kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ঝুঁকি মোকাবেলার উপায়

আবু আহমেদ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৬:০২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ঝুঁকি মোকাবেলার উপায়

সম্প্রতি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিন হাজার ৯০০ কোটি (৩৯ বিলিয়ন) ডলার অতিক্রম করেছে। রিজার্ভের এই রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের বিষয়। রিজার্ভ বেশি থাকলে বড় বড় বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পায়, উৎসাহিত হয়। আমদানি করতে গেলে বা বৈদেশিক কেনাকাটায় মুদ্রার অভাব হবে না—এই ভাবনা তৈরি করে। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা অনেক দিন ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিল। এখন আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের অর্থনীতির সক্ষমতাটা বেড়ে গেল। তবে একই সঙ্গে দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধির লাভ-ক্ষতিটাও দেখা উচিত। রিজার্ভ বাড়া যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি কার্যকর ব্যবহার না হলে এর ঝুঁকিও আছে। এর বড় ঝুঁকি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, অর্থপাচার এবং ডলারের দাম পড়ে যাওয়া। তাই ঝুঁকি মোকাবেলায় দরকার যথাযথ রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা।

প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কেন বাড়ল? বাড়ছে মূলত তিনটি কারণে। একটি হচ্ছে, এখন আমাদের নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে। রিজার্ভ বাড়ার আরেকটা উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্সের বর্ধিত প্রবাহ। তবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে বিদেশে আমাদের লোকেরা বেশি আয় করছে এবং বেশি বেশি পাঠাচ্ছে। বরং তারা আগেও একইভাবে আয় করছিল এবং অর্থ পাঠাচ্ছিল। কিন্তু ওই অর্থের সবটা আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমে রেকর্ড হতো না। অর্থাৎ বৈধপথে আসত না। ফলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জমা হতো না, রিজার্ভের খাতায়ও উঠত না। সাধারণ হিসাব হলো, আগে দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসত, তার কমপক্ষে এক-চতুর্থাংশ অনানুষ্ঠানিক খাত দিয়ে আসত এবং তা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বেচাকেনা হতো। যেমন—দিলকুশা, মতিঝিলসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ফরেন এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতে এই বেচাকেনা হতো। বৈধপথে এই মুদ্রা সংগ্রহটা জটিল ছিল বলে মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে এখান থেকে নিত। এখন করোনাকালে এই অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কমে গেছে। কারণ মানুষ দেশের বাইরে প্রায় যাচ্ছেই না, ছাত্ররা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে না, রোগীদেরও বাইরে যাওয়া প্রায় বন্ধ। ট্যুরিস্ট হিসেবেও কেউ তেমন বাইরে যাচ্ছে না। তাই বৈদেশিক রিজার্ভের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে লোকজন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে না পাঠিয়ে সবাই ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এর ওপর ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠালে ২ শতাংশ ইনটেনসিভও পাচ্ছে। ফলে রেমিট্যান্সের প্রায় সবটাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জমা হচ্ছে। এ কারণেই গত কয়েক মাস ধরে বলা হচ্ছে, রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধিটা ওই কারণেই হচ্ছে।

রিজার্ভ বাড়ার আরেকটা উৎস হচ্ছে তৈরি পোশাক রপ্তানি। আমরা সৌভাগ্যবান যে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যতটা আশঙ্কা করেছিলাম, ততটা কমেনি। বরং গত দুই মাসে যে রেকর্ড দেখা যাচ্ছে, তাতে সেটা ওপরের দিকে যাচ্ছে। আশা করি পরবর্তী মাসে আরো বৃদ্ধি পাবে। সামনে বড়দিন, পোশাক কারখানাগুলো অর্ডার আরো বেশি পাবে বলে আশা করছি।

এই তিনটা বড় কারণ ছাড়াও আরো কিছু কারণে রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন—বৈদেশিক মুদ্রার যে ব্যয়, সেটা স্থবির আছে। কারণ আমাদের বড় প্রকল্পগুলোতে গত চার-পাঁচ মাসে তেমন খরচ করতে হয়নি। প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের কলকারখানাগুলো বন্ধ ছিল, তাই কারখানার কাঁচামাল আমদানি বন্ধ ছিল। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের যে আমদানির ক্ষেত্র, সেটা ঘটেনি। তাহলে কি আমদানি বাড়লে বর্তমান রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে? আশা করা যায়, আমাদের রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয়ের পরও রিজার্ভ কমবে না, স্থিতিশীলই থাকবে বলে আশা করি।

এবার আসি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ঝুঁকি প্রসঙ্গে। দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রাগুলো সরাসরি ডলার হিসেবে জমা হয় না। মনে রাখতে হবে, যখন বৈদেশিক মুদ্রা আসে, তখন এর বিপরীতে গ্রাহককে বাংলাদেশি মুদ্রা তথা টাকা সরবরাহ করতে হয়। এ কারণে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। এই মুদ্রা সরবরাহ যদি দেশে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে বেশি হয়, তখন মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। প্রশ্ন আসতে পারে, দেশে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে এত টাকা ছাপানো বা বাজারে ছাড়ার পরও কেন মূল্যস্ফীতি হচ্ছে না? সেটারও কারণ আছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গত কয়েক মাসে মানুষ প্রচুর পরিমাণে ক্যাশ টাকা ঘরে রেখে দিয়েছে। সেটা যদি ব্যাংকিং সেক্টরে থাকত, তাহলে টাকার যে ভেলোসিটি অব সার্কুলেশন (মুদ্রার হাত বদলের গতি) দ্রুত হতো। এখন সেটা হচ্ছে না। এ কারণে মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে না।

আরেকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। আমরা এখন খুব কম দামে পেট্রোলিয়াম পণ্য বাইরে থেকে আমদানি করছি। আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার, সেটা এখন ৪০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর দাম বাড়ায়নি। ফলে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম মূল্যস্ফীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। এ ছাড়া রয়েছে আমাদের কৃষির বাম্পার ফলন। এটাও আমাদের সৌভাগ্য। কৃষিতে ভালো ফলন হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহটা স্থিতিশীল আছে। যে কারণে মূল্যস্ফীতির ভয়টা অনুভূত হচ্ছে না এবং বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে না।

রিজার্ভ বাড়ার আরেকটা ঝুঁকি হচ্ছে অর্থপাচার। টেন্ডার প্রক্রিয়া বা প্রকিউরমেন্টে বেশি দরে বিদেশে থেকে পণ্য কেনা, কেনাকাটায় ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে জিনিসপত্র আমদানির মাধ্যমে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আবার বাইরে চলে যায়। তাই বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার যথাযথ হওয়া জরুরি। না হলে আমাদের অর্থনীতিতে কিছু লোক রিজার্ভ বৃদ্ধির সুযোগ নেবে। এই বৈদেশিক মুদ্রাকে তারা বিভিন্নভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে, ডিফল্ট করে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে কিংবা টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে যায়। আমাদের মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক মুদ্রা যখন সহজলভ্য হয়ে ওঠে তখন লুটেরা শ্রেণি সুযোগ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এটা বন্ধের জন্য সরকারি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে কঠোরতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত, আমদানি-রপ্তানিতে সতর্কতা ও নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার পুনর্মূল্যায়নের দরকার আছে। সম্প্রতি জানা গেল, বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে ডলারের চেয়ে সোনার পরিমাণ বেশি। কোনো কোনো রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভের ৭০ শতাংশ সোনা মজুদ রেখেছে। আমাদের চেয়ে চীন-ভারতেও স্বর্ণের রিজার্ভ বেশি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকে এর পরিমাণটা জানা যায় না। এখন কিন্তু বৈশ্বিকভাবেই কারেন্সিগুলোর বিপরীতে ডলারের দাম কমছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রিজার্ভ হিসাবে স্বর্ণের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলার থেকে কিছুটা হলেও সরে গিয়ে আরো স্থিতিশীল ও শক্তিশালী কারেন্সিতে যাওয়া যায় কি না সেটাও ভেবে দেখা উচিত। কারণ ডলারের দাম যদি বৈশ্বিকভাবে পড়ে যায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও যদি ৯০ শতাংশ মার্কিন ডলার ধরে রাখে, তাহলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার কার্যকর ব্যবহারের পাশাপাশি এর প্রবাহ যেন অব্যাহত থাকে, সেদিকেও মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। চীন থেকে কম্পানি সরিয়ে বাংলাদেশে এলে ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাপান সরকার। বাংলাদেশের সরকারের খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এসব বিনিয়োগকারীকে আহ্বান জানানো উচিত। বিদেশি বিনিয়োগের ভালো গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমাদের রিজার্ভে টান পড়বে না। এ ক্ষেত্রে করপোরেট ট্যাক্স কমানো এবং ব্যবসা সহজীকরণের বিষয়গুলো নিয়ে আরো ভাবতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের অর্থনীতি এখনো ৭০ বা ৭৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। আমার মতে, আমাদের অর্থনীতি এখনো যেখানে যেখানে বন্ধ আছে, সব খুলে দেওয়া উচিত। যেহেতু অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিত।

মূল কথা হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবশ্যই আমাদের জন্য আশীর্বাদ। তবে সেটার কার্যকর ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের সুদিন না-ও থাকতে পারে। তাই সুযোগগুলো যতটা সম্ভব গ্রহণ করে বাংলাদেশকে একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। সে জন্য দুর্নীতি রুখতে হবে, অর্থনৈতিক সুশাসন, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষ যেন মনে করে সর্বক্ষেত্রে সে সুবিচার পাবে, যা অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো। না হলে আমাদের অর্থনীতি থেকে অর্থপাচার হতে থাকবে। আফ্রিকায় একসময় খনিজ সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অভাব ছিল না। কিন্তু সামাজিক স্থিতিশীলতা না থাকায় ওই সব দেশের লোকেরাই এসব সম্পদ বিদেশে নিয়ে গেছে। কোনো কোনো আরব দেশের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। আমাদের যেন এমনটা না হয়।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা