kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

করোনাযুদ্ধে নেই নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র

তৌফিক মারুফ ও মোশতাক আহম্মেদ   

১০ আগস্ট, ২০২০ ০২:৩১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনাযুদ্ধে নেই নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ওলটপালট হয়ে গেছে স্বাস্থ্য খাতের অনেক কিছুই। করোনা পরীক্ষা নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র হতাশা, ক্ষোভ তৈরি হয়। মাসখানেক ধরে পরীক্ষার চাপ কমে গেলেও এখনো নমুনা সংগ্রহ, ল্যাবরেটরি টেস্টের সক্ষমতা ও পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে চলছে নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। বিত্তবানরা বেশি টাকা দিয়ে এখন বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে এবং সরকারি হাসপাতাল কিংবা বুথে ফি দিয়ে চলছে পরীক্ষার ব্যবস্থা। কিন্তু দেশের শহরাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে যাচ্ছে করোনা পরীক্ষার বাইরে। তাদের মধ্যে করোনার উপসর্গ দৃশ্যমান না হওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় তাদের মধ্যে এই ভাইরাসের প্রকোপ নেই। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেখাতে পারেনি কেউ। অথচ ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৪০ লাখ বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে থাকা নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো করোনা পরীক্ষা বা সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনোই ভূমিকা রাখতে পারছে না। একই অবস্থা সারা দেশের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর। শুধুই গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় আটকে আছে সরকারের এই বড় কাঠামোটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা ঢাকাসহ সারা দেশের শহর এলাকায় থাকা নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো করোনা পরীক্ষাসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় হতে পারলে পরিস্থিতি মোকাবেলা অনেক সহজ হতো। সেই সঙ্গে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সংক্রমণ পরিস্থিতি সহজে বোঝা যেত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ অনেক কমত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আরবান হেলথ কার্যক্রমটি আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় একটি দুঃখ হয়ে আছে। এই কার্যক্রমটি আমরা অনেক চেষ্টা করেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনতে পারিনি কিংবা এটিকে নগরবাসীর সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কখনো উল্লেখযোগ্য হারে কার্যকর করতে পারিনি। বিশেষ করে এই করোনা মহামারির শুরু থেকেই আমরা নগর স্বাস্থ্যসেবাকে করোনা মোকাবেলায় কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়ে আসছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি করা সম্ভব হয়নি। করোনায় সেবার ক্ষেত্রে এই সরকারের এই উদ্যোগ একেবারেই অন্ধকারে থেকে গেল।’ এই বিশেষজ্ঞ বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কার্যক্রমটিকে এনজিওগুলোর কাছে ভাড়া দিয়েছে বিশেষ প্রকল্পের আওতায়। যারা কেন্দ্রটিকে শুধুই মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যে আটকে রেখেছে, যেখানে অন্য সেবা নেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ অন্যান্য দেশে করোনা মহামারিতে আরবান হেলথ কার্যক্রমই টেস্ট, কন্টাক্ট ট্রেসিংসহ অন্যান্য কাজে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হেলালউদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে করোনা ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে ল্যাবসহ টেকনোলজি স্থাপন করার মতো ব্যবস্থা ওই কেন্দ্রগুলোতে নেই।’ 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আমরা শুরুতেই দুই সিটি করপোরেশনকে এসব বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো যেহেতু সিটি করপোরেশনের অধীনে, তাই আমাদের পরামর্শ দেওয়া ছাড়া বেশি কিছু করার নেই। তবে যেহেতু কেন্দ্রগুলোতে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাই স্পর্শকাতর কেন্দ্র হিসেবে হয়তো সিটি করপোরেশন সেখানে করোনা পরীক্ষার মতো বিষয় ঢোকাতে চায়নি।’  

গতকাল রবিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ী এলাকার নগর স্বাস্থ্য ও মাতৃসদনে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় রোগীর ঠাসাঠাসি ভিড়। সবাই নারী। দ্বিতীয় তলায় অপারেশন সেন্টারের সামনেও ভিড়। কেউ মাস্ক পরেছে, কেউ পরেনি। রুমে রুমে চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন সতর্কতার সঙ্গেই। একজন রোগীর সঙ্গে আসা স্বজন আলতাফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাবিকে নিয়া আসছি, কয় দিন পরেই তাঁর ডেলিভারি অইব। সেই জন্য পরীক্ষা করতে আনছি।’

সেন্টারের চারতলায় নিজ দপ্তরে বসে আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট-২-এর ম্যানেজার রেহানা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজেক্টের আওতায় পার্টনারশিপে বেসরকারি সংস্থা নারী মৈত্রী এই সেন্টারসহ অনেক সেন্টার পরিচালনা করে থাকে। এখানে প্রধানত প্রজননস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য, গর্ভবতী নারীদের সব ধরনের সেবাই দেওয়া হয়। নরমাল ডেলিভারি ও সিজারিয়ানও করা হয়। আটজন ডাক্তার, চারজন নার্সসহ এখানে মোট ৩২ জন স্টাফ কাজ করেন এবং প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী আসে। এ ছাড়া ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়া, ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ল্যাবে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করা হয়। সে জন্য টেকনোলজিস্টও রয়েছেন। এ ছাড়া বস্তিগুলোতে ঘুরে ঘুরে এসব সেবা দেওয়া হয় নিয়মিত। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো সেন্টারেই করোনা পরীক্ষা বা চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। নির্দেশনা পেলে বা ব্যবস্থা করা হলে অবশ্যই আমরা তা করতে পারতাম।’

রেহানা আক্তার বলেন, ‘আমাদের এখানে যত রোগী আসে তাদের কারো মধ্যেই করোনার লক্ষণ নেই। কেন নেই সেটা বুঝতে পারছি না; যদিও প্রথম দিকে আমাদের একজন কর্মী করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৫ দিন এই সেন্টার লকডাউন করে বন্ধ রাখা হয়েছিল। আমাদের কর্ম এলাকার সাড়ে পাঁচ লাখ জনগোষ্ঠী থাকলেও এর মধ্যে আমাদের সেবার জন্য অভীষ্ট জনগোষ্ঠী রয়েছে দুই লাখ ৮৪ হাজার, যারা বৃহত্তর মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বস্তিগুলোতে বসবাস করে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, দৃশ্যত কারো মধ্যেই উপসর্গ দেখতে পাইনি। আমি নিজেও এর মধ্যেই বিভিন্ন বস্তিতে ঘুরেছি। সেখানকার কেউ হাসপাতালে গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা মারা গেছে এমনও শুনিনি।’

আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্টের কেন্দ্রীয় দপ্তরের পরিদর্শক মো. মোহসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় আমাদের মোট ৩১টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোতে করোনার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। তবে যদি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে হয়তো বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ে যে ধূম্রজাল রয়েছে, সেটা কাটানো যেত।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারা দেশে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট-২-এর ২৪টি সেবা কর্ম এলাকা চালু আছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, রাজশাহী, খুলনা ও গাজীপুরে দুটি করে এবং বরিশাল,  সিলেট,   রংপুর,   কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও কুষ্টিয়ায় একটি করে। প্রতিটি কর্ম এলাকার আওতায় চার থেকে ছয়টি করে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এডিবির সহায়তায় ১৯৯৮ সালে আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট প্রথম পর্ব শুরু হয়। এখন ২০১৮ থেকে ২০২৩ মেয়াদে প্রকল্পটির চতুর্থ ফেজ চালু আছে। এ জন্য মোট বরাদ্দ ধরা আছে ১৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে এডিবির বরাদ্দ রয়েছে ১১০ মিলিয়ন ডলার আর ২০ শতাংশ দেবে সরকার।

প্রকল্পটির পরিচালক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল হাকিম মজুমদার বলেন, আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্টে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিক্যাল পারসনসহ মোট তিন হাজার জনবল রয়েছে। সেবাকেন্দ্রগুলোতে দুই ধরনের সেবা চালু আছে। এর মধ্যে একটিতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্লিনিক চালু থাকে। এতে মাত্র একজন চিকিৎসক থাকেন। আরেকটিতে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এতে শিফট অনুযায়ী পাঁচ-ছয়জন চিকিৎসক এবং ৩০ থেকে ৩২ জন স্টাফ থাকেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা