kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

সোনার বাংলা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতাম

ড. আতিউর রহমান   

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০২:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোনার বাংলা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতাম

ইংরেজ শাসনের অবসানের জন্য অনেকের মতো বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির মুহূর্তেই যেভাবে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হলো, জমিদারি প্রথা বিলোপে মুসলিম লীগ সরকারের গড়িমসি দেখা গেল, কৃষকদের কর্ডন প্রথার নাম করে হয়রানি করা শুরু হলো এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করার যে ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রের মদদে চালু হলো, তাতে তাঁর পাকিস্তানের প্রতি মোহ কেটে গেল। তাই নতুন করে বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের আন্দোলনের গোড়াপত্তন করলেন।

পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য এতটাই প্রকট হচ্ছিল যে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণ করলেন—এই অবস্থায় এক অর্থনীতি কার্যকর হতে পারে না। দুই অঞ্চলের জন্য ‘দুই অর্থনীতি’ অপরিহার্য। তাঁর এই ধারণার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সরকারি কর্মকর্তারাও একমত হলেন। এরই মধ্যে তিনি দুবার প্রাদেশিক মন্ত্রী হলেন। ভালো করে বুঝতে পারলেন, পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণগুলো কী। তাই সেসব অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করতে শুরু করলেন। বাঙালির বাঁচার দাবি ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ তাঁর মাথা থেকে বের হলো। ছাত্র-জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ গণ-উপাধিতে ভূষিত করে। সেই থেকে আমাদের স্বপ্ন ও ভরসার প্রতীকে পরিণত হন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একাত্তরের ২৫শে মার্চ রাতে শুরু হয় বাঙালি নিধনের ‘জেনোসাইড’। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই তিনি যান পাকিস্তানের জেলে। শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা।

স্বাধীন দেশে তিনি পা রাখেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সেদিন স্পষ্ট করে বলে দেন, মাটি ও মানুষকে উপজীব্য করেই তিনি গড়ে তুলবেন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশ। গ্রামে-শহরে, নারীতে-পুরুষে, শ্রেণি-শ্রেণিতে বৈষম্য অবসানের জন্য তিনি এমন এক সমাজতন্ত্রের কথা বললেন, যা একান্তই দেশজ। ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম জাতীয় ও স্বাধীনতা দিবসে আরো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করলেন ‘সোনার বাংলার’ কথা।

১৯৭২ সালে অর্থনীতির আকার মাত্র আট বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য। সঞ্চয় জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ। বিনিয়োগ জিডিপির ৯ শতাংশ। পুরো অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত। এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, দেশের ভেতরে ধ্বংসপ্রাপ্ত ২০ লাখ মানুষের ঘরবাড়ির ব্যবস্থা করার চ্যালেঞ্জ। তবু তিনি অল্প সময়েই প্রণয়ন করেছেন সংবিধান, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও শিক্ষা কমিশন। স্থাপন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করেছেন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সমান গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি ও শিল্পের উন্নয়নের ওপর। কেননা তিনি জানতেন কৃষিই জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান দিতে পারবে, শ্রমশক্তির বড় অংশের কর্মসংস্থান দেবে এবং একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্যের চাহিদা জোগাবে। তাই কৃষি অবকাঠামোর পুনর্নির্মাণ, উন্নত বীজের সরবরাহ, বিনা মূল্যে বা ভর্তুকিতে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, এক লাখ কৃষকের সার্টিফিকেট মামলা খারিজ এবং কৃষকদের জন্য রেশনব্যবস্থা চালু করেন। অন্যদিকে বিদেশি মুদ্রার প্রকট অভাব, ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের এবং দেশীয় উদ্যোক্তার অনুপস্থিতির কারণে তিনি শিল্প বিকাশের পুরো দায় রাষ্ট্রের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন। তবে ব্যক্তি খাতের বিরুদ্ধে ছিলেন না তিনি। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ব্যক্তি খাতের কার্যকর বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টির প্রস্তাবনা এবং ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগসীমা ২৫ লাখ থেকে তিন কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং ১৩৩টি পরিত্যক্ত কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে যে দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন, সে কথা মনে রেখেই কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গণমুখী প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি এত সব প্রতিকূলতা পায়ে দলে ঠিকই সোনার বাংলা অর্জনের পথেই হাঁটছিলেন। কিন্তু তাঁর শাহাদাতবরণের পর স্বদেশ চলতে থাকে উল্টো দিকে। মাথাপিছু আয় কমতে থাকে। আসলেই পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নও খুন হয়েছিল। কল্পনা করুন, যদি অবিচ্ছিন্নভাবে আরো দশক দুই চালিয়ে যেতে পারতেন তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অভিযাত্রা, তাহলে কোথায় পৌঁছে যেত বাংলাদেশের অর্থনীতি! তাঁর আরাধ্য সোনার বাংলা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতাম আমরা।

পরিসংখ্যান দিয়েই কথার সত্যতা যাচাই করা যাক। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে চার বছর নমিন্যাল জিডিপি বছরে গড়ে ২৮ শতাংশ হারে বেড়েছিল। অথচ তিনি শহীদ হওয়ার পরবর্তী ৩৩ বছরে নমিন্যাল জিডিপি বছরে গড়ে মাত্র ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে ২০০৯ থেকে আমাদের গড় বার্ষিক নমিন্যাল জিডিপি বৃদ্ধির আশাব্যঞ্জক ধারায় ফিরতে শুরু করেছি (২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ১২ শতাংশ হারে নমিন্যাল জিডিপি বেড়েছে)। আবার ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে প্রতিবছর গড়ে ২৫ শতাংশ হারে পার-ক্যাপিটা জিডিপি বাড়লেও তার পরের ৩৩ বছরে বেড়েছে গড়ে প্রতিবছরে মাত্র ৩ শতাংশ হিসাবে। এখানেও ২০০৯ সাল থেকে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে (তথ্য সূত্র : ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস)।

লেখক :  বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা