kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অসময়ে বন্যা

‘এখন বউ-ছল লিয়ে না খ্যায়া থাকা লাগবি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘এখন বউ-ছল লিয়ে না খ্যায়া থাকা লাগবি’

দ্বিতীয়বার বর্ষণে আধাপাকা জিরাশাইল ধান বেশ ক্ষতির সম্মুখীন। ভাদ্রের পাকা ধান পড়ে যাওয়ার ভয়ে তাই আগেভাগে কেটে নিচ্ছেন কৃষক। রাজশাহী থেকে তোলা। ছবি : সালাহ উদ্দিন

‘ধারদেনার টেকায় জমি আধি লিয়ে এক বিঘা জমিনত ধান লাগাচিলাম। কত স্বপ্ন ছিল এই ধানের খ্যাত লিয়ে, কিন্তু অসময়ের বানত হামার সব আশা ভাসে গেল। এখন ঘরত ভাত নাই। হাতত টেকা নাই। বানের পানি নেমে গেলেও ফসল আবাদের সামর্থ্য নাই। এখন বউ-ছল লিয়ে না খ্যায়া থাকা লাগবি।’ দফায় দফায় বন্যার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত বগুড়ার ধুনটের উত্তর শিমুলতাইড় গ্রামের কৃষক মোহাজার আলী এক বুক হতাশা নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন।

স্বপ্ন ভাঙার ক্ষত বানিয়াজান গ্রামের কৃষক লিয়াকত মোল্লার মনেও। তিনি জানান, আড়াই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান ও কলাই চাষ করেছিলেন তিনি। খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকা। ক্ষেতের ফসল বিক্রি করে দেনা শোধ দিয়ে সংসারের তিনজন মানুষের ছয় মাসের ভাতের চাল কিনে রাখার আশায় স্বপ্ন বুনছিলেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের ফসল এখন যমুনার জলে হাবুডুবু খাচ্ছে।

শুধু যমুনা চরের মোজাহার আলী কিংবা লিয়াকত মোল্লা নন, ক্ষেতের ফসল বিক্রি করে ঘরের ভাত জোগানোর এমন স্বপ্ন অসময়ের বন্যায় ম্লান হয়ে গেছে হাজার হাজার কৃষকের। চতুর্থ দফা বন্যায় জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এখন তাঁরা ‘চোখে সরষে ফুল’ দেখছেন!

কৃষকরা বলছেন, জুনের শেষ দিকে প্রথম দফা বন্যায় হরেক ফসল তলিয়ে যায়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও কয়েক দিনের মাথায় আরেক দফা ক্ষেতের ফসল প্লাবিত হয়। পরে দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় ফসল হারিয়ে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কৃষক সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিলেন। জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেছিলেন।

বগুড়ার ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিদুল হক বলেন, যমুনার পানি তিন দিন ধরে বেড়ে চর এলাকার নিম্নাঞ্চলের ২২৫ কৃষকের সদ্য লাগানো ২৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হালিম বলেন, আবারও যমুনার পানি বেড়ে চরের নিম্নাঞ্চলের শত হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে।

এদিকে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনার পানির তোড়ে নতুন করে ৯ হাজার কৃষকের স্বপ্ন তলিয়ে গেছে। কাজিপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের বন্যায় কাজিপুরের শুভগাছা, কাজিপুর, মাইজবাড়ী, খাসরাজবাড়ী, চরগিরিশ, তেকানী নাটুয়ারপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, মনসুরনগর এবং গান্ধাইল ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের উফশী ও স্থানীয় জাতের রোপা আমন ধান, মাষকলাই, মরিচ ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।

কাজিপুরের মনসুরনগর চরের চাষি মানিক মিয়া বলেন, ‘মনে করেছিলাম আর বান আইসবো না। এহন দেহি  ক্ষেতের মইধ্যে শুধু পানি আর পানি। ধানগাছ আর চোখে পড়ে না।’ নিশ্চিন্তপুর চরের মরিচ চাষি রেজাউল করিম বলেন, ‘বাড়ির পাশে বানের পানি নেমে গেলে তিন বিঘা মরিচের আবাদ করছিলাম। গাছও গজিয়েছিল, এহন সব গ্যালো।’

এদিকে কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, গতকাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল নিমজ্জিত রয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব গ্রামে পর পর দুইবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ভাটিতে ১০-১২টি গ্রামের আমনক্ষেতের প্রায় পুরোটাই তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সারডোব, কাগজীপাড়া, হলোখানা, চর বড়লই, রাঙামাটি গ্রামের কৃষকদের।

কুড়িগ্রামের কাগজীপাড়া গ্রামের কৃষক শাহ আলম বলেন, ‘ছাগল, ভেড়া বিক্রি করি চার বিঘা জমি আবাদ করছি। এলা বানে আসি সউগ খায়া গেইল।’ একই গ্রামের কৃষক মোফাজ্জল হোসেন জানান, ২০ হাজার টাকা ঋণ করে তিন বিঘা জমিতে আবাদ করেছিলেন। সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কী করে ঋণ শোধ করবেন, সেই চিন্তায় হতাশ তিনি। তিনি বলেন, ‘বন্যায় বিছন শ্যাষ হয়া গেইছে। ঋণ করি আবাদ করছি। ১০-১৫ দিন থাকি ক্ষ্যাতোত পানি। ধান তো শ্যাষ। আর আবাদ করার সময়ও নাই। এবার খামো কী? ঋণ কী দিয়া শোধ করমো।’

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামসুদ্দিন মিয়া জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনার বরাদ্দ পেলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের জন্য সহায়তা করা হবে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা