kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

জীবনের জন্য ওজোন

বিধান চন্দ্র দাস   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৩:৩৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জীবনের জন্য ওজোন

ওজোন হচ্ছে ফ্যাকাসে নীল রঙের একটি গ্যাস। গ্যাসটির এক ধরনের কটু গন্ধের জন্যই এই নামকরণ হয়েছে। ওজোন গ্যাস বিস্ফোরকধর্মী বিষাক্ত একটি গ্যাস। তবু এই গ্যাসই আমাদের জীবন রক্ষা করে চলেছে। পৃথিবীর জীবকুল বেঁচে থাকার জন্য ওজোন অপরিহার্য। ‘জীবনের জন্য ওজোন’ (ওজোন ফর লাইফ)—জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি নির্ধারিত এ বছরের আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর রক্ষা দিবসের (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০) প্রতিপাদ্য।

প্রশ্ন হতে পারে, এ ধরনের বিস্ফোরকধর্মী বিষাক্ত একটি গ্যাস—তা মানুষ কিংবা পৃথিবীর জীবকুলের বেঁচে থাকার জন্য কিভাবে অপরিহার্য হয়? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য পানির উদাহরণটি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। আমরা জানি, পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু খারাপ জায়গার দূষিত পানি পান করলে তা মানুষের মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। ঠিক তেমনি আমাদের চারপাশে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুমণ্ডলে যদি ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব বেশি থাকে, তাহলে তা আমাদের স্বাস্থ্য তথা জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। জীববৈচিত্র্যের জন্যও তা ক্ষতির কারণ। অথচ এই ওজোন গ্যাসই বায়ুমণ্ডলের একটি বিশেষ স্তরে যদি না থাকত,  তাহলে তা হতো আমাদের তথা জীবজগতের জন্য বিপর্যয়কর।

ভূপৃষ্ঠের ওপরে বায়ুমণ্ডলের স্তরকে নিচ থেকে খাড়াভাবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগগুলোর নাম হচ্ছে : ট্রোপোসফেয়ার, স্ট্রাটোসফেয়ার, মেসোসফেয়ার, থার্মোসফেয়ার, আয়নোসফেয়ার ও এক্সোসফেয়ার। ভূপৃষ্ঠের ওপরে প্রথম স্তরটির নাম ট্রোপোসফেয়ার। এই স্তর ভূপৃষ্ঠের ওপর খাড়াভাবে আট থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে সমগ্র ওজোনের মাত্র ১০ শতাংশ ওজোন পাওয়া যায়। ট্রোপোসফেয়ারের পরের স্তরকে বলা হয় স্ট্রাটোসফেয়ার। স্ট্রাটোসফেয়ার খাড়াভাবে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার ওপর থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত সমগ্র ওজোনের ৯০ শতাংশ ওজোন পাওয়া যায় স্ট্রাটোসফেয়ারে। এ জন্য এই স্তরকে ওজোনসফেয়ার কিংবা ওজোনস্তর বলা হয়। ট্রোপোসফেয়ারে, বিশেষ করে ভূমিসংলগ্ন অংশে ওজোনের পরিমাণ বেশি হলে তা মানুষ তথা জীবকুলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। অন্যদিকে স্ট্রাটোসফেয়ারে অর্থাৎ ওজোনস্তরে ওজোনের পরিমাণ কম হলে সেটিও হয় মানুষ তথা জীবকুলের জন্য ক্ষতির কারণ।

ওজোনস্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি, বিশেষ করে সব থেকে তেজস্ক্রিয় ও বিপজ্জনক টাইপ ‘ইউভি-সি’ (১০০-২৮০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য)-কে সম্পূর্ণ আটকে দেয়। সূর্যের অপেক্ষাকৃত কম তেজস্ক্রিয় রশ্মি টাইপ ‘ইউভি-বি’ (২৮০-৩১৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য)-এর প্রায় সবটাই ওজোনস্তর শুষে নেয়। ওজোনস্তরে ‘ইউভি-সি’ সম্পূর্ণ আটকা না পড়লে এবং ‘ইউভি-বি’-এর বেশির ভাগ শোষিত না হলে—এই দুই ধরনের ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীতে চলে আসত। ফলে ত্বকের ক্যান্সার ও চোখের ছানিপড়া রোগে আমরা সবাই আক্রান্ত হতাম। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও  হ্রাস পেত। সামুদ্রিক জীব, এককোষী জীব, ফসলসহ গাছপালা ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই ওজোনস্তর আছে বলেই আমরা রক্ষা পাচ্ছি। রক্ষা হচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য জীবকুল। এ জন্যই বলা হচ্ছে জীবনের জন্য ওজোন।

কিন্তু আমাদের কর্মকাণ্ডের ফলে একসময় ওজোনস্তরে ওজোনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার, অ্যারোসল, ফোম, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ইনহেলার ইত্যাদি তৈরির কারখানাসহ ড্রাই ক্লিনিং করার সময় ক্লোরিন ও ব্রোমিনযুক্ত নানা ধরনের গ্যাস (সিএফসি, হ্যালোন, মিথাইল ক্লোরাইড, এইচসিএফসি ইত্যাদি) বায়ুমণ্ডলে মিশে স্ট্রাটোসফেয়ারে অর্থাৎ ওজোনস্তরে পৌঁছে যায়। প্রাকৃতিকভাবেও কিছু পরিমাণ ক্লোরিন ও ব্রোমিনযুক্ত গ্যাস তৈরি হয় এবং ওজোনস্তরে পৌঁছে। স্ট্রাটোসফেয়ারে এসব গ্যাস পৌঁছানোর পর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ও অন্যান্য রাসায়নিকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নানা ধরনের অতিক্রিয়াশীল গ্যাস (ক্লোরিন মনোক্সাইড, ব্রোমিন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন ব্রোমাইড ইত্যাদি) তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এসব অতিক্রিয়াশীল গ্যাস ওজোনস্তরের ওজোনকে ধ্বংস করে। ফলে ওজোনস্তর হালকা হয়ে যায় এবং সেখানে গহ্বর তৈরি হয়।

বায়ুমণ্ডলে সূর্যালোক ও অক্সিজেন অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ওজোন সৃষ্টি হয়। বেশির ভাগ ওজোন স্ট্রাটোসফেয়ারেই তৈরি হয়। ট্রোপোসফেয়ারেও ওজোন তৈরি হয় প্রাকৃতিকভাবে এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে (যেমন—জীবাশ্ম জ্বালানি)। ট্রোপোসফেয়ারের ওজোনও ধ্বংস হয় কিছুটা প্রাকৃতিকভাবেই এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গমনের মাধ্যমে। বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট ওজোনের পরিমাণ যদি তার ধ্বংসের পরিমাণ থেকে কম হয়, তাহলে ওজোনস্তর হালকা হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় গহ্বরের।

ওজোনস্তর রক্ষার জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ভিয়েনা কনভেনশন এবং ১৯৮৭ সালে মন্ট্রিয়ল চুক্তি সম্পন্ন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাতে স্বাক্ষর করেন। এই কনভেনশন ও চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ওজোনস্তর বিনাশকারী গ্যাস, যেমন—ক্লোরোফ্লোরোকার্বন সংক্ষেপে যাকে সিএফসি বলা হয়, সেই গ্যাসসহ হ্যালোকার্বন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গ্যাসের উৎপাদন কমানো। পরবর্তী সময়ে এই কনভেনশন বা চুক্তিতে বেশ কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়। এসব সংশোধনীতে মূলত ওজোনস্তর ধ্বংসকারী পদার্থগুলোর নতুন তালিকা, বিকল্প ও সেসব ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

সিএফসির বিকল্প হিসেবে একসময় এইচএফসি (হাইড্রোফ্লোরোকার্বনস) ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এইচএফসি ওজোনস্তর ধ্বংস না করলেও তা বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করছে। এ বিষয়ে ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে সংশোধনী (মন্ট্রিয়ল চুক্তি) আনা হয় এবং ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা হয়েছে। এইচএফসির উৎপাদন ও তার ব্যবহার পরবর্তী ৩০ বছরে পর্যায়ক্রমে ৮০ শতাংশ হ্রাস করাই ছিল এই সংশোধনীর প্রধান উদ্দেশ্য।

ওজোনস্তর রক্ষা বিষয়ক এসব কনভেনশন বা চুক্তি ও সংশোধনীগুলো ওজোনস্তর রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে। কিন্তু গত এপ্রিলে (২০২০) প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারে বিলম্ব হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে চীন থেকে সিএফসি গ্যাস আবার নির্গমন হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। গত ৩ জুলাই ২০২০ অ্যাটমোসফেয়ার জার্নালে প্রকাশিত অপর একটি প্রবন্ধেও ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারে বিলম্ব হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি সত্যি উদ্বেগজনক। ওজোনস্তর ক্ষয়জনিত ভয়াবহ সমস্যা থেকে বাঁচতে হলে সংশ্লিষ্ট সব দেশকেই সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ গত ৮ জুন ২০২০ ‘কিগালি সংশোধনী’তে স্বাক্ষর করেছে। কাজেই এইচএফসি বন্ধ করে পর্যায়ক্রমে তার বিকল্প ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশে এখন অনেক কিছুই (রেফ্রিজারেটর, এয়ারকুলার, এসি গাড়ি, ইনহেলার ইত্যাদি) এইচএফসিনির্ভর। এ ছাড়া আগের এইচসিএফসি ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতিও চলছে। সেগুলোরও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের ‘ওজোন সেল’টির ওয়েব পেজ আরো তথ্যপূর্ণ, হালনাগাদ ও আকর্ষণীয় করে তা সরাসরি জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ওজোন সচিবালয়ের ওয়েব পেজের সঙ্গে লিংক করা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা