। এর মধ্যে আবার পেটের মধ্যে পানি জমছে, এই জন্য হাসপাতালে আনছি।’

সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল রউফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন করোনা ছাড়াও অন্যান্য ফ্লুজনিত জ্বর-কাশির প্রকোপও আছে। এ ছাড়া এত দিন সাধারণ রোগীরা হাসপাতালে না এলেও এখন করোনা কিছুটা কমে যাওয়ায় অন্য রোগীদের ভিড় বাড়ছে। তবে প্রতিদিনই আমরা ভর্তি রোগীদের ভেতর থেকেও করোনা রোগী পাচ্ছি।’

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এই হাসপাতালের মোট বেডসংখ্যা ৮৫০। এর মধ্যে ২০০ বেড কভিড-১৯ রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা আছে আর বাকি ৬৫০ বেড রাখা আছে অন্য নন-কভিড রোগীদের জন্য। এর মধ্যে এখন কভিড ইউনিটে আছে ৮২ জন। অন্যদিকে হঠাৎ করেই নন-কভিড রোগী বেড়ে গেছে। ৬৫০ জনের জায়গায় রোগী ভর্তি থাকছে প্রায় এক হাজার ২০০ জন। মেডিসিনের ৬০ বেডের ওয়ার্ডে রোগী আছে প্রায় ২০০ জন করে। ফলে বাধ্য হয়েই বারান্দায় রাখতে হচ্ছে। বারান্দায়ও বেড দেওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত বেড না থাকায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বিষয়টি অবহিত করে জরুরি কিছু বেড চেয়েছি।’ পরিচালক বলেন, এত ভিড়ের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি, শারীরিক বা সামাজিক দূরত্ব কোনোটাই সঠিকভাবে রাখা যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের মতো রোগী কমে আবার বাড়ে, যাদের অনেকেরই করোনার উপসর্গ থাকায় পরীক্ষা করা হয়। দু-তিন দিন ধরে দিনে ৫০ জনের পরীক্ষায় তিন-চারজন কভিড পজিটিভ পাওয়া গেছে। ফলে বলা যায়, নন-কভিড হিসেবে যারা হাসপাতালে আসছে, তাদের মধ্যে কভিড রোগীও রয়েছে।

শুধু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেই নয়, রোগীর চাপ বেড়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। এই হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই রোগীর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই নন-কভিড রোগী বাড়ছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় এখানে কভিড রোগী ভর্তি ছিল ৬৫২ জন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের এখানে এখন মেডিসিন ইউনিট আলাদা করে নন-কভিড হিসেবে চালু করতে পারছি না। কারণ আগের মেডিসিন ইউনিটেই আমরা কভিড ইউনিট করেছি।’ একই চিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালেও।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কভিডের সময় রোগীর চাপ কম ছিল। এখন আবার তা বেড়ে গেছে। নন-কভিড হিসেবে প্রতিদিন যারা এসে ভর্তি হচ্ছে, তাদের মধ্যে দু-একজনকে কভিড পাওয়া যাচ্ছে। পরে তাদের অন্য কভিড হাসপাতাল বা বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা