kalerkantho

শুক্রবার। ১৭ আশ্বিন ১৪২৭। ২ অক্টোবর ২০২০। ১৪ সফর ১৪৪২

এভারেস্টের স্বপ্ন সড়কে পিষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ আগস্ট, ২০২০ ০২:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এভারেস্টের স্বপ্ন সড়কে পিষ্ট

রেশমা নাহার রত্না

এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন রেশমা নাহার রত্না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের নিয়মিত সদস্য ছিলেন তিনি। গান, আবৃত্তিতেও অংশ নিতেন নিয়মিত। সাইকেল চালিয়ে রমনায় গিয়ে শরীরচর্চা করতেন। এরপর হাতিরঝিলে কয়েক চক্কর দিয়ে সাইকেলেই বাসায় ফিরতেন। প্রতিদিনের মতো গতকাল শুক্রবার সকালেও সাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার চন্দ্রিমা উদ্যানের লেক রোড ধরে গণভবনমুখী সড়কে চন্দ্রিমায় প্রবেশের ব্রিজের সামনে পৌঁছাতেই একটি মাইক্রোবাস প্রথমে তাঁকে ধাক্কা দেয়। পরে তাঁর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। এতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি।

পথচারীরা উদ্ধার করে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবে সড়কে পিষ্ট হয় পর্বতারোহী রত্নার (৩৩) এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন।  

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রত্নাকে চাপা দিয়ে মাইক্রোবাসটি দ্রুত পালিয়ে যায়। সকালবেলা হওয়ায় তখন আশপাশে তেমন ট্রাফিক পুলিশ ছিল না। পরে খবর পেয়ে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ আশপাশের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই করে দেখতে পায়, কিভাবে মাইক্রোবাসটি রত্নাকে চাপা দিয়েছে। জানতে চাইলে শেরেবাংলানগর থানার ওসি (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে একটি মাইক্রোবাস মেয়েটিকে (রত্না) চাপা দেয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ভিডিও ফুটেজ দেখে গাড়ি শনাক্ত করে মাইক্রোবাসের চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলা প্রক্রিয়াধীন।

রত্নার লাশ দেখতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ছুটে আসেন দেশের খ্যাতিমান কয়েকজন পবর্তারোহী। এঁদের মধ্যে রয়েছেন এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার, মীর শামসুল আলম বাবু, হোমায়েদ ইশহাক মুন, শায়লা বিথী, জয়নব শান্তু, ইয়াসমিন লিসা, শামীম সাব্বিরসহ আরো অনেকে।

এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ধরনের একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। এটাকে আমি হত্যাকাণ্ড মনে করি। রত্না দেশের সম্পদ ছিল। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য অনেক ক্ষতি।’

ভারতের নেহরু মাউন্টিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে রত্নার সঙ্গে বেসিক কোর্স করেন পবর্তারোহী শায়লা বিথী। তিনি বলেন, ‘রত্না আপুর মানসিক দৃঢ়তা ছিল অসামান্য। তিনি কোনো প্রতিকূলতায় দমে যেতেন না। হার মেনে তিনি বারবার উত্তরণের চেষ্টা করতেন। তাঁর এই বিষয়গুলো আমাদের অনুপ্রেরণা দিত।’

রত্না শিক্ষকতা করতেন নিউ মার্কেটের পাশে আইয়ুব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক সাইদা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত রাতেই মেসেঞ্জার গ্রুপে রত্নার সঙ্গে কথা হয়। তিনি শনিবার স্কুলে আসতে চেয়েছিলেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। এত কম বয়সে তাঁর এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না।’

হাসপাতালে উপস্থিত রত্নার একাধিক বন্ধু জানান, আইয়ুব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রত্না প্রায় ছয় বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। তিনি আগে ফার্মগেট ও আশপাশের এলাকায় থাকতেন। গত মার্চে মিরপুর পাইকপাড়ায় সরকারি বাসা বরাদ্দ পান। মাসখানেক আগে ওই বাসায় থাকতে শুরু করেন। গত জুলাইয়ে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে একটি সাইকেল কেনেন রত্না। সেই সাইকেল নিয়েই ঢাকায় চলাফেরা করতেন। এই সাইকেলটিকেই ঘাতক গাড়িটি চাপা দেয়।

হাসপাতালে রত্নার ভাগ্নে জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রত্না খালার বাবা আফজাল হোসেন বীরপ্রতিক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ধূপাদহ গ্রামে থাকেন।’

জানা গেছে, নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে গত বছর উচ্চতর পর্বতারোহণ কোর্স সম্পন্ন করেন রত্না। তার কিছুদিন পর লাদাখে দুটি ছয় হাজার মিটার পর্বতারোহণ করেন তিনি। বাংলাদেশের কেওকারাডংয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে রেশমা নিজের পর্বতারোহণ অভিযান শুরু করেন। আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো ও মাউন্ট কেনিয়া জয়ের জন্যও গিয়েছিলেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা