kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

রাশিয়ার ভ্যাকসিনে আশা অবিশ্বাস

মেহেদী হাসান   

১৫ জুলাই, ২০২০ ০২:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাশিয়ার ভ্যাকসিনে আশা অবিশ্বাস

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়া নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) ভ্যাকসিনের ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ শেষ করে ফেলেছে—এমন খবরের রীতিমতো ‘ফ্যাক্ট চেক’ (ঘটনার সত্যতা যাচাই) শুরু হয়েছে। করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্ব এখন টিকা তথা ভ্যাকসিনের অপেক্ষায়। রাশিয়া যদি সেই ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে গিয়ে থাকে, তবে তা সারা বিশ্বের জন্যই স্বস্তির সুবাতাস বয়ে আনবে। কিন্তু নানা কারণে রুশদের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের এই খবরকে ঘিরে আশার সমান্তরালে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসও।

রুশ বার্তা সংস্থা তাসের তথ্যানুযায়ী, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে এমন দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়াতেই প্রথম ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ শেষ হয়েছে। রাশিয়ার চেভেনোভ ইউনিভার্সিটি ফর ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অন মেডিকেশন্স তাদের ভ্যাকসিনের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ভ্যাকসিনকে ‘কার্যকর’ বলেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ও মুখ্য গবেষক এলিনা স্মলিয়ারচুক।

তিনি বলেন, যাঁদের ওপর ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করা হয়েছে তাঁরা ১৫ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়বেন। এরপর বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে তাঁদের পর্যবেক্ষণ করা হবে। রুশ বার্তা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে গত ১৮ জুন ১৮ জনের শরীরে ওই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গত ২০ জুন ২০ জনের শরীরে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়।

রাশিয়ার ভ্যাকসিন উদ্ভাবনসংক্রান্ত খবর পর্যালোচনা করে একাধিক ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ প্রতিষ্ঠান বলেছে, ভ্যাকসিন পেতে আরো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। গত রবিবার বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, রাশিয়া সফলভাবে ভ্যাকসিন পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়নি ‘ফেজ ওয়ানের’ (প্রথম ধাপের) পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ‘ফেজ টুর’ (দ্বিতীয় ধাপের) পরীক্ষা এ সপ্তাহে শুরু হচ্ছে। ‘ফেজ থ্রির’ (তৃতীয় ধাপ) পরীক্ষা কবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টির’ কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। আর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় বাস্তব পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা হয়।

টিকা বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নীতিমালায়ও তিনটি ধাপ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করা ছাড়া কোনো ভ্যাকসিন অনুমোদন পায়নি। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা ছাড়া ব্যাপক পরিসরে কোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমতিও দেওয়া হয় না। তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করতেই কয়েক মাস লেগে যায়।

রাশিয়া তার ভ্যাকসিনটি তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় পাঠাবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে চীন তার একটি ভ্যাকসিন দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষেই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন পর্যন্ত চীনের সেই ভ্যাকসিন কেবল সামরিক সদস্যদেরই দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়ার ভ্যাকসিনটি তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় যাওয়া বা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ওই দেশটির কর্তৃপক্ষই নেবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের প্রায় অর্ধেক এখনো ‘প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টেজে’ আছে। অর্থাৎ সেগুলো উদ্ভাবনের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে বা কোনো প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ১৫টি ভ্যাকসিন ‘ফেজ ওয়ান’ ও প্রায় ১০টি ‘ফেজ টুতে’। তিনটি ভ্যাকসিন আছে ‘ফেজ থ্রিতে’।

আর ‘ফেজ থ্রি’ সম্পন্ন করার পরও সাধারণ মানুষের ভ্যাকসিন পেতে কয়েক মাস লেগে যায়। এর আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণে বিজ্ঞানীরা, এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদেরও ধারণা করোনার ভ্যাকসিন বাজারে আসতে আরো অন্তত এক থেকে দেড় বছর প্রয়োজন। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের পর তৈরি শুরু হলেও সবার একসঙ্গে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রথমে তা পেতে পারেন স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা। অন্য অনেক ভ্যাকসিনের মতো সবার জন্য করোনার ভ্যাকসিন পেতে কয়েক বছরও লাগতে পারে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক টিভি চ্যানেল ‘ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়ান নিউজের (ডাব্লিউআইওএন)’ ফ্যাক্ট চেকিংয়ে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ভ্যাকসিনকে রাশিয়ার সরকার অনুমোদন দিলেও পরীক্ষার সব ধাপ সম্পন্ন হওয়ার আগে তা বিশ্বে করোনার ভ্যাকসিন হিসেবে স্বীকৃতির সম্ভাবনা কম। জাদুকরী কিছু ঘটলেও এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে ম্যালেরিয়া, ইবোলা ও ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করতে অন্তত চার বছর সময় লেগেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের কার্যকরী ভ্যাকসিন পেতে দশ বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। এর পরও তা বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা মাত্র ৬ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চীনের সিনোভ্যাক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রা-জেনেকার ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন ‘হিউম্যান ট্রায়ালে’ এগিয়ে আছে। করোনার টিকা উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীরা যখন কাজ করছেন তখন টিকা উৎপাদন ও বিপণনের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে তাঁরা ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

এর আগে ভারত আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরে জানা গেছে, আগামী বছরের আগে এটি হওয়া বেশ কঠিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা