kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

স্বাস্থ্য ও শস্য বীমা ফাইলবন্দি

সজীব হোম রায়   

২২ আগস্ট, ২০২০ ০৩:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাস্থ্য ও শস্য বীমা ফাইলবন্দি

বীমা খাত চাঙ্গা করতে কাজ করার কথা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বা আইডিআরএর। উল্টো তাদের কার্যকলাপই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। ছয় মাস ধরে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিকে অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন বেসিসের অনুমোদন দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। ফলে কম্পানিটি লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারছে না। আবার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য বীমা ও শস্য বীমা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সেটিও করতে পারছে না আইডিআরএ।

স্বাস্থ্য ও শস্য বীমার কোনো খবর নেই : দেশের সব চাকরিজীবীসহ প্রায় সাত কোটি মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই স্বাস্থ্য বীমা চালুর ঘোষণা দেন গত বছর। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই স্বাস্থ্য বীমা চালু করার দায়িত্ব পড়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর। অর্থ মন্ত্রণালয় একটি মডেল দাঁড় করানোর দায়িত্ব দেয় সাধারণ বীমা করপোরেশনের ওপর। আর সার্বিক বিষয় দেখভালের দায়িত্ব পড়ে আইডিআরএর ওপর। প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি আইডিআরএ। ফলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনেকটা বিফলে যেতে বসেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য বীমা হতে পারত জনগণের আস্থার প্রতীক। এতে বীমা খাত আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠত। কিন্তু এটি ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে আইডিআরএতে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হওয়া ফসলের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে শস্য বীমা চালুর ঘোষণা দেয় সরকার। প্রাথমিকভাবে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাত জেলায় শস্য বীমা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ এসব জেলায় প্রতিবছর ১৯ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষি ফসল উৎপাদন হয়। এর ৯০ শতাংশই বোরো ধান। পাশাপাশি এসব জেলায় ৩৭৩টি হাওর রয়েছে।

বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে রয়েছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষকরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে; কিন্তু শস্য বীমা চালুর কোনো উদ্যোগ নেই। এর সার্বিক দায়িত্ব পালন করছে আইডিআরএ। প্রতিষ্ঠানটি এখানেও ব্যর্থ। অথচ বলা হয়েছিল, চলতি বছরই পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা না দিতে পারার ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি।

এসব বিষয় স্বীকার করে নিয়ে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ দুটি কাজই কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে।’ করোনা মহামারির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাড়া পাচ্ছে না ডেল্টা লাইফ : সূত্র মতে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েক দফা চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পাচ্ছে না ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানি। গত বছরের কম্পানির পলিসির দায় (অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন) নির্ণয়ে অ্যাকচুয়ারি নিয়োগের বিষয় জানিয়ে অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশনের বেসিস অনুমোদনের জন্য চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএর কাছে আবেদন করে ডেল্টা লাইফ। এরপর ১৩ ও ২৯ জুলাইও এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে কম্পানিটি। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আবেদনে কোনো সাড়া দেয়নি আইডিআরএ। এতে বিপদে পড়েছে ডেল্টা লাইফ। কারণ ‘অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশনের বেসিস’ অনুমোদন না হলে বার্ষিক সাধারণ সভা করতে পারবে না কম্পানিটি। ফলে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ এবং পলিসি বোনাসও দিতে পারবে না। এতে একদিকে যেমন কম্পানি আইন লঙ্ঘন করা হবে, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকায় সেখানেও সমস্যা হবে। তা ছাড়া বিষয়টি মীমাংসা করতে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। এটি কম্পানি বা বীমা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কারোর জন্যই ভালো হবে না।

কম্পানি আইন ১৯৯৪-এর ধারা ৮১ অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বার্ষিক সাধারণ সভার ১৫ মাসের মধ্যে পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২০১৮ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা গত বছরের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে। কম্পানি আইন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা চলতি বছরের ২৩ অক্টোবরের মধ্যে করতে হবে। তা ছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং রেগুলেশন ২০১৫ অনুযায়ী, বার্ষিক সাধারণ সভার আনুষ্ঠানিকতা সভার তারিখের দুই মাস আগে থেকে শুরু করতে হয়। সে হিসাবেও চলতি মাস থেকে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আইডিআরএর নীরবতার কারণে কিছুই করতে পারছে না কম্পানিটি। পুরো বিষয়টি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও (বিএসইসি) জানিয়েছে ডেল্টা লাইফ। তবে তাতেও কোনো সুরাহা মেলেনি। তাই বিষয়টি মীমাংসা করতে শেষ পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে কম্পানিটি।

এ ব্যাপারে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আদিবা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইডিআরএ কেন আমাদের অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন অনুমোদন দিচ্ছে না, তা আমার জানা নেই। আমরা সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। তবে এটি জানি, আমাদের পরে আরো প্রায় ৮-১০টি কম্পানিকে তারা অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন অনুমোদন দিয়েছে। আমাদেরটি সম্ভবত স্পেশাল কেস। তবে সেটি কেন, তা আমরা জানি না।’  এ ব্যাপারে আইডিআরএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে জানিয়ে আদিবা রহমান বলেন, ‘তিনি প্রতিবারই দিয়ে দেবেন বলেছেন; কিন্তু দেননি।’

জানতে চাইলে আইডিআরএর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম্পানিটির কাগজপত্রে ঝামেলা আছে। আমরা যে কাগজপত্র চেয়েছি, তা ডেল্টা লাইফ দিচ্ছে না। তাই অনুমোদনও দেওয়া হচ্ছে না।’



সাতদিনের সেরা