kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

ভিতটা বঙ্গবন্ধুই তৈরি করে গেছেন

ইমতিয়াজ আহমেদ   

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০২:৩৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভিতটা বঙ্গবন্ধুই তৈরি করে গেছেন

প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে জাতির পিতা পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে খুব স্পষ্ট ছিলেন। একাধিকবার তিনি বলেছেন, ‘ফ্রেন্ডশিপ টুয়ার্ডস অল, ম্যালাইস টুয়ার্ডস নান’ (সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়)। সেটি ওই সময়ে বলা, এখন বোঝা যাচ্ছে যে এর পেছনে একটি বড় ধরনের ‘ভিশন’ তো আছেই, তার সঙ্গে বাংলার যে সভ্যতা, তার একটি ‘বেসিস’ (ভিত্তি) ছিল বলেই ওই সময় এ কথা বলার তাৎপর্যটা বোঝা যায়। কারণ ‘কোল্ড ওয়ার’ (শীতল যুদ্ধ) তখনো চলছিল, মনে রাখতে হবে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার। মনে রাখতে হবে, একাত্তর সালে অনেক দেশ আমাদের সঙ্গে ছিল না বা থাকলেও নীরব ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ আমাদের সঙ্গে ছিল না। চীন আমাদের সঙ্গে ছিল না।

অন্যদিকে অনেক দেশ খুব কাছের হয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই, তার মধ্যে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল অন্যতম। তা সত্ত্বেও ঠিক তখনই বলা, ফ্রেন্ডশিপ টুয়ার্ডস অল, ম্যালাইস টুয়ার্ডস নান। বোঝাই যাচ্ছে যে এক ধরনের ভিশনারি দিক তো ছিলই। কিন্তু বেঙ্গলের একটা সভ্যতার ব্যাপার ছিল।

এত বছর পর যদি বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর ফরেন পলিসি বা ভিশনে আউটকামটা কী? এটা বোঝা যায় যে ডেভেলপমেন্ট উইদাউট এনমিটি দাঁড় করিয়ে গেছেন ওই সময়। ওটার রিটার্ন আমরা এখন পাচ্ছি। কথায় কথায় বলছি। কয়টা দেশ আমাদের সঙ্গে ছিল আর কয়টা দেশ ছিল না তখন যদি আমরা সাইড নিতাম ওইভাবে, তাহলে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মুশকিলই করতাম। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার ফলে জাপান, চীন, আমেরিকা, ভারত—সবার সঙ্গেই বাংলাদেশ আছে। যদিও তাদের মধ্যে অনেক বৈরী সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে চীনের বৈরী সম্পর্ক আছে। ওদিকে চীনের সঙ্গে আমেরিকার বৈরী সম্পর্ক আছে। কিন্তু আমরা বলছি যে এটা তোমাদের সমস্যা। চীনের শত্রু আমাদের শত্রু না। ভারতের শত্রুও আমাদের শত্রু না। তারা তাদের শত্রু। আমরা সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখব। কারণ এটি আমাদের প্রিন্সিপল।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পর কতগুলো বিষয় কিন্তু খুব কঠিন ছিল, এখন হয়তো আরো পরিষ্কার হয়েছে। আমাদের বড় ধরনের যে বিষয়টি ছিল তা হলো স্বীকৃতি পাওয়া। কারণ একটি নতুন দেশ। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে স্বাধীন করা এবং তার আবার স্বীকৃতি পাওয়া কিন্তু সহজ নয়। সেই স্বীকৃতির জন্য বড় ধরনের কূটনীতি প্রয়োজন। সেই কূটনীতি আমি মনে করি সাফল্যের সঙ্গে লিড করতে পেরেছিল। কারণ শুধু যে মধ্যপ্রাচ্য, চীন তা নয়, এমনকি পাকিস্তানের স্বীকৃতি যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছিল ততক্ষণ কিন্তু যে সার্বভৌমত্বের কথা আমরা বলছি, সেটা কিন্তু সমস্যা হয়ে থাকে। সেই রিকগনিশন বঙ্গবন্ধুর সময়ই পাওয়া গেছে ১৯৭৪ সালে। আমরা দেখেছি যে ওআইসি সম্মেলনে তিনি গেলেন। ওই রিকগনিশনের আউটকাম হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশে এলেন। পাকিস্তান যদি স্বীকৃতি না দেয় তাহলে তো সমস্যা থেকেই যাবে। সে তো বছরের পর বছর এটি ঝুলিয়ে রাখতে পারত। সেই জায়গায় ওই রিকগনিশনের ব্যাপারে একটি বড় সাকসেস আমি মনে করি। বঙ্গবন্ধু করতে পেরেছিলেন। সেই হিসাবে দেখলাম, প্রায় সব স্বীকৃতি পাওয়া গেল। এমনকি আমরা জাতিসংঘের সদস্যও হতে পারলাম। এটা একটা বিশাল বিজয়। এখন অনেকে বুঝতে চাইবে না। সেই জায়গাটায় দেখলে বোঝা যাবে যে এটা কতখানি কঠিন ছিল।

যদিও চীন আমাদের সঙ্গে ছিল না একাত্তরে, বড় আকারে যে পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল সেটাও বলা ঠিক হবে না। অনেকে হয়তো ভেবেছিল যে চীন বড় আকারে পাকিস্তানের সমর্থনে আসবে। সেটাও সে করেনি। তার অনেক ধরনের রিজার্ভেশন ছিল। তা সত্ত্বেও আমরা বঙ্গবন্ধুর সময় দেখেছি, বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল তিনি পাঠিয়েছিলেন। যাকে বলা হয়, নীরবে পাঠিয়েছিলেন। ফ্রেন্ডশিপ টুয়ার্ডস অল ম্যালাইস টুয়ার্ডস নান—সেই দৃষ্টিভঙ্গি রেখেই তিনি বুঝতে পারছিলেন। তিনি চীনে সফর করেছিলেন। চীন থেকে তাঁর লেখালেখিও আছে। যারা সেই লেখালেখি পড়বে তারা কিন্তু বুঝতে পারবে যে তিনি বড় আকারে মুগ্ধ হয়েছিলেন চীনের উন্নয়নের ব্যাপারে।

ওআইসিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বিষয় ছিল তেলের ব্যাপারে আমরা স্বাভাবিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যে দেশগুলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের পক্ষে ছিল সেই বৈরী সম্পর্ক যদি আমরা কন্টিনিউ করতাম তাহলে দেখা যেত আমাদের তেলের যে সমস্যা বা এনার্জির যে সমস্যা এটা কিন্তু বড় আকারে আমাদের ওপর আসত। ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ফলে বলতে গেলে সব মুসলিম দেশ স্বীকৃতি দিল। আমাদের অন্তত তেল আমদানির ব্যাপারে ঝামেলা তৈরি হলো না। রাশিয়ার সঙ্গে এনার্জির বিষয়টি এসেছে। কালচারাল ডিপ্লোমেসির ক্ষেত্রে সেক্যুলারিজমের বিষয়টি এলো। আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা আনার বিষয়টি এই উপমহাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কিন্তু ভারতের আগে এনেছি। আমরা এনেছি ১৯৭২ সালে। ভারত এনেছে ১৯৭৪ সালে। সেই হিসাবে সেক্যুলারিজম প্রিন্সিপলের বড় বিষয় হলো সাংস্কৃতিক কূটনীতি। বাংলা ভাষায় প্রথম জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়া আছে।

পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশকে গঠন করা, এটি কিন্তু বিশাল ব্যাপার। বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সেনা বাংলাদেশ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে চলে যাওয়ার যে বিষয়টি, এটিও কিন্তু বিশাল। ইতিহাসে এমনটি খুব কম দেশেই আছে। চলে যাওয়ার মানে হলো তার কাঠামো মজবুত হলো।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের ভূমিকা বাংলাদেশ রাখা শুরু করেছিল। ফলে আজ আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো অবস্থানে আছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাঠামোটা বঙ্গবন্ধুই করে গেছেন। সেখান থেকে বড় আকারে কোনো পরিবর্তন কেউ আনতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি না। আনা সম্ভবও নয়। কারণ সেই প্রিন্সিপল তো এখনো রয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে অনেক কিছু হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই কাঠামো থেকে সরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। দরকারও ছিল না।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা