kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

স্বপ্ন ছিল মানবিক ডাক্তার গড়ার

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত   

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০২:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বপ্ন ছিল মানবিক ডাক্তার গড়ার

১৯৭২ সালে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) অনুসারে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুসারে জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে তখনই অনেক ধরনের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করা হয়। সেই সঙ্গে চিকিৎসা জনবল তৈরির গুরুত্ব উপলব্ধি করে মানসম্মত চিকিৎসাশিক্ষা এবং গবেষণা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ওই বছর স্থাপন করেছিলেন ‘আইপিজিএমআর’, যা বর্তমানে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়’।

১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর জনাকীর্ণ পরিবেশে (অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম সাহেবের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও) তৎকালীন পিজি হাসপাতালে প্রথম রক্তসঞ্চালন কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতির জনকের বক্তব্য ছিল সুস্পষ্টভাবে চিকিৎসকদের প্রতি ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। চিকিৎসকদের ঘনঘন ছুটি ভোগ, গ্রামে না যাওয়া—এ নিয়েও বঙ্গবন্ধু আমাদের যথেষ্ট নির্দেশ ও উপদেশ দেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সাদা কাপড়-চোপড় দেখলেই কেন তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেন? আর দুঃখী মানুষ আসলেই কেন তাকে রাস্তায় বাইর করে দেন, বয় বলে চিৎকার করেন? এই মনোভাবের পরিবর্তন কবে আপনাদের হবে! আমি শুধু আপনাদের ডাক্তার সাহেবদের বলছি না। এটা যেন আমাদের জাতীয় চরিত্রের মধ্যে এসে গেছে। এ জাতীয় চরিত্রের প্রতি চরম আঘাতের প্রয়োজন আছে।’

ওই বছরই বঙ্গবন্ধু স্বউদ্যোগে তদানীন্তন পূর্ব জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ থেকে কিছু ডাক্তার পাঠিয়েছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁরা দেশে ফিরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রদান করবেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, তাঁদের মধ্য থেকে দুই-একজন জার্মান সরকারের দুই বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। এটা শুধু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, মুক্তিযোদ্ধা ও জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। পরবর্তী সময়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে পূর্ব জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। তারপর বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে অর্থোপেডিক সার্জন উৎ. জড়হধষফ ঔড়ংযবঢ়য ধেত্ংঃ বাংলাদেশে এসে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাই শুধু দেননি, অনেক জুনিয়র ডাক্তারকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। তখন থেকে দেশে অর্থোপেডিক সার্জারির শুরু। একই সময়ে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে তিনি ভারতের বিখ্যাত প্লাস্টিক সার্জন উৎ. চধৎাবরু ইধুষবরহ-কে এনে পাঁচটি শয্যার মাধ্যমে প্লাস্টিক সার্জারির গোড়াপত্তন করেন। জাতির পিতার পাঁচ শয্যার প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট আজ তাঁরই কন্যার হাত ধরে ৫০০ শয্যার ‘শেখ হাসিনা ন্যাশনাল বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’-এ পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নার্সদের সম্মানের চোখে দেখতেন। তাঁদের মর্যাদার প্রতি তিনি ছিলেন সদা সচেতন। রাজনীতির এই দার্শনিক বেশিদিন সময় পানিনি। আর কয়েকটা বছর বেঁচে থাকলে, আজকে ২০২১ সালে যে মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা ১৯৮০ সালের মধ্যেই হয়ে যেত।

১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবরের পরে আজ ৪৮ বছর পার হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন, আজও যেন তাই দেখা যাচ্ছে। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের পরিবর্তন হওয়া দরকার। মানবিক পরিবর্তন। তাঁর আহ্বান ছিল মানবতাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই দেশের চেহারা অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র যুদ্ধের পরে গৃহযুদ্ধ চলে, দুর্ভিক্ষ আসে। লাখ লাখ লোক গৃহযুদ্ধে এবং দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। বঙ্গবন্ধু তা হতে দেননি। তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ, দূরদর্শিতা, বন্ধুরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য—সবই আমরা পেয়েছিলাম তাঁর জন্যই। চিকিৎসক হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল স্বাধীনতার মন্ত্র, স্বাধীনতার ঘোষণা, সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক। ৮ অক্টোবরের ভাষণ ছিল চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সবার প্রতি মনুষ্যত্বের গুণাবলি নিয়ে মানবতাবোধ জাগ্রত করে রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান।

পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসাসেবা হলো জরুরি এবং ব্যয়বহুল। স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পদক্ষেপ ছিল ডাক্তারদের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা। তাঁর যুক্তি ছিল, দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী ডাক্তার অপ্রতুল। আমাদের চাহিদার কথা ভেবে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করলেন থানা হেলথ সেন্টার। তিনি ভেবেছিলেন, স্বাধীন রাষ্ট্রে মানুষ স্বাধীনভাবে বসবাসের সব ধরনের মৌলিক অধিকার ভোগ করবে। বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন, প্রতি ৮-১০ হাজার মানুষের জন্য একটি করে। যেখানে স্থানীয় জনগণের পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। এ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ইচ্ছা করলেই চঁনষরপ ঐবধষঃয উবসড়মত্ধঢ়যু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারে। সেখানেও দরকার স্বাস্থ্যকর্মী সহায়কদের উদার সেবার মনোবৃত্তি, যার ওপর বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট জোর দিয়েছিলেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য তিনি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সর্বস্তরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসক তৈরি, হাসপাতাল তৈরিসহ নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালেই তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই কাজগুলো এগিয়ে নিচ্ছিলেন। এমনকি বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনিয়ে দেশীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। আবার দেশের প্রতিভাবান চিকিৎসকদের বিদেশে পাঠিয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ডিগ্রি করিয়ে আনেন। একাধিক চিকিৎসককে তিনি বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন।

তার পরও বলব, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। তিনিও জনগণের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা নিশ্চিত করার ব্যাপারে একাধিক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। একাধিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাস্থ্যবীমা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা