kalerkantho

রবিবার। ৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ২ সফর ১৪৪২

উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে আসছে মেগা প্রকল্প

নিখিল ভদ্র   

৯ আগস্ট, ২০২০ ০১:২২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে আসছে মেগা প্রকল্প

ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ যথাযথ সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। এরপর সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে চরম ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় ২৫ জেলার প্রায় ৫ কোটি মানুষ। সেই ঝুঁকি মোকাবেলায় নতুন মেগা প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাঁধকে টেকসই করতে নকশা পরিবর্তন করা হচ্ছে। আর বাঁধ নির্মাণের পর তা রক্ষণাবেক্ষণে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হবে। 

নদী ও সুমুদ্র তীরবর্তী বেড়িবাঁধ দেখভালের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে পাঁচ হাজার ৭৫৭ কিলোমিটার বাঁধ। যার পুরোটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ষাটের দশকে ফসলী জমি বাড়াতে নির্মিত ওই বাঁধ সংস্কারে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও তা কাজে আসেনি। বরং সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। 

এরপর জোড়াতালি দিয়ে পানি আটকানো হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সাতক্ষীরা-খুলনা-বরিশাল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পরে গত ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র আঘাত নিঃসন্দেহে বড় ছিল। কিন্তু গত ২০ মে আম্ফান সবচেয়ে প্রবল শক্তিতে আঘাত হেনেছে উপকূলে। উপকূলীয় জেলার খুলনার কয়রা-পাইকগাছা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং বাগেরহাটের মংলাসহ অন্যান্য উপজেলা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে গেছে কাঁচা ঘর, দোকানপাট ও আধপাকা দালান। প্রায় ১৫০ কিলমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যে কারণে এখনো উপকূলের বহু মানুষ আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ক্ষতি সরেজমিনে দেখতে উপকূলীয় এলাকাগুলো সফর করেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ও সচিব কবির বিন আনোয়ারসহ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। 
পরিদর্শনকালে তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন এবং মোতায়েনকৃত সেনাপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেন। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য পানি নিষ্কাশন অব্যবস্থাপনা ও পুরাতন বাঁধকে দায়ি করে নতুন স্থায়ী বাঁধ তৈরি প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মেগা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে আট হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। এরমধ্যে খুলনার ১৪নং পোল্ডারে ৯৫৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও ৩১নং পোল্ডারে এক হাজার ২০১ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং সাতীরার ৫নং পোল্ডারে ৩ হাজার ৬৭৪ কোটি ৩ লাখ ও ১৫নং পোল্ডারে ৯৯৭ কোটি ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে ওই সকল প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। যা আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমাপ্ত হবে।

উপমন্ত্রী শামীম জানান, ওই চারটি প্রকল্পের বাইরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে আরো কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া বাঁধের সুরায় কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত সুপার ড্রাইভওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বেড়িবাঁধ নয়, পুরো উপকূলের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে হাওড় উন্নয়ন বোর্ডের ন্যায় উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অতীতে বেড়িবাঁধ সংস্কার, নির্মাণ ও রণাবেণ সবকিছুতেই স্থানীয় জনগণের মতামত উপেতি হয়েছে। ফলে প্রতিবছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ হয়নি। অথচ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে বেড়িবাঁধের ওপর। বাঁধের তি হলে সবকিছু ভেসে যায়। বাড়িঘর নষ্ট ও ফসলের তি হয়। তাই ওই অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। এক্ষেত্রে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।

নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূল সুরা আন্দোলনের নির্বাহী সদস্য পলাশ আহসান কালের কণ্ঠকে জানান, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তুলে ধরা সুপারিশে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে উপকূলে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। যে বাঁধের নিচে ১০০ ফুট, উপরে ৩০ ফুট এবং উচ্চতা হবে ৩০ ফুট।

তিনি বলেন, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরি তহবিল গঠন ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ওয়াপদা বাঁধের ১০০ মিটারের মধ্যে চিংড়ি বা কাঁকড়ার ঘের তৈরিতে সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিং-এর মাধ্যমে উপকূলের নদ-নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় জনগণের সুপারিশকে আমলে নিয়ে বেড়িবাঁধ তৈরির ডিজাইনেও (নকশা) পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগে বাঁধের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। এখন সেই বাঁধের উচ্চতা হবে ১৩ ফুট এবং চওড়া হবে ১২ ফুট। বাঁধের সুরায় বাঁধের এক শ মিটারের মধ্যে চিংড়ি ও কাঁকড়াসহ মাছ চাষে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে। বাঁধের দুই পাশে বনায়নের পাশাপাশি নদীর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তারা আরো জানান, গত ১০-১২ বছরে উপকূলে বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতকে বিবেচনায় রেখে বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অনুমোদনের অপোয় থাকা চারটি প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের শেষ নাগাদ শুরু হতে পারে। ওই প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা