kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

বাংলাদেশ হতো সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার মতো

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী   

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০২:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ হতো সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার মতো

একজন প্রশ্ন করেছিলেন রুশো আর ভলতেয়ার যদি না জন্মাতেন, তাহলে ফরাসি বিপ্লব কি হতো? জবাব, হয়তো হতো, অথবা হতো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি না জন্মাতেন, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্ম কি হতো? একটিমাত্র জবাব, হতো না।

দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য পেয়েছিলাম বলে তাঁর মনের কথা কিছু কিছু জানি। ১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আলজিয়ার্সে যাচ্ছিলেন। তাঁর সহযাত্রী আমিও ছিলাম সাংবাদিক হিসেবে। সাংবাদিক আরেকজনও তাঁর সহযাত্রী হয়েছিলেন, বাংলাদেশ অবজারভারের সাবেক সম্পাদক ওবায়েদ-উল হক। এই দীর্ঘ বিমানযাত্রায় বঙ্গবন্ধু তাঁর কেবিনে আমাদের ডেকে নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলেন।

আমরা বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলাম। বঙ্গোপসাগরে তখন বিরাট ভূখণ্ড জেগে উঠছে। তার আয়তন আরেকটি বাংলাদেশের সমান হবে। বঙ্গবন্ধু বিমানের পাইলটকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিমানটিকে কিছু নিচু দিয়ে চালিয়ে তাঁকে ভূখণ্ডটি দেখার সুযোগ দিতে। পাইলট তাঁর নির্দেশ পালন করেছিলেন। বিমানের কাচে ঢাকা জানালা দিয়ে এই ভূখণ্ড যতটা দেখা যায় তা তিনি দেখলেন। এরপর নিজের আসনে এসে বললেন, বাংলাদেশ যদি এই ভূখণ্ড পায়, তাহলে বাংলাদেশের ঘনবসতি সমস্যার সমাধান হবে।

তিনি বললেন, আমি আগামী ২৫ বছর পরের কথা ভাবছি। তখন নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৩-১৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই বিরাট জনসংখ্যা কোথায় স্থান দেব। বিরাট জনসংখ্যা সুবিধা ও অসুবিধা দুই-ই। জনসংখ্যা বেশি হলে একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়নের কাজে বেশি হাতের সাহায্য পাওয়া যায়। যন্ত্রশক্তির কাছে না গিয়ে জনশক্তির সাহায্যে কিভাবে দেশের উন্নয়ন ঘটানো যায়, চীনে মাও জেদং তা দেখিয়েছেন। আবার বিরাট জনসংখ্যার অসুবিধা এই যে দেশের যতই উন্নয়ন ঘটানো হোক, এই উন্নয়নের ফসল বাড়তি জনসংখ্যা খেয়ে ফেলে।

একটু চুপ থেকে তিনি বললেন, বঙ্গোপসাগরে উঠে আসা এই বিরাট ভূখণ্ড বাংলাদেশের। আমাদের সমুদ্র সীমানার মধ্যেই এটা উঠছে। পশ্চিমবঙ্গ আমরা হারিয়েছি। কিন্তু এই ভূখণ্ড হাতে পেলে আমার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন সত্যিই সফল হবে।

ওবায়েদ-উল হক সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ভারত কি এই ভূখণ্ডের ওপর তাদের দাবি ছাড়বে?

বঙ্গবন্ধু বললেন, সেটাই বড় সমস্যা। ভারতে একটি শক্তিশালী আধিপত্যবাদী মহল আছে। এই দ্বীপের ওপর তাদের অধিকার না থাকা সত্ত্বেও তারা এটা অধিকার করতে চাইবে। তারা শক্তিশালী বড় প্রতিবেশী। আমি ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিকতার ওপর বেশি নির্ভর করছি। তাঁর আন্তরিকতাতেই নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা সরানো সম্ভব হয়েছে। পানিচুক্তিসহ নানা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর সঙ্গে বৈঠকে বসে বাংলাদেশের জনসংখ্যার সমস্যা বুঝিয়ে এই ভূখণ্ডের বেশির ভাগের ওপর আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব বলে আশা রাখি। অবশ্য তত দিন যদি ইন্দিরা ক্ষমতায় থাকেন।

ওবায়েদ-উল হক সাহেব বললেন, আপনি কত দিন ক্ষমতায় থাকবেন আশা করেন?

বঙ্গবন্ধু হেসে বললেন, বাংলার মানুষ যত দিন চায়। তবে আমার আশা, তারা আমাকে সহসা ক্ষমতা ছড়তে বলবে না। কারণ আমি ক্ষমতায় থাকতে আসিনি। এসেছি একটি স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গঠনের ম্যান্ডেট নিয়ে। সেই বাংলা গঠন না করা পর্যন্ত আমার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মুজিব ভাই, আপনি কত দিন বেঁচে থাকবেন আশা করেন?

বঙ্গবন্ধু পাইপে টোব্যাকো পুরে বললেন, মহাত্মা গান্ধী চেয়েছিলেন ১২৫ বছর বাঁচবেন। আমি অতটা দীর্ঘ জীবন চাই না। তবে আমার মা-বাবা দুজনেই দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন। আমিও তেমন দীর্ঘ জীবন পেলেই যথেষ্ট। আমি উপমহাদেশে একটি স্বাধীন, শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ভিতটা প্রতিষ্ঠা করে যেতে চাই। তবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং দেশের স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আমাকে কত দিন বাঁচতে দেবে জানি না। একটা গুলি আমাকে অনবরত পশ্চাদ্ধাবন করছে বলে সন্দেহ করি।

বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমার পক্ষে কি ডিকটেটরের মতো লৌহযবনিকার মধ্যে বাস করা সাজে? লখিন্দর কি লোহার ঘরে বাস করে বাঁচতে পেরেছিল? সাপ তো আমার ঘরের মধ্যেই আছে।

এয়ার হোস্টেস চা-স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছিল। তাই আমাদের আলোচনায় বিরতি ঘটেছিল। চা পান পর্ব শেষ হলে বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করি। সেই সঙ্গে একজন জাতীয়তাবাদীও। কিন্তু এখনই বাংলাদেশে পূর্ণ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এখনই বড়, মাঝারি ও ছোট সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলে অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি পূরণের মতো অর্থ সরকারি কোষাগার পূরণ করতে পারবে না। তখন বাজারে কাগজের নোট ছাড়তে হবে। ফলে যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে তা দেশের অর্থনীতিকে বিপন্ন করে ফেলবে।

আমাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আরো আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক। ড. কামাল হোসেন ও রফিকুল্লা চৌধুরী এবং আরো কয়েকজন আলজেরীয় শীর্ষ সম্মেলন সম্পর্কে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুর কেবিনে এসে ঢোকেন। আমি ও ওবায়দুল হক সাহেব আপাতত বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিই।

বঙ্গবন্ধুর কাছে থেকে বুঝতে পেরেছিলাম, তাঁর চোখে একটি সোনালি স্বপ্ন ছিল পুরো বাংলাদেশটার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের। সেই স্বপ্ন সফল হলে, তাঁকে ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে না হলে, ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না হলে আজকের দুর্নীতি, সন্ত্রাসপূর্ণ এবং আমলাতন্ত্র ও নব্য বণিকতন্ত্রের শাসনে-শোষণে বাংলাদেশের বিপর্যস্ত চেহারা দেখতে হতো না। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হতো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার চেয়েও উন্নত ও পরিচ্ছন্ন একটি দেশ। শোষণ ও অপশাসন মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত একটি জনকল্যাণমূলক দেশ।

শেখ হাসিনা পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দুঃসাধ্য সাধনায় রত। বঙ্গবন্ধু আবার জাতীয় জীবনে ফিরে এসেছেন। তাই তাঁর আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের দিকে, যা তিনি বেঁচে থাকলে গড়ে উঠত, তার প্রতিচ্ছায়ার দিকে একবার ফিরে তাকালাম।

লেখক : লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা